৯ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ইতালির এটনা আগ্নেয়গিরি সফর ও শিক্ষা

আবু নাঈম মু শহীদুল্লাহ


প্রকৃতির মাঝে এমন কিছু দৃশ্য আছে, যা মানুষকে শুধু মুগ্ধই করে না,বরং ভেতর থেকে নাড়া দেয়। পাহাড়, সাগর, বনভূমি, জীবজন্তুর বৈচিত্র্য।সবই মহান সৃষ্টিকর্তার নিদর্শন। আর সেই সব নিদর্শনের মাঝে মানুষ, আশরাফুল মাখলুকাত, দাঁড়িয়ে থাকে এক নীরব দর্শকের মতো।

এই পৃথিবীতে আল্লাহ মানুষের জন্য অসংখ্য নিদর্শন ছড়িয়ে রেখেছেন। কখনো শান্ত, কখনো ভয়ংকর। সেই ভয়ংকর সৌন্দর্যের এক বিস্ময়কর উদাহরণ হলো আগ্নেয়গিরি। সারা পৃথিবীতে প্রায় ১,৫০০টির মতো আগ্নেয়গিরি আছে, কিন্তু তাদের মধ্যেও আলাদা করে হৃদয়ে দাগ কাটে. ইতালির সিসিলি দ্বীপে দাঁড়িয়ে থাকা এক জীবন্ত আগুনের পাহাড়।

আমরা কয়েকজন একসঙ্গে এই আগ্নেয়গিরি দেখতে গিয়েছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল শুধু ভ্রমণ নয়।দেখা, ভাবা, এবং উপলব্ধি করা। আল্লাহর নিদর্শনগুলো দেখে নিজেদের সংশোধন করা, আর সেই উপলব্ধি অন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। এই সফরের পরিকল্পনাকারী ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক মেধাবী ছাত্রনেতা,যিনি এখন ইউরোপে বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের কাছে একজন সুপরিচিত দাঈ, শিক্ষক ও সংগঠক জনাব ড. আশরাফ মাহমুদ উজ্জ্বল। আতিথিয়েতা ও ব্যাবস্থাপনায় ছিলেন আব্দুর রহিম নাঈম,তাজুল ইসলাম, শহীদুল্লাহ দুলাল এনামুল হক সহ ইতালিতে বসবাসকারী আরো কিছু ভাই।

সিসিলি দ্বীপের উত্তর পূর্বাংশে এটনা অগ্নিগিরি যা প্রায় ১,১৯০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত।

দক্ষিণে কাতানীয়া শহর, উত্তর সমুদ্র, পূর্বে আয়োনিয়ান সাগর পশ্চিমে সিসিলির অভ্যন্তরীণ অঞ্চল এন্না সাগর,পাহাড় ও গ্রামীণ এলাকা বেষ্টিত এটনা অগ্নিগিরি। সিসিলি এয়ারপোর্টে থেকে প্রায় ২ ঘন্টা গাড়ির জার্নি তবে কাতানীয়া এয়ারপোর্ট থেকে আল্প সময়ে যাওয়া যায়।

এটনা অগ্নিগিরি এর সামনে দাঁড়িয়ে প্রথম যে অনুভূতিটা আসে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। মনে হয়, পৃথিবী এখানে নিঃশব্দে তার ভেতরের আগুনের কথা বলছে।

বিজ্ঞানীরা বলেন, প্রায় ৫ লাখ বছর আগে এই আগ্নেয়গিরির যাত্রা শুরু। কিন্তু বাস্তবে দাঁড়িয়ে মনে হয়,এ যেন সময়েরও আগের কোনো গল্প। খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ সাল থেকে এর অগ্ন্যুৎপাতের কথা মানুষ লিখে রেখেছে, কিন্তু আগুনের এই প্রবাহ তারও বহু আগে থেকে চলমান।

পৃথিবীর গভীরে জমে থাকা ম্যাগমা গলিত আগুনের মতো পাথর,যখন আর চাপ সহ্য করতে পারে না, তখন বিস্ফোরিত হয়ে উঠে আসে। সেই আগুন, সেই লাভা, সেই ধোঁয়া.সব মিলিয়ে এখানে তৈরি হয়েছে এক জীবন্ত শক্তির উৎস। সেখানে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, আমরা যেন মাটির ওপর নই,বরং আগুনের ওপর দাঁড়িয়ে আছি।

