২৩শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বিশেষ প্রতিবেদন
বিশেষ প্রতিবেদন

বিজয়ের মধ্যে পরাজয়ের ছাপ : যে রাতে ধোঁয়ায় ঢেকে গিয়েছিল হামবুর্গের ৫৫ বছরের ইতিহাস

বিজয়ের মধ্যে পরাজয়ের ছাপ : যে রাতে ধোঁয়ায় ঢেকে গিয়েছিল হামবুর্গের ৫৫ বছরের ইতিহাস

ফুটবল ইতিহাসে এমন কিছু রাত আছে, যেগুলো শুধু একটি ম্যাচের ফলাফলের জন্য নয়, বরং যুগ যাগান্তর স্মরণীয় হয়ে থাকে। ২০১৮ সালের ১২ মে ছিল তেমনই এক রাত।

জার্মানির ঐতিহ্যবাহী ক্লাব হামবুর্গ এসভি সেদিন নিজেদের শেষ লিগ ম্যাচে বরুসিয়া মেনশেনগ্লাডবাখকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল। কিন্তু সেই জয় কোনো আনন্দ বয়ে আনেনি। বরং ম্যাচ শেষে কান্না, হতাশা, ক্ষোভ আর ধোঁয়ায় ঢেকে গিয়েছিল পুরো স্টেডিয়াম।

হামবুর্গ অন্য দশটা ক্লাবের মতো ছিল না। ১৯৬৩ সালে বুন্দেসলিগা প্রতিষ্ঠার পর থেকে ক্লাবটি কখনো শীর্ষ লিগ থেকে অবনমিত হয়নি। জার্মানির সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফুটবলে টানা ৫৫ বছর টিকে থাকা এই ক্লাবকে বলা হতো ‘ডাইনোসর’—বুন্দেসলিগার সবচেয়ে পুরোনো ও অবিচ্ছিন্ন সদস্য। তাদের স্টেডিয়াম ফোকসপার্কস্টেডিয়নে একটি বিশেষ ঘড়িও ছিল, যেটাকে গুনে রাখা হতো ক্লাবটির টানা বুন্দেসলিগা যাত্রার সময়। কিন্তু ২০১৭-১৮ মৌসুমে সেই গৌরবময় ইতিহাস হঠাৎ করেই ভেঙে আশঙ্কা তৈরি হয়।

মৌসুমের শেষ ম্যাচে হামবুর্গের সামনে ছিল বাঁচা-মরার লড়াই। শুধু জিতলেই হতো না, একই সঙ্গে অপেক্ষা করতে হতো প্রতিদ্বন্দ্বী উলফসবুর্গের পয়েন্ট হারানোর জন্যও। হাজার হাজার সমর্থক সেই আশাতেই গ্যালারি ভরিয়ে তুলেছিলেন। কেউ পতাকা হাতে, কেউ চোখে স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলেন ইতিহাসকে আরেকটি বছর বাঁচিয়ে রাখার প্রত্যাশায়।

ম্যাচ শুরু হওয়ার পর হামবুর্গ আক্রমণাত্মক ফুটবল খেললেও প্রথমার্ধে গোলের দেখা পায়নি। সময় যত গড়াতে থাকে, ততই বাড়তে থাকে উদ্বেগ। দ্বিতীয়ার্ধের ৫৩ মিনিটে বরুসিয়া মেনশেনগ্লাডবাখের জোসিপ দ্রমিচ গোল করে অতিথিদের এগিয়ে দিলে পুরো স্টেডিয়াম স্তব্ধ হয়ে যায়। তখন মনে হচ্ছিল, হামবুর্গের দীর্ঘ ইতিহাস বুঝি সেখানেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু ফুটবল যে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নাটক বাঁচিয়ে রাখে, সেটাই আবার প্রমাণিত হয় ম্যাচের শেষ দিকে। ৯০ মিনিটে পেনাল্টি থেকে সমতা ফেরান অ্যারন হান্ট। হঠাৎ করেই নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় গ্যালারি। সমর্থকদের কণ্ঠে আবারও ভেসে ওঠে আশার সুর। আর যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে লুইস হোল্টবি গোল করে হামবুর্গকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। পুরো স্টেডিয়াম তখন উৎসবে ফেটে পড়েছে। খেলোয়াড়রা উদযাপন করছেন, সমর্থকেরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরছেন। মনে হচ্ছিল, অসম্ভবকে হয়তো সম্ভব করেই ফেলেছে হামবুর্গ।

কিন্তু একই সময়ে অন্য স্টেডিয়াম থেকে আসছিল আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি খবর। উলফসবুর্গ তাদের ম্যাচে কোলনকে ৪-১ গোলে হারিয়েছে। অর্থাৎ হামবুর্গ জিতলেও লাভ নেই। লিগ টেবিলে তাদের অবস্থান আর পরিবর্তন হবে না। অবনমন অনিবার্য।

খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয় শোকে। গ্যালারিতে কান্নায় ভেঙে পড়েন অসংখ্য সমর্থক। কেউ মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েন, কেউ চোখের জল লুকাতে পারেননি। আবার অনেকে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। গ্যালারি থেকে জ্বলে ওঠে অসংখ্য ফ্লেয়ার। লাল আগুনের আলো আর ঘন ধোঁয়ায় ঢেকে যায় মাঠের একাংশ। গোলপোস্টের পাশেও এসে পড়ে জ্বলন্ত ফ্লেয়ার। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মাঠে নেমে আসে নিরাপত্তাকর্মীরা। ম্যাচের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি বিলম্বিত হয়। টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে ওঠে এক অদ্ভুত দৃশ্য—একটি দল জিতেছে, অথচ তাদের সমর্থকেরা কাঁদছে।

সেদিন হামবুর্গের খেলোয়াড়দের চোখেও ছিল অশ্রু। কারণ তারা জানতেন, এটি শুধু একটি মৌসুমের ব্যর্থতা নয়; এটি একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সমাপ্তি। স্টেডিয়ামের সেই বিখ্যাত ঘড়ি, যা বছরের পর বছর ধরে বুন্দেসলিগায় ক্লাবটির টিকে থাকার সময় গুনে রেখেছিল, সেটি থেম গিয়েছিল সেই রাতে।

ফুটবল ইতিহাসে অনেক নাটকীয় ম্যাচ হয়েছে। অনেক দল শেষ মুহূর্তে শিরোপা জিতেছে, আবার অনেক দল অবিশ্বাস্যভাবে বেঁচেও গেছে। কিন্তু হামবুর্গের সেই রাত আলাদা। কারণ সেদিন তারা পরাজিত হয়নি। শেষ ম্যাচে তারা জয়ই পেয়েছিল। তবুও হারিয়ে ফেলেছিল তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়—বুন্দেসলিগার চিরন্তন সদস্য হওয়ার গৌরব।

তাই ২০১৮ সালের ১২ মে শুধু একটি ফুটবল ম্যাচের তারিখ নয়। এটি সেই দিন, যেদিন জয়ের উল্লাসকে গ্রাস করেছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অবনমনগুলোর একটি। আর যেদিন ধোঁয়ায় ঢেকে গিয়েছিল হামবুর্গের ৫৫ বছরের।