আবদুল আহাদ সালমান
ইউরোপের নাগরিকদের অন্তত ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিনের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার, পানীয় জল, ওষুধ এবং জরুরি সামগ্রী নিজেদের কাছে প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ নাগরিক সুরক্ষার একটি নির্দেশনা মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে ইউরোপের পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতি, বৈশ্বিক রাজনৈতিক উত্তেজনা, যুদ্ধের ঝুঁকি, সাইবার হামলা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো বহুমাত্রিক বাস্তবতা।
২০২৫ সালের ২৬ মার্চ ইউরোপীয় কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে ‘Preparedness Union Strategy’ ঘোষণা করে। এই কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য হলো, কোনো বড় ধরনের জরুরি পরিস্থিতিতে অন্তত প্রথম ৭২ ঘণ্টা যেন সাধারণ মানুষ মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে সরকারি জরুরি সহায়তার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না থাকে। অর্থাৎ সংকটের শুরুতেই প্রত্যেক নাগরিক ও পরিবারকে কিছুটা স্বনির্ভর থাকার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
প্রশ্ন হচ্ছে, ইউরোপের মতো উন্নত অর্থনীতি, শক্তিশালী প্রশাসন ও আধুনিক অবকাঠামোর অঞ্চলে হঠাৎ এমন প্রস্তুতির প্রয়োজন কেন দেখা দিল? এটি কি সম্ভাব্য যুদ্ধের পূর্বাভাস, নাকি ভবিষ্যতের অনিশ্চিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি বাস্তবসম্মত নাগরিক নিরাপত্তাব্যবস্থা?
ইউরোপের নিরাপত্তা ভাবনায় পরিবর্তন :
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে দীর্ঘদিন ধরে শান্তি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ধারণা শক্তিশালী ছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্প্রসারণ, অভিন্ন বাজার, বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক সহযোগিতা মহাদেশটিকে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নিয়ে যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই নিরাপত্তাবোধ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। যুদ্ধটি শুধু দুটি দেশের মধ্যে সামরিক সংঘাত হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়েছে জ্বালানি সরবরাহ, খাদ্যবাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে।
এর পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। আধুনিক বিশ্বে কোনো দেশের নিরাপত্তা শুধু সীমান্ত পাহারা দিয়ে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। একটি বড় সাইবার হামলা কিংবা বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থায় বিপর্যয়ও একটি দেশের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে অচল করে দিতে পারে।
এ কারণেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন সামরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি নাগরিক ও সামাজিক নিরাপত্তাকে সমান গুরুত্ব দিতে চাইছে।
কেন ৭২ ঘণ্টার প্রস্তুতি?
ইউরোপীয় কমিশনের Preparedness Union Strategy-তে ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা, গুরুত্বপূর্ণ পণ্য মজুত রাখা, সাইবার নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং নাগরিকদের দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত করা।
৭২ ঘণ্টার ধারণাটি মূলত জরুরি পরিস্থিতির প্রাথমিক সময়কে কেন্দ্র করে তৈরি। কোনো বড় দুর্যোগ বা সংকটের পরপরই উদ্ধারকারী সংস্থা, হাসপাতাল, পুলিশ, অগ্নিনির্বাপণ বাহিনী ও অন্যান্য জরুরি সেবার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হতে পারে। দুর্গত এলাকায় সহায়তা পৌঁছাতে সময় লাগতে পারে। এ সময় প্রত্যেক পরিবার যেন নিজেদের মৌলিক প্রয়োজন সাময়িকভাবে মেটাতে পারে, সেটিই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি: ইউরোপীয় কমিশনের এই উদ্যোগ কোনো আসন্ন যুদ্ধের ঘোষণা নয়। এটি যুদ্ধ, মহামারি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সাইবার হামলা, শিল্প দুর্ঘটনা কিংবা সরবরাহব্যবস্থার বিপর্যয়সহ বিভিন্ন ধরনের সংকট মোকাবিলার একটি সমন্বিত প্রস্তুতি।