এটনা অগ্নিগিরীর উচ্ছতা প্রায় ১০,৯২২ ফুট। এটা ইউরোপের সর্বোচ্চ সক্রিয় আগ্নেয়গিরি। কিন্তু উচ্চতার চেয়েও বেশি বিস্ময় জাগায় এর উপস্থিতি।

কখনো ধোঁয়া উঠছে, কখনো আগুনের রেখা বেয়ে লাভা নেমে আসছে। দৃশ্যটা একই সঙ্গে ভীতিকর এবং অপূর্ব। মনে হয়, প্রকৃতি যেন একসঙ্গে তার রাগ আর সৌন্দর্য প্রকাশ করছে।

এই আগ্নেয়গিরি এখানকার মানুষের জীবনে এক অদ্ভুত দ্বৈততা তৈরি করেছে। একদিকে ধ্বংস, অগ্ন্যুৎপাত এলে ঘরবাড়ি, ফসল সব কিছু হারিয়ে যায়। অন্যদিকে আশীর্বাদ।এই আগ্নেয় ছাই মাটিকে উর্বর করে তোলে, নতুন জীবন জন্ম দেয়। মানুষ এখানে বাঁচে ভয় নিয়ে, আবার আশাও নিয়ে।

এই আগ্নেয়গিরির ইতিহাস শুধু পাথর আর লাভার নয়, ধ্বংসেরও বটে। ১৬৬৯ সালের এই অগ্ন্যুৎপাত মানব ইতিহাসে এক ভয়াবহ স্মারক।যেখানে মানুষের শক্তি, সভ্যতার অহংকার এবং জাগতিক নিরাপত্তা এক মুহূর্তে ভেঙে পড়ে মহান স্রষ্টার অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার সামনে। ইতালির এটনার এই বিস্ফোরণ যেন প্রকৃতির অন্তরে লুকিয়ে থাকা আগুনের এক সতর্কবার্তা, যা মানুষকে তার সীমাবদ্ধতা স্মরণ করিয়ে দেয়।

১৬৬৯ সালের মার্চ মাসে এর সূচনা হয়। প্রথমে ছিল হালকা কম্পন, গ্যাস নির্গমন,যেন নীরব এক ইঙ্গিত। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তা রূপ নেয় ভয়াল এক প্রলয়ে। পাহাড়ের বুকে ফাটল ধরে, আর সেখান থেকে বের হতে থাকে অগ্নিগর্ভ লাভা। এই জ্বলন্ত স্রোত ধীরে ধীরে গ্রাম, ক্ষেত-খামার ও বনভূমিকে গ্রাস করতে থাকে।যেন আগুনের নদী সবকিছু গিলে নিচ্ছে।

অল্প সময়ের মধ্যেই প্রায় ১৫টিরও বেশি গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। মানুষের ঘরবাড়ি, জীবিকা, গবাদিপশু—সব কিছু ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। যারা পালাতে পেরেছে, তারা বেঁচে গেছে আল্লাহর অশেষ রহমতে; আর অনেকেই আগুনের স্রোতে আটকে পড়ে প্রাণ হারায়। তখনকার সীমিত জ্ঞান ও প্রযুক্তি এই বিপর্যয়ের সামনে ছিল সম্পূর্ণ অসহায়।

সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাত আসে শহরের ওপর। লাভার প্রবাহ শহরের প্রাচীর ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়ে। আগুনের ঢেউ শহরের রাস্তায় রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে, ধ্বংস করে দেয় অসংখ্য স্থাপনা ও বসতি। একসময় প্রাণচঞ্চল এই নগরী পরিণত হয় নিঃস্তব্ধ ধ্বংসস্তূপে।

