পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। এই জয়ের পর রাজ্যে সরকার গঠনের পথে রয়েছে দলটি। এতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলের ইতি ঘটতে যাচ্ছে। সেই সাথে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে বিভিন্ন পরিবর্তন আসতে পারে। দীর্ঘদিন শরে চলে আসা রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রের মধ্যকার টানাপোড়েন অনেকটাই কমে আসতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে নিরাপত্তা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনায়। বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ঘিরে দীর্ঘদিনের যেসব বিষয়; বিশেষ করে জমি অধিগ্রহণ, চোরাকারবারি ও অনুপ্রবেশ ইস্যুতে বড় ধরণের নীতিগত পরিবর্তন আসতে পারে।
সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ ও জমি অধিগ্রহণ :
ভারতের গুরুত্বপূর্ণ এই রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের সাথে দীর্ঘ একটি সীমান্ত রয়েছে বাংলাদেশের। প্রায় ২ হাজার ২১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তের একটি বড় অংশ এখনো সম্পূর্ণভাবে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা হয়নি। এর মূল কারণ হিসেবে অতীতে জমি অধিগ্রহণে জটিলতা এবং রাজ্য সরকারের সহযোগিতার অভাবকে দায়ী করে আসা হয়েছে।
বিজেপি ক্ষমতায় আসায় এবার কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মধ্যকার এই সংকট দূর হয়ে যেতে পারে। কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সমন্বয় বেড়ে সীমান্ত সুরক্ষা প্রকল্প দ্রুত এগোতে পারে। এতে অনুপ্রবেশ, গরু পাচার এবং জাল মুদ্রা চোরাচালান কমানোর লক্ষ্য বাস্তবায়ন সহজ হতে পারে। এক্ষেত্রে বিজেপির সরকার আরো কঠোর হতে পারে।
বিএসএফের ক্ষমতা বৃদ্ধি নিয়ে বিরোধ :
২০২১ সালে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএস)-এর কার্যপরিধি ১৫ কিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে ৫০ কিলোমিটার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু সেই সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিল। রাজ্য সরকার এটিকে প্রশাসনিক ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখেছিল এবং এর বিরুদ্ধে বিধানসভাতেও প্রস্তাব আনা হয়েছিল। এর ফলে রাজ্য পুলিশ ও বিএসএফের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল সেই সময়। বিজেপি ক্ষমতায় আসায় এবার কেন্দ্রীয় সরকারের আগের সিদ্ধান্তই বাস্তবায়নের পথে এগোতে পারে।
সিএএ বাস্তবায়ন :
নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ) নিয়ে কেন্দ্র ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ ছিল। কেন্দ্রীয় সরকার আইনটি কার্যকর করার পক্ষে থাকলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা করে এসেছে। মমতার পতনের পর বিজেপি ক্ষমতায় আসায় এবার বিজেপি তার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথে হাঁটতে পারে। এছাড়াও এতদিন রাজ্য সরকারের অনাগ্রহের কারণে প্রশাসনিক তথ্য আদাব-প্রদান ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে ধীরগতির হয়েছে বলে অভিযোগ করতো কেন্দ্রীয় সরকার। বিজেপি ক্ষমতায় আসায় সিএএ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া আরও সক্রিয় হতে পারে।
নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) :
জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) নিয়েও এতদিন কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে বড় ধরনের মতবিরোধ ছিল। কেন্দ্রীয় সরকার অবৈধ অভিবাসী শনাক্তে এই প্রক্রিয়া চালুর পক্ষে থাকলেও মমতার নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার এর বিরোধিতা করে এসেছে এতদিন। বিজেপি ক্ষমতায় আসায় এবার এনআরসি সংক্রান্ত কাজ দ্রুত এগোতে পারে। এতে পশ্চিমবঙ্গের অনেক মানুষের কপাল পুড়তে পারে।
এনআইএ ও কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার ভূমিকা :
ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ) সহ কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাগুলোর কার্যক্রম নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে রাজ্য–কেন্দ্র বিরোধ রয়েছে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ তদন্তে স্থানীয় পর্যায়ের সহযোগিতা নিয়ে বারবার বিজেপির কেন্দ্রীয় সরকার অভিযোগ করে এসেছে। বিশেষ করে সন্ত্রাসবাদ ও বিস্ফোরণ সংক্রান্ত মামলায় কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোর কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ করতো বিজেপি । এবার বিজেপি ক্ষমতায় আসায় এবার এসব সংস্থাকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হতে পারে।
নির্বাচনী সহিংসতা ও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন :
বিভিন্ন নির্বাচনের সময়ে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রের বিরোধ দেখা গেছে। রাজ্য সরকার একাধিকবার আদালতের দ্বারস্থ হয়ে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে। এর ফলে কিছু এলাকায় রাজনৈতিক সহিংসতা ও উত্তেজনার ঘটনা ঘটেছে বলেও দাবি করেছে বিজেপি। এবার এই অভিযোগেরও শেষ হতে পারে।
সূত্র: এনডিটিভি