আধুনিক যুদ্ধের নতুন বাস্তবতা :
একসময় যুদ্ধ বলতে মানুষের চোখে ভেসে উঠত সীমান্তে সেনাবাহিনীর অবস্থান, ট্যাংক, যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রের দৃশ্য। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতা অনেক বিস্তৃত।
বর্তমানে একটি দেশকে বিপর্যস্ত করতে সরাসরি সামরিক হামলার পাশাপাশি সাইবার আক্রমণ, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে নাশকতা, তথ্য বিভ্রান্তি এবং ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটানোর মতো কৌশল ব্যবহৃত হতে পারে।
ধরা যাক, কোনো কারণে একটি দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ কয়েক দিন বন্ধ থাকল। তখন শুধু ঘরের আলো নিভে যাবে না; হাসপাতাল, ব্যাংক, সুপারমার্কেট, গণপরিবহন, যোগাযোগব্যবস্থা এবং পানির সরবরাহও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কার্ডের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ বন্ধ হয়ে গেলে নগদ অর্থের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। ইন্টারনেট না থাকলে জরুরি তথ্য পাওয়াও কঠিন হয়ে উঠবে।
২০২৫ সালের ২৮ এপ্রিল আইবেরীয় উপদ্বীপে ঘটে যাওয়া বড় বিদ্যুৎ বিপর্যয় ইউরোপের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। পর্তুগাল ও স্পেনসহ বিস্তৃত অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় আধুনিক সমাজের বিদ্যুৎনির্ভরতার বাস্তবতা নতুন করে সামনে আসে।
অর্থাৎ, নিরাপত্তা সংকট মানেই যুদ্ধ নয়। কখনো একটি প্রযুক্তিগত বিপর্যয়ও লাখ লাখ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে থামিয়ে দিতে পারে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মহামারির শিক্ষা :
ইউরোপের ৭২ ঘণ্টার প্রস্তুতির পেছনে প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
গত কয়েক বছরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভয়াবহ দাবানল, বন্যা, তাপপ্রবাহ, ঝড় ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। এসব পরিস্থিতিতে অনেক সময় মানুষকে নিজ বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে হয়। কোনো কোনো এলাকায় খাদ্য, পানি, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
কোভিড-১৯ মহামারিও ইউরোপকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। বিশ্বের অন্যতম উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও মহামারির সময় চিকিৎসাসামগ্রী, ওষুধ, খাদ্যপণ্য এবং প্রয়োজনীয় সেবার সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছিল।
সুতরাং ভবিষ্যতের সংকট মোকাবিলায় শুধু সরকারি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় কমিউনিটিকে প্রস্তুত রাখার প্রয়োজনীয়তা ইউরোপ উপলব্ধি করেছে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য বিশেষ বার্তা :
ইউরোপের এই প্রস্তুতি উদ্যোগে অভিবাসী জনগোষ্ঠীর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। কারণ ইউরোপে বসবাসরত অভিবাসীদের একটি বড় অংশ ভাষাগত সীমাবদ্ধতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং স্থানীয় জরুরি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণার অভাবে সংকটের সময় বাড়তি সমস্যায় পড়তে পারেন।
বিশেষ করে বাংলাদেশি অভিবাসীদের মধ্যে অনেকেই পরিবারসহ বসবাস করেন। কারও বাসায় ছোট শিশু রয়েছে, কারও সঙ্গে রয়েছেন বৃদ্ধ বাবা-মা, আবার অনেকে একা থাকেন। জরুরি পরিস্থিতিতে এসব মানুষের প্রয়োজনও এক রকম নয়।
ধরা যাক, পর্তুগালে কোনো এলাকায় হঠাৎ বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেল। তখন স্থানীয় ভাষায় প্রচারিত জরুরি নির্দেশনা বুঝতে না পারলে অনেক অভিবাসী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে দেরি করতে পারেন। একইভাবে সরকারি ঘোষণা, নিরাপদ আশ্রয়স্থল কিংবা জরুরি পরিবহন সম্পর্কে তথ্য না জানাও বিপদের কারণ হতে পারে।
