আসামে উচ্ছেদ অভিযানে গৃহহীন ৪ হাজার মুসলিম

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে আবারও বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে রাজ্য সরকার। ধুবড়ি জেলার আলমগঞ্জে সরকারি জমি থেকে প্রায় ৭৫০টি বাঙালি মুসলিম পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। এতে একদিনে চার হাজারের বেশি মানুষ বসতভিটা হারিয়ে গৃহহীন হয়ে পড়েছেন।

গত রোববার (১ নভেম্বর) বিজেপিশাসিত আসামের ধুবড়ি জেলার ৯ নম্বর ব্লকের প্রায় ৬৫০ বিঘা সরকারি জমিতে এ অভিযান চালানো হয়।

বিকল্প আশ্রয়ের ব্যবস্থা না থাকায় উচ্ছেদ হওয়া অনেক পরিবার আত্মীয়স্বজনের বাড়ি, রাস্তার পাশের অস্থায়ী ঘর কিংবা নদীর চর এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করা পরিবারগুলোর ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দিতে প্রায় ৬০টি বুলডোজার ব্যবহার করা হয়। অভিযান চলাকালে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে উপস্থিত ছিলেন আসামের পুলিশের মহাপরিদর্শক অখিলেশ কুমার সিং এবং ধুবড়ির জেলা কমিশনার দিবাকর নাথ।

জেলা কমিশনার জানান, ওই এলাকায় মোট ৮০০ বিঘা জমি খালি করার জন্য উচ্ছেদের নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। তবে আদালত-সংক্রান্ত বিষয় বিচারাধীন থাকায় বাকি ১৫০ বিঘা জমিতে আপাতত অভিযান চালানো হয়নি। উচ্ছেদ হওয়া জমি শিল্প বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হবে। সেখানে পরিকল্পিত শিল্পপার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, প্রায় দুই বছর ধরে এ শিল্পপার্ক তৈরির পরিকল্পনা চলছে।

প্রশাসনের বক্তব্য, স্থানীয় বাসিন্দারা বিভিন্ন সময়ে সরকারি জমি দখল করে বসতি গড়ে তুলেছিলেন। তাঁদের অনেকের অন্যত্র জমি ও বিকল্প আশ্রয়ের ব্যবস্থা রয়েছে বলেও দাবি করেছেন জেলা কমিশনার।

তবে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর অনেকে প্রশাসনের এ বক্তব্য মানতে নারাজ। তাঁদের দাবি, কয়েক দশক ধরে তাঁরা ওই এলাকায় বসবাস করছেন। তাঁদের জীবিকা, স্মৃতি ও পারিবারিক শিকড় এই জমির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

৮০ বছর বয়সী এক বাসিন্দা জানান, ১৯৬২ সালে ব্রহ্মপুত্রের ভয়াবহ ভাঙন ও বন্যায় তাঁদের আদি বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এরপর গোয়ালপাড়া থেকে এসে তাঁরা আলমগঞ্জ এলাকায় আশ্রয় নেন। তাঁর দাবি, এলাকার অনেক বাসিন্দা ১৯৭২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তৌজি ব্যবস্থার অধীনে নিয়মিত জমির রাজস্ব দিয়ে এসেছেন। দীর্ঘদিন বসবাসের পর হঠাৎ উচ্ছেদের মুখে পড়ে তাঁরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। মসজিদ, উপাসনালয় ও কবরস্থানসংলগ্ন এলাকায় ভাঙচুরের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। অনেককে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়। কেউ কেউ পূর্বপুরুষের কবর ও দরগাহের সামনে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করেন। এ সময় একটি দরগাহ ভাঙার উদ্যোগ নেওয়ার মুখে একটি বুলডোজার বিকল হয়ে যায়। এর চালক অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়।

উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর অভিযোগ, প্রশাসন তাদের পুনর্বাসনের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা করেনি। ফলে শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে তাঁদের।

উল্লেখ্য, আসামে কয়েক মাস ধরে সরকারি জমি থেকে ধারাবাহিকভাবে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এসব অভিযানের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে বাঙালি মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলো। এতে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

Home R3