১২ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ধর্মান্তর ঠেকাতে কঠোর আইন করছে পশ্চিমবঙ্গ; জমি কেনাবেচাতেও বিধিনিষেধ

অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউসিসির পর এবার জোরপূর্বক ধর্মান্তর ঠেকানো এবং জমি কেনাবেচায় নতুন আইনি বিধিনিষেধ আনার উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তবে প্রস্তাবিত ভূমি আইনে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে জমি বা সম্পত্তি কেনাবেচায় সরাসরি কোনো নিষেধাজ্ঞা থাকবে কি না, তা স্পষ্ট করেননি তিনি।

মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বাঁকুড়ায় পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন পর্ষদের এক পর্যালোচনা সভায় এসব কথা বলেন শুভেন্দু অধিকারী। সভায় তিনি জানান, জোরপূর্বক ধর্মান্তর ঠেকাতে শিগগিরই কঠোর আইন করা হবে। একইসঙ্গে জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রেও নতুন আইনি বিধিনিষেধ আনা হবে।

শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘আমরা খুব শিগগিরই ইউসিসি আনব—এক দেশ, এক আইন। এরপর আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ হবে জোরপূর্বক ধর্মান্তর ঠেকাতে কঠোর আইন করা এবং জমি কেনাবেচায় নতুন আইনি বিধিনিষেধ আনা।’

ধর্মান্তর এবং বিজেপির রাজনৈতিক প্রচারে ব্যবহৃত ‘ল্যান্ড জিহাদ’ ইস্যু দীর্ঘদিন ধরেই দলটির আলোচনার অন্যতম বিষয়। তবে প্রস্তাবিত ভূমি আইনে কী ধরনের বিধিনিষেধ থাকবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি মুখ্যমন্ত্রী। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর মধ্যে জমি কেনাবেচা এতে বাধাগ্রস্ত হবে কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়।

ভারতের সীমান্তবর্তী বিজেপিশাসিত কয়েকটি রাজ্যে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী ও এলাকায় জমি কেনাবেচার ওপর বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রস্তাবিত উদ্যোগের সঙ্গে সেসব আইনের তুলনাও শুরু হয়েছে। বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, অবৈধ অভিবাসনের কারণে সীমান্তবর্তী এলাকার জনসংখ্যার কাঠামো বদলে যাচ্ছে এবং স্থানীয় মানুষ জমি হারাচ্ছেন। নতুন ভূমি আইন নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যকে সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গেও মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।

মঙ্গলবারের সভায় বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম ও বীরভূমসহ বিভিন্ন জেলার সংসদ সদস্য, বিধায়ক, মন্ত্রী, জেলা প্রশাসক এবং প্রায় ৭৫ জন বিডিও উপস্থিত ছিলেন। সভায় শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ করেন, বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত কিছু সংগঠন বাঁকুড়া ও জঙ্গলমহল এলাকার দরিদ্র মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করছে। এসব সংগঠনের বিরুদ্ধে অবৈধ ধর্মান্তর ও ‘মৌলবাদী’ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও করেন তিনি।

এ সময় সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে তিনি বলেন, সীমান্তবর্তী জমি বিএসএফের হাতে দেওয়া হয়েছে, ‘অবৈধ’ ওবিসি তালিকা বাতিল করা হয়েছে, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাতা বন্ধ করা হয়েছে এবং মহররমে তলোয়ার বহন ঠেকানো হয়েছে।

শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘দুটি কাজ এখনও বাকি—ধর্মান্তর নিয়ে একটি আইন এবং জমি কেনাবেচা নিয়ে আরেকটি আইন। আমি দুটিই করছি।’

এ বক্তব্যের আগে গত জুনে পশ্চিমবঙ্গে ইউসিসি প্রণয়নের উদ্যোগের ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রস্তাবিত ইউসিসি বিল পর্যালোচনার জন্য অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি রঞ্জনা প্রকাশ দেশাইয়ের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠনের অনুমোদন দিয়েছে রাজ্য মন্ত্রিসভা। কমিটিকে খসড়া বিল পর্যালোচনা করে সুপারিশ দিতে চার সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে। এরপর বিলটি বিধানসভায় তোলার কথা রয়েছে।

প্রস্তাবিত ইউসিসিতে বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, সম্পত্তির উত্তরাধিকার ও দত্তক গ্রহণের ক্ষেত্রে অভিন্ন দেওয়ানি কাঠামো চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ এসব বিষয়ে ধর্মভিত্তিক ব্যক্তিগত আইনের পরিবর্তে অভিন্ন আইন কার্যকর করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে সংবিধানগত সুরক্ষা পাওয়া শ্রেণিগুলোর অধিকার বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে।

বাজেট অধিবেশনে বিলটি পাস হলে পশ্চিমবঙ্গ হবে ইউসিসি বাস্তবায়নকারী ভারতের চতুর্থ রাজ্য। বিজেপির জন্য বিষয়টি রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। বিধানসভা নির্বাচনের ইশতেহারে দলটি সরকার গঠনের ছয় মাসের মধ্যে ইউসিসি কার্যকরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

ইউসিসির পর ধর্মান্তর ও জমি কেনাবেচা নিয়েও আইন করার ঘোষণা দেওয়ায় পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের নীতিগত ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের পরবর্তী ধাপ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

Home R3