কওমি মাদরাসায় শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে ছাত্র-সুরক্ষা কমিটি কার্যকরের নির্দেশ দিয়েছে আল-হাইআতুল উলয়া। অভিযোগ তদন্তে সাত দিনের সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে।
কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে প্রতিটি মাদরাসায় অবিলম্বে ‘ছাত্র/ছাত্রী-সুরক্ষা কমিটি’ কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছে আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি‘আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) আল-হাইআতুল উলয়ার চেয়ারম্যান আল্লামা মাহমুদুল হাসানের নির্দেশে দেশের ছয়টি কওমি মাদরাসা বোর্ড ও তাদের অধিভুক্ত সব মাদরাসার উদ্দেশে এ নির্দেশনা জারি করা হয়।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীকে শাসনের উদ্দেশ্য হবে তার সংশোধন ও কল্যাণ। কোনো অবস্থাতেই রাগ বা প্রতিশোধের বশবর্তী হয়ে শাস্তি দেওয়া যাবে না। শাসনের ক্ষেত্রে প্রথমে নম্র সতর্কতা, প্রয়োজনে ভর্ৎসনা ও অন্যান্য সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একান্ত প্রয়োজন হলে অভিভাবককে ডেকে লিখিতভাবে অবহিত করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কোনো অবস্থাতেই শিক্ষার্থীকে শাস্তিস্বরূপ প্রহার করা যাবে না বলে নির্দেশনায় স্পষ্ট করা হয়েছে। লাঠি, বেত বা অন্য কোনো যন্ত্র দিয়ে আঘাত করা এবং মুখমণ্ডল, মাথা বা স্পর্শকাতর অঙ্গে আঘাত করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একইভাবে হাড় ভাঙা, রক্তপাত বা শরীরে দাগ সৃষ্টি করতে পারে—এমন যেকোনো ধরনের শাস্তিও নিষিদ্ধ।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীকে প্রকাশ্যে অপমান, গালমন্দ, কটু ভাষায় সম্বোধন, ঘৃণাসূচক নামে ডাকা কিংবা অন্য কোনো ধরনের মানসিক নির্যাতনমূলক আচরণ থেকেও বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা লঙ্ঘনকারী শিক্ষক বা শিক্ষিকাকে শরিয়াহ ও প্রচলিত বিধি অনুযায়ী জবাবদিহির আওতায় আনার কথা জানানো হয়েছে।
সাত দিনের মধ্যে অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ
ছাত্র/ছাত্রী-সুরক্ষা কমিটি প্রতিটি মাদরাসায় গঠন বা পুনর্গঠন করে সক্রিয় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অসদাচরণ, নির্যাতন বা হয়রানির অভিযোগ এই কমিটির কাছে জানানোর সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, অভিযোগ পাওয়ার পর কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন দিতে হবে। গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্ত চলাকালে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার কথাও বলা হয়েছে।
কোনো মাদরাসায় সুরক্ষা কমিটি না থাকা, নিষ্ক্রিয় থাকা কিংবা অভিযোগ পাওয়ার পরও ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট মাদরাসার ইলহাক স্থগিত বা বাতিলের কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
ইসলাহী কার্যক্রম ও অভিভাবক যোগাযোগ জোরদার
নির্দেশনায় শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত ইসলাহী মজলিস আয়োজনের পাশাপাশি নবনিযুক্ত শিক্ষকদের জন্য বাধ্যতামূলক তারবিয়াতি মজলিসের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া অভিভাবক-সমাবেশ বাড়িয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে যোগাযোগ ও আস্থার সম্পর্ক জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মাদরাসা মনিটরিং সেল ও হটলাইন
প্রতিটি কওমি মাদরাসা বোর্ডকে নিজ নিজ অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম তদারকির জন্য পৃথক ‘মাদরাসা মনিটরিং সেল’ গঠন এবং অভিযোগ গ্রহণের জন্য হটলাইন চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ পাওয়ার পর বোর্ড, মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও ছাত্র-সুরক্ষা কমিটিকে সমন্বিতভাবে নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রার্থীর চরিত্র ও বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত জুলাইয়ে আল-হাইআতুল উলয়ার পক্ষ থেকে কওমি মাদরাসা-সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ, তথ্য যাচাই ও তদারকির জন্য কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণ সেল এবং ০১৭০০-৭৬৩১৭৮ নম্বরে বিশেষ হটলাইন চালুর সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছিল।
নতুন নির্দেশনায় মাদরাসাবিরোধী মিথ্যা অপবাদ বা ভিত্তিহীন সংবাদের ক্ষেত্রে নিরপরাধ শিক্ষক, শিক্ষিকা, মুহতামিম বা প্রতিষ্ঠানের আইনগত প্রতিকারের ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে। এ জন্য বোর্ডসমূহের আইনজীবী প্যানেলের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আল-হাইআতুল উলয়া জানিয়েছে, কোনো ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে অপরাধ বা অনৈতিক কাজে জড়িত থাকলে সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনানুগ বিচার নিশ্চিত করা এবং অপরাধীকে কোনো ধরনের প্রশ্রয় না দেওয়াই তাদের নীতি। একইসঙ্গে বিচ্ছিন্ন ঘটনার দায় পুরো কওমি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী বা আলেমসমাজের ওপর চাপিয়ে না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, গত ১২ সেপ্টেম্বর আল-হাইআতুল উলয়ার স্থায়ী কমিটির ৬৯তম সভা এবং এর আগে ২৯ জুলাই অনুষ্ঠিত সংশ্লিষ্ট সাবকমিটির সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এসব নির্দেশনা প্রণয়ন করা হয়েছে।