বছরের পর বছর ধরে আলোচনায় থাকা ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত র্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন বা টিএফআই সেল নিয়ে আবারও সামনে এসেছে নতুন তথ্য। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারপতিদের পরিদর্শনের পর এই গোপন বন্দিশালা সম্পর্কে উঠে এসেছে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য। গোপন কক্ষ ও ‘ডেথ সেল’ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন করে আলোচনা।
টিএফআই সেলটি ঢাকার উত্তরায় বিমানবন্দর এলাকায় র্যাব-১ ব্যাটালিয়নের কম্পাউন্ডের ভেতরে অবস্থিত। অস্ত্রাগারের পাশে একটি পুরোনো দ্বিতল ভবনে এই সেলের অবস্থান। এটি র্যাবের গোয়েন্দা শাখা বা ইন্ট উইংয়ের অধীনে পরিচালিত হতো। গোপনীয়তার কারণে এর কোডনেম ছিল ‘হাসপাতাল’।
প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য স্থাপনাটি তৈরি করা হলেও অভিযোগ রয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এটি বলপূর্বক গুমের অন্যতম প্রধান বন্দিশালা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, লক্ষ্য নির্ধারণ করে মানুষকে অপহরণ, আটক, নির্যাতন এবং হত্যার অংশ হিসেবে বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করা হতো। টিএফআই সেলে আটক ব্যক্তিদের অনেক সময় অন্য গোপন বন্দিশালাতেও পাঠানো হতো।
পরিদর্শনে জানা যায়, ভবনটিতে মোট ২৯টি স্থায়ী সেল রয়েছে। নিচতলায় রয়েছে ১০টি সেল। প্রতিটি সেলের গড় আয়তন প্রায় ৫ ফুট বাই ৮ ফুট। এসব সেলের সঙ্গে ছিল খোলা টয়লেট। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা র্যাব সদস্যদের থাকার ব্যবস্থাও ছিল একই তলায়।
দ্বিতীয় তলায় রয়েছে আরও ১০টি সেল। এগুলোর গড় আয়তন প্রায় ১৪ ফুট বাই ৪ থেকে ৫ ফুট। সেখানে দুটি বড় কক্ষ ছিল, যেগুলোকে তথাকথিত ‘ভিআইপি সেল’ বলা হতো। একটি সেলের আয়তন প্রায় ১৪ ফুট বাই ১০ ফুট এবং অন্যটির প্রায় ১০ ফুট বাই ১০ ফুট। দুটি সেলের সঙ্গেই ছিল ছোট টয়লেট। একই তলায় ছিল র্যাবের গোয়েন্দা শাখার কর্মকর্তাদের কয়েকটি অফিস কক্ষ।
টিএফআই সেলের সবচেয়ে ভয়াবহ অংশ হিসেবে উঠে এসেছে সাতটি ‘ডেথ সেল’ বা ‘যম সেল’-এর তথ্য। প্রবেশমুখের সিঁড়ির কাছে থাকা এসব সেল ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ। প্রতিটি সেলের আয়তন ছিল প্রায় ২ ফুট বাই ৪ ফুট। এসব কক্ষেও ছিল খোলা টয়লেট।
বন্দির সংখ্যা বেড়ে গেলে দ্বিতীয় তলার খোলা অংশ বা করিডোরে ক্যানভাস ও কাপড়ের পার্টিশন দিয়ে অস্থায়ী সেল তৈরি করা হতো বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।
স্থাপনাটিতে ছিল তিনটি সাউন্ডপ্রুফ বিশেষ জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব কক্ষে নির্যাতনের বিভিন্ন সরঞ্জাম রাখা ছিল। এর মধ্যে ছিল ঘূর্ণায়মান স্টিলের চেয়ার, যেখানে বন্দিদের বসিয়ে বৈদ্যুতিক মোটরের সাহায্যে দ্রুত ঘোরানো হতো। ছিল বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার ব্যবস্থা, ছাদ থেকে ঝুলিয়ে রাখার ব্যবস্থা এবং মইয়ের মতো লোহার বেড, যেখানে বেঁধে নির্যাতন করা হতো।
এ ছাড়া জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষে কাটা হাত, উপড়ে ফেলা চোখ এবং নির্যাতনের শিকার মানুষের বিভৎস ছবি টাঙিয়ে রাখা হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আরও অভিযোগ ওঠে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর স্থাপনাটির দেয়াল, দরজা, জানালা ও অন্যান্য কাঠামো পরিবর্তন করা হয়। গোপন কক্ষগুলোর অস্তিত্ব আড়াল করতে বিভিন্ন জায়গায় দেয়াল তুলে দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানান, তদন্ত শুরু করার সময় সেখানে ক্যামোফ্লেজ তৈরি করা হয়েছিল। ফলে ভুক্তভোগীদের বর্ণনার সঙ্গে স্থাপনাটির মিল পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে তদন্তে দেখা যায়, কয়েকটি জায়গায় দেয়াল তুলে কক্ষগুলো আড়াল করা হয়েছে। দেয়াল সরানোর পর ২২টি গোপন কক্ষের সন্ধান পাওয়া যায়। এসব কক্ষের নিচে একটি ডেথ সেলও পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে সেখানে ২৯টি কক্ষ রয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এই ঘটনায় তৎকালীন সংশ্লিষ্টদের দায় রয়েছে এবং তাদের জবাব দিতে হবে। পাশাপাশি যারা পরে দেয়াল তুলে আয়নাঘর আড়াল করার চেষ্টা করেছে, তাদেরও বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ভেতরের দৃশ্য অত্যন্ত ভয়াবহ। ছোট-বড় ২৯টি কামরা বা সেলে ভিন্ন মতের মানুষকে বছরের পর বছর আটকে রেখে নির্যাতন করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। কাউকে দীর্ঘদিন পর বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে থানায় হস্তান্তর করা হতো। আবার অনেককে হত্যার পর মরদেহ গুম করে ফেলার অভিযোগও রয়েছে।
৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর উদ্ধার হওয়া কয়েকজন ভুক্তভোগী ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দিয়েছেন। তাদের মধ্যে ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাশেম আরমান অন্যতম। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে টিএফআই সেলে গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার বিচার চলছে।
চিফ প্রসিকিউটরের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত গুম ও হত্যার শিকার ২৫০ জনের বেশি মানুষের সন্ধান পাওয়া যায়নি। নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন ইলিয়াস আলী ও সুমনও।