শেখ আশরাফুল ইসলাম
বুয়েনোস আইরেসের কোনো এক বিকেলে রাস্তার পাশের ক্যাফেতে বসে থাকলে অনেকেরই মনে হতে পারে—এ যেন দক্ষিণ আমেরিকা নয়, ইউরোপেরই কোনো শহর। স্থাপত্য, মানুষের আচার-আচরণ, এমনকি কথাবার্তার ভঙ্গিতেও স্পষ্ট এক ইউরোপীয় ছাপ।
লাতিন আমেরিকার অন্য দেশগুলোর ফুটবল দলে আমরা সাধারণত স্বেতাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গ এবং মিশ্র মেস্তিজো খেলোয়াড়দের একসঙ্গে দেখা যায়। কিন্তু আর্জেন্টিনার জাতীয় দলে তুলনামূলকভাবে আফ্রিকান বা আদিবাসী বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়ের উপস্থিতি কম দৃশ্যমান। প্রশ্ন জাগে, আর্জেন্টিনার সেই “অ-শ্বেতাঙ্গ” জনগোষ্ঠী তাহলে কোথায় গেল?
আজকের আর্জেন্টিনা নিজেদের “ইউরোপীয় দেশ” হিসেবে দাবি করে। কিন্তু এই পরিচয় স্বাভাবিকভাবে গড়ে ওঠেনি; এটি তৈরি হয়েছে আফ্রো-আর্জেন্টাইন কৃষ্ণাঙ্গদের উপর চালানো গণহত্যা, বে-ইনসাফি, রাষ্ট্রীয় নীতি এবং সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে।
ইউরোপীয়দের আগমনের আগে :
ইউরোপীয় উপনিবেশকারীদের আগমনের আগে এই ভূখণ্ড ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগৎ। পাম্পাসের তৃণভূমি, আন্দিজের পাদদেশ এবং প্যাটাগোনিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে বসবাস করত অসংখ্য আদিবাসী জনগোষ্ঠী; তাদেরকে বলা হতো মাপুচে, গুয়ারানি, দিয়াগুইতা প্রমুখ।
তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনধারা ছিল বৈচিত্র্যময়, কিন্তু একটি বিষয় তাদের এক করেছিল—এই ভূমিই ছিল তাদের অস্তিত্বের কেন্দ্র।
ষোড়শ শতকে স্প্যানিশদের আগমন এই বাস্তবতাকে ধীরে ধীরে বদলে দিতে শুরু করে।
অদৃশ্য আঘাত : রোগ, যুদ্ধ ও ধ্বংস :
পরিবর্তন শুধু যুদ্ধের মাধ্যমে হয়নি; প্রথম এবং সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাত এসেছিল রোগের মাধ্যমে। ইউরোপ থেকে আসা গুটি বসন্ত, হামসহ নানা রোগের বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কোনো প্রতিরোধ ক্ষমতা ছিল না। ফলে বহু জনপদ ধ্বংস হয়ে যায়।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন যুদ্ধ ও সংঘাতে আদিবাসী এবং আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষদের সামনের সারিতে পাঠানো হতো, যার ফলে মৃত্যুহারও ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি। তাছাড়া কৃষ্ণাঙ্গদের উপর চালানো সামাজিক বৈষম্যও ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে।
আফ্রিকান দাসপ্রথা ও সমাজে পরিবর্তন :
উপনিবেশিক শাসনের সময় আফ্রিকা থেকে দাস আনা হয়। ধীরে ধীরে আর্জেন্টিনার সমাজে একটি নতুন জনগোষ্ঠী যুক্ত হয়—আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষ।
ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, একসময় বুয়েনোস আইরেসসহ বড় শহরগুলোতে তাদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। কিন্তু আজ সেই দৃশ্যমানতা প্রায় অনুপস্থিত।
স্বাধীনতার পর ইউরোপীয় অভিবাসনের ঢল :
১৯শ শতকে স্বাধীনতার পর আর্জেন্টিনা ইউরোপীয় অভিবাসনের দরজা খুলে দেয়। সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে ইউরোপীয় অভিবাসনকে উৎসাহিত করার কথা বলা হয়।
তৎকালীন শাসকদের ধারণা ছিল, দেশকে “আধুনিক” করতে হলে ইউরোপীয় জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন।