তাই ইউরোপে বসবাসরত বাংলাদেশিদের এখন থেকেই কিছু প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।
প্রতিটি পরিবারের অন্তত তিন দিনের প্রয়োজনীয় শুকনো খাবার ও পানীয় জল রাখা দরকার। পাশাপাশি নিয়মিত ব্যবহৃত ওষুধ, প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রী, টর্চলাইট, অতিরিক্ত ব্যাটারি, চার্জ করা পাওয়ার ব্যাংক, কিছু নগদ অর্থ এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়পত্রের কপি নিরাপদ স্থানে রাখা যেতে পারে।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে জরুরি যোগাযোগের বিকল্প ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে কোথায় একত্রিত হবেন, সে বিষয়েও আগে থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
পর্তুগালে বসবাসরত বাংলাদেশিদের করণীয় :
পর্তুগালে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্য বিষয়টি আরও বাস্তবভাবে বিবেচনা করা দরকার। দেশটির জাতীয় জরুরি ও নাগরিক সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ ANEPC-এর নির্দেশনা অনুসরণ করা এবং স্থানীয় প্রশাসনের জরুরি সতর্কবার্তার সঙ্গে যুক্ত থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
জরুরি প্রয়োজনে ইউরোপজুড়ে ব্যবহৃত ১১২ নম্বরে যোগাযোগ করা যায়।
এ ছাড়া বাংলাদেশি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোও এ বিষয়ে সচেতনতামূলক উদ্যোগ নিতে পারে। স্থানীয় ভাষায় জরুরি নির্দেশনার বাংলা অনুবাদ, নাগরিক সুরক্ষা বিষয়ে আলোচনা, প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ এবং পরিবারভিত্তিক জরুরি পরিকল্পনা তৈরিতে এসব সংগঠন ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষ করে যেসব অভিবাসী পর্তুগিজ ভাষায় দুর্বল, তাঁদের জন্য সহজ বাংলায় জরুরি তথ্য পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমেরও দায়িত্ব রয়েছে। শুধু আতঙ্ক সৃষ্টিকারী শিরোনাম প্রকাশ না করে সরকারি নির্দেশনা, যাচাইকৃত তথ্য এবং বাস্তবসম্মত করণীয় তুলে ধরতে হবে।
আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা :
ইউরোপের ৭২ ঘণ্টার প্রস্তুতি উদ্যোগকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের ব্যাখ্যা ও অনুমান ছড়িয়ে পড়তে পারে। কেউ একে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বাভাস হিসেবে দেখাতে পারেন, কেউ আবার আসন্ন কোনো বড় বিপর্যয়ের ইঙ্গিত হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন।
কিন্তু দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা ও সচেতন নাগরিকত্বের দাবি হচ্ছে, তথ্য ও অনুমানের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই উদ্যোগের অর্থ এই নয় যে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ইউরোপে যুদ্ধ শুরু হবে কিংবা সব নাগরিককে বাড়িঘর ছেড়ে চলে যেতে হবে। বরং এর অর্থ হলো, সম্ভাব্য যেকোনো সংকটে নাগরিকদের প্রস্তুত রাখার জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, দুর্যোগ কখন আসবে তা সব সময় আগে থেকে জানা যায় না। কিন্তু প্রস্তুতি থাকলে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আর নাগরিকের দায়িত্ব নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন থাকা। এই দুইয়ের সমন্বয়েই একটি শক্তিশালী ও দুর্যোগসহনশীল সমাজ গড়ে ওঠে।
ইউরোপের ৭২ ঘণ্টার বার্তা তাই শুধু খাবার ও পানি মজুত রাখার আহ্বান নয়; এটি ভবিষ্যতের অনিশ্চিত পৃথিবীতে নাগরিক দায়িত্ব, সামাজিক সংহতি এবং আত্মনির্ভরতার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
যুদ্ধ হোক কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সংকটের সময় প্রস্তুতিহীনতার মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকেই। তাই আতঙ্ক নয়, সচেতনতা; গুজব নয়, তথ্য; নির্ভরশীলতা নয়, দায়িত্বশীল প্রস্তুতিই হোক আমাদের পথচলার ভিত্তি।
লেখক : প্রেসিডেন্ট, পর্তুগাল বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির; সম্পাদক, ইউরোবাংলা