পর্তুগালে বিদেশি নাগরিকদের নাগরিকত্ব পাওয়ার শর্ত আরও কঠোর করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রবিধানসহ ডিক্রি-আইন অনুমোদন করেছে দেশটির সরকার। নতুন বিধিমালায় পর্তুগিজ ভাষা, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জ্ঞান যাচাই, আর্থিক সচ্ছলতার প্রমাণ, গণতান্ত্রিক নীতির প্রতি আনুগত্যের ঘোষণা এবং বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহের বিধান রাখা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে ডিক্রি-আইনটি অনুমোদিত হয়। এর মাধ্যমে চলতি বছরের শুরুতে পার্লামেন্টে অনুমোদিত নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।
সংশোধিত আইন অনুযায়ী, ন্যাচারালাইজেশনের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পেতে নির্দিষ্ট শ্রেণির আবেদনকারীদের সাত বছর এবং অন্যদের দশ বছর বৈধভাবে পর্তুগালে বসবাস করতে হবে। পর্তুগিজ ভাষাভাষী আফ্রিকান দেশগুলোর নাগরিক ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকদের জন্য সাত বছরের শর্ত প্রযোজ্য হবে। অন্যান্য দেশের নাগরিকদের সাধারণত দশ বছর বসবাসের শর্ত পূরণ করতে হবে।
আগে পাঁচ বছর বৈধভাবে বসবাসের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব পাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন, এমন অনেক বিদেশি নাগরিকের ওপর নতুন নিয়মের বড় প্রভাব পড়তে পারে। তবে ইতিমধ্যে জমা দেওয়া বা প্রক্রিয়াধীন আবেদনগুলোর ক্ষেত্রে সংশোধিত বিধান কীভাবে কার্যকর হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
পর্তুগালের প্রেসিডেন্সি বিষয়ক মন্ত্রী আন্তোনিও লেইতাও আমারো বলেছেন, নতুন নিয়মের লক্ষ্য হলো আবেদনকারীদের সঙ্গে পর্তুগালের আরও সুদৃঢ় ও বাস্তবিক সংযোগ নিশ্চিত করা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সংশোধিত আইনে সমাজের সঙ্গে একাত্মতা এবং দেশ সম্পর্কে জ্ঞানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নতুন বিধিমালায় আবেদনকারীদের আর্থিক সক্ষমতা প্রমাণের পদ্ধতি এবং পর্তুগালের গণতান্ত্রিক সাংবিধানিক নীতির প্রতি আনুষ্ঠানিক আনুগত্য প্রকাশের বিধানও রয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় আয়ের সীমা, প্রমাণপত্রের তালিকা এবং সব ব্যবহারিক নিয়ম এখনো বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। পূর্ণাঙ্গ বিধিমালা ও কার্যকর হওয়ার তারিখ জানতে সরকারি গেজেট ‘দিয়ারিও দা রিপাবলিকা’য় প্রকাশের অপেক্ষা করতে হবে।
কঠোর শর্তের পাশাপাশি নাগরিকত্ব আবেদনপ্রক্রিয়া সহজ ও ডিজিটাল করার উদ্যোগও নিয়েছে সরকার। সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানোর মাধ্যমে আবেদনকারীদের আগে থেকেই সরকারি সংস্থায় থাকা নথিপত্র পুনরায় সংগ্রহের প্রয়োজন কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের আশা, এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়বে এবং প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা কমবে। তবে আবেদন নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি।
এদিকে ‘এজেন্সি ফর ইন্টিগ্রেশন, মাইগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম’ (আইমা)-এর নতুন সভাপতি হিসেবে সিজার টেক্সেইরাকে নিয়োগ দিয়েছে পর্তুগাল সরকার। পেদ্রো পর্তুগাল গাসপারের বিদায়ের পর এ নিয়োগ দেওয়া হলো। দেশটির সাবেক অভিবাসন পরিষেবা সংস্থা এসইএফ পুনর্গঠনের পর আইমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালে আগের বছরের তুলনায় আইমায় সেবাগ্রহীতাদের অ্যাপয়েন্টমেন্টের সংখ্যা ৬০ শতাংশ বেড়েছে। এ বছর সংস্থাটি সরাসরি এক লাখ ৮৫ হাজার মানুষকে সেবা দিয়েছে এবং প্রায় পাঁচ লাখ টেলিফোন কলের সাড়া দিয়েছে।
লেইতাও আমারো জানান, ডিজিটাল রূপান্তর, জনসেবার মান উন্নয়ন এবং অভিবাসীদের সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকে গুরুত্ব দিয়ে আইমা নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে।
তবে মাইগ্রেশন টেকনিশিয়ানস ইউনিয়ন বলেছে, শুধু নতুন সভাপতি নিয়োগের মাধ্যমে কর্মীসংকট, দুর্বল পরিকল্পনা ও দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতার মতো কাঠামোগত সমস্যার সমাধান হবে না। নতুন সভাপতিকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি সংস্থাটির কার্যক্রমে কার্যকর ও টেকসই সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে ইউনিয়নটি।
নাগরিকত্বের শর্ত কঠোর করা এবং অভিবাসন প্রশাসনে নেতৃত্ব পরিবর্তনের এই দুই সিদ্ধান্ত পর্তুগালে বসবাসরত বিদেশি নাগরিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নতুন বিধিমালার পূর্ণাঙ্গ পাঠ্য সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হলে নাগরিকত্ব আবেদনকারীদের জন্য এর বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।