ফলে ১৮৫০ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে প্রায় ৬০ লক্ষ ইউরোপীয়; বিশেষ করে ইতালি, স্পেন ও জার্মানি থেকে—আর্জেন্টিনায় আসে। এই বিশাল জনস্রোতের ফলে দেশটির জনসংখ্যাগত ভারসাম্য দ্রুত বদলে যায়। বেড়ে যায় শ্বোতাঙ্গদের সংখ্যা।
মরুভূমি দখল অভিযান, একটি অন্ধকার অধ্যায় :
ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে মরুভূমি দখল অভিযান বা “Conquest of the Desert” নামে পরিচিত সামরিক অভিযান আর্জেন্টিনার ইতিহাসে গভীর ক্ষত তৈরি করে।
জেনারেল হুলিও আর্জেন্টিনো রোকার নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল পাম্পাস ও প্যাটাগোনিয়া অঞ্চলের ভূমি দখল করা। আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে হত্যা বা বাস্তুচ্যুত করে সেই ভূমিকে কৃষি ও পশুপালনের উপযোগী করা হয়।
হাজার হাজার কৃষ্ণাঙ্গ আদিবাসীকে হত্যা করা হয়।আর অনেকে বন্দি শিবিরে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হন, যা অনেক ইতিহাসবিদের মতে এক ধরনের গণহত্যা।
ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়া আফ্রিকান ও আদিবাসী পরিচয় :
আফ্রিকান বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যেতে থাকে। যুদ্ধ, মহামারি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে মিশ্র বিবাহের মাধ্যমে তারা বৃহত্তর সমাজে মিশে যায়।
একই প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে আদিবাসীদের ক্ষেত্রেও ঘটে। অনেকে তাদের পরিচয় হারাননি, কিন্তু তা প্রকাশ্যে বহন করার সুযোগ বা আগ্রহ কমে যায়।
“ইউরোপীয় আর্জেন্টিনা”; নির্মিত একটি পরিচয় :
আর্জেন্টিনার জাতীয় পরিচয়ের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ বয়ান গড়ে ওঠে—এখানে সবাই ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত। এই ধারণা শুধু সামাজিক নয়; এটি শিক্ষা ব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় প্রচারণা এবং ইতিহাসচর্চার মধ্যেও প্রতিফলিত হয়।
ফলে বহু মানুষের শিকড়ে আদিবাসী বা আফ্রিকান ইতিহাস থাকলেও, তা জাতীয় পরিচয়ের অংশ হিসেবে দৃশ্যমান হয়নি।
ফুটবল, সমাজের আয়না :
আর্জেন্টিনার ফুটবল দলে এই পরিচয়ের প্রতিফলন অনেক সময়ই আলোচনায় আসে। খেলোয়াড়দের চেহারায় ইউরোপীয় ছাপ বেশি দৃশ্যমান হওয়ায় এই ধারণা আরও শক্ত হয়।
তবে বাস্তবতা আরও জটিল। অনেক খেলোয়াড়ের শিকড় মিশ্র। কার্লোস তেভেজ বা দিয়েগো মারাদোনার মতো ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রেও আদিবাসী বা মিশ্র বংশধারার আলোচনা রয়েছে।
তবুও জাতীয় পর্যায়ে এই পরিচয় খুব কমই সামনে আসে।
হারিয়ে না গিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া :
আজকের আর্জেন্টিনায় আদিবাসী বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হলেও তারা জাতীয় কল্পনায় প্রায় অনুপস্থিত।
এটি কোনো বাস্তব অনুপস্থিতি নয়; বরং এক ধরনের “অদৃশ্যতা”—যা তৈরি হয়েছে ইতিহাস, রাষ্ট্রনীতি এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার মাধ্যমে।
আর্জেন্টিনার “ইউরোপীয় মুখ” আসলে এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক নির্মাণের ফলাফল। এর পেছনে আছে উপনিবেশ, অভিবাসন, সহিংসতা, মিশ্রণ এবং রাষ্ট্রীয় বয়ানের জটিল ইতিহাস।
বুয়েনোস আইরেসের ইউরোপীয় আবহের নিচে লুকিয়ে আছে আরেকটি আর্জেন্টিনা—যার ইতিহাস আরও বহুবর্ণ, আরও জটিল এবং গভীরভাবে মানবিক।