এই অগ্ন্যুৎপাত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকে। আকাশ ঢেকে যায় ছাই ও ধোঁয়ায়, বাতাস ভারী হয়ে ওঠে বিষাক্ত গ্যাসে। মানুষের শ্বাস নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে, পরিবেশ ও জীবজগতের ওপর নেমে আসে গভীর বিপর্যয়। এরপর ১৯২৮ সালের এই অগ্ন্যুৎপাত আধুনিক যুগের ইতিহাসে এক গভীর শিক্ষণীয় ঘটনা।যেখানে মানুষের শক্তি, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তার ধারণা মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে মহান স্রষ্টার ইচ্ছার সামনে। এটনা অগ্নিগিরীর বিস্ফোরণ কেবল একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয় ছিল না; বরং এটি ছিল মানুষের জন্য এক সতর্কবার্তা, এক পরীক্ষা।

১৯২৮ সালের নভেম্বর মাসে এর সূচনা হয়। একই নিয়মে প্রথমে হালকা কম্পন ও গ্যাস নির্গমন।যেন প্রকৃতি নীরবে সতর্ক করে দিচ্ছে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই পাহাড়ের ঢালে ভয়ংকর ফাটল সৃষ্টি হয় এবং সেখান থেকে বের হতে থাকে অগ্নিগর্ভ লাভা। এই উত্তপ্ত স্রোত দ্রুত চারপাশের জনপদ গ্রাস করতে থাকে, যেন আগুনের এক অপ্রতিরোধ্য ধারা।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শহর। লাভার স্রোত ধীরে ধীরে শহরটিকে ঘিরে ফেলে এবং শেষ পর্যন্ত প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। ঘরবাড়ি, উপাসনালয়, জীবিকার উপকরণ।সবকিছু আগুনের নিচে বিলীন হয়ে যায়। হাজার হাজার মানুষ জীবন বাঁচাতে পালাতে বাধ্য হয়। আল্লাহর অশেষ রহমতে বহু মানুষ প্রাণে বেঁচে গেলেও তাদের দুনিয়াবি অর্জন মুহূর্তেই মাটির সঙ্গে মিশে যায়।

লাভার প্রবাহ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে এটি রেললাইন, সড়কপথ এবং অন্যান্য অবকাঠামো ধ্বংস করে দেয়। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, উদ্ধার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। তৎকালীন সরকার সাহায্যের হাত বাড়ালেও ক্ষতির ব্যাপকতা ছিল সীমাহীন।

এই অগ্ন্যুৎপাতের প্রভাব ছিল দীর্ঘস্থায়ী। ছাই ও বিষাক্ত গ্যাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে পরিবেশ ও কৃষিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। মানুষের জীবনযাত্রা হয়ে ওঠে কঠিন ও অনিশ্চিত।

পরবর্তী সময়, বিশেষ করে ২০০১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত, আবারও বারবার অগ্ন্যুৎপাত ঘটিয়ে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ২০০১ সালের অগ্ন্যুৎপাত নতুন ফাটল সৃষ্টি করে এবং লাভার প্রবাহ পর্যটনকেন্দ্র ও স্থাপনাগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ২০০২–২০০৩ সালের অগ্ন্যুৎপাত ছিল আরও তীব্র, যার ছাই ও ধোঁয়া দূরবর্তী এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে।

২০১১ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ধারাবাহিক অগ্ন্যুৎপাত এটনার গঠনে পরিবর্তন আনে, আর ২০১৭ সালে আকস্মিক বিস্ফোরণে মানুষ আহত হয়।যা প্রমাণ করে, উন্নত প্রযুক্তি থাকলেও মানুষ প্রকৃতিকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ২০২১ সালে আবারও ধারাবাহিক অগ্ন্যুৎপাত বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয়; আকাশে উঠে যায় অগ্নিশিখা, ছাই ঢেকে ফেলে বিস্তীর্ণ অঞ্চল।

এসফর আমাকে আমার স্রষ্টার প্রতি আরো অনুগত করেছে। আমরা বোর্ডের লেখা গুলো পড়েছি, আর আল্লাহর কুদরতের এক জ্বলন্ত নিদর্শন দেখেছি।  বারবার মনে হয়েছে মানুষের আবিষ্কৃত প্রযুক্তির কোন কাজেই আসেনা যদি না আল্লাহ চান।


লেখক: আজীবন সদস্য ,বাংলাদেশ মানবাধিকার কাউন্সিল