ইউরোপে অভিবাসনের গল্প কেবল একটি দেশ থেকে আরেকটি দেশে যাওয়ার গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের স্বপ্ন, ত্যাগ, পরিবার, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা।
পর্তুগালে আসা হাজারো অভিবাসীর ক্ষেত্রেও বাস্তবতা একই। কেউ বাংলাদেশে নিজের ব্যবসা ছেড়েছেন, কেউ জমি-জমা বিক্রি করেছেন, কেউ পরিবার-পরিজন রেখে একা ইউরোপে এসেছেন। কেউ ইউরোপের অন্য দেশে যাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও পর্তুগালকে বেছে নিয়েছেন একটি নির্দিষ্ট প্রত্যাশায়: বৈধভাবে বসবাস করব, কাজ করব, কর দেব, সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অবদান রাখব এবং নির্ধারিত সময় শেষে নাগরিকত্বের পথে এগিয়ে যাব।
দীর্ঘদিন ধরে সেই প্রত্যাশার কেন্দ্রে ছিল পাঁচ বছরের বৈধ বসবাস।
কিন্তু ১৯ মে ২০২৬ থেকে কার্যকর নতুন নাগরিকত্ব আইনে সাধারণভাবে EU ও CPLP দেশের নাগরিকদের জন্য বসবাসের সময়সীমা সাত বছর এবং অন্যান্য দেশের নাগরিকদের জন্য দশ বছর করা হয়েছে। বাংলাদেশের নাগরিকরা এই ১০ বছরের শ্রেণিতে পড়েন।
এখানেই তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ।
চার বছর আট মাসের মানুষটির কাছে দুই মাসের মূল্য কত?
একজন অভিবাসী চার বছর পর্তুগালে কাটিয়েছেন। আর মাত্র দুই মাস পর তাঁর পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার কথা ছিল।
রাষ্ট্রের ক্যালেন্ডারে দুই মাস হয়তো একটি ছোট সময়। কিন্তু একজন অভিবাসীর জীবনে এই দুই মাসের মূল্য অনেক বড়।
কারণ এই চার বছর আট মাসে সে শুধু সময় পার করেনি। সে কাজ করেছে। ভাড়া দিয়েছে। কর দিয়েছে। Social Security-তে অবদান রেখেছে। স্থানীয় অর্থনীতিতে অর্থ ব্যয় করেছে। পরিবার থেকে দূরে থেকেছে। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করেছে।
তার কাছে পাঁচ বছর ছিল শুধু একটি সংখ্যা নয়। ছিল একটি লক্ষ্য।
ছিল একটি স্বপ্ন। ছিল জীবনের নতুন অধ্যায়ের প্রত্যাশা।
এখন প্রশ্ন হলো, যে মানুষটি পুরোনো আইনের ওপর আস্থা রেখে প্রায় পাঁচ বছর পূর্ণ করে ফেলেছে, তার জন্য কি একটি বিশেষ transitional ব্যবস্থা থাকা উচিত ছিল না?
রাষ্ট্র আইন পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু মানুষের দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্তের ওপর সেই আইনের প্রভাবও রাষ্ট্রকে বিবেচনা করতে হয়।
অভিবাসীরা কি শুধু শ্রমিক?
পর্তুগালের অভিবাসীদের নিয়ে আলোচনায় একটি বিষয় প্রায়ই ভুলে যাওয়া হয়।
অভিবাসী শুধু শ্রমিক নয়।
সে একজন করদাতা।
সে একজন ভোক্তা।
সে একজন ব্যবসায়ী।
সে একজন ভাড়াটিয়া।
সে একজন উদ্যোক্তা।
সে একজন বাবা বা মা।
সে স্থানীয় অর্থনীতির অংশ।
পর্তুগালের বিভিন্ন খাতে অভিবাসীরা কাজ করছেন। নির্মাণ, কৃষি, রেস্টুরেন্ট, পরিবহন, পরিষেবা, প্রযুক্তি, পরিচর্যা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা থেকে শুরু করে বহু ক্ষেত্রে তাদের শ্রম ও উদ্যোগ দৃশ্যমান।
তারা রাষ্ট্রের কাছ থেকে শুধু সুবিধা নেয় না। রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও সামাজিক ব্যবস্থাতেও তারা অবদান রাখে।
তাই তাদের নিয়ে নীতি নির্ধারণের সময় শুধু তাদের কী দেওয়া হচ্ছে, তা নয়; তারা রাষ্ট্রকে কী দিচ্ছে, সেটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
€৯২০ আয়ের সঙ্গে €১,২০০-€১,৫০০ বাসা ভাড়া
২০২৬ সালে পর্তুগালের জাতীয় ন্যূনতম মাসিক মজুরি €৯২০।
অন্যদিকে লিসবন ও এর আশপাশের এলাকায় বাসস্থানের ব্যয় বহু নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য বড় চাপ তৈরি করেছে।
একজন অভিবাসী যদি ন্যূনতম মজুরির কাছাকাছি আয় করেন, তার সামনে থাকে ভাড়া, বিদ্যুৎ, পানি, খাবার, যাতায়াত, মোবাইল, পোশাক, চিকিৎসা, সন্তানদের ব্যয় এবং দেশে থাকা পরিবারের কাছে অর্থ পাঠানোর দায়িত্ব।
এখানে প্রশ্নটি খুব সাধারণ:
একজন মানুষ কীভাবে এই আয় দিয়ে একটি স্বতন্ত্র পরিবার নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করবে?
এই বাস্তবতার কারণেই অনেক অভিবাসী একটি ফ্ল্যাটের একাধিক কক্ষ ভাগ করে নেন। কখনো একটি বাসায় দুই বা তিনটি পরিবার বসবাস করে। কেউ একটি কক্ষ ভাড়া নেন, কেউ আবার অন্য পরিবারের সঙ্গে রান্নাঘর ও অন্যান্য সুবিধা ভাগ করে নেন।
এটি কোনো মানুষের স্বপ্নের ইউরোপ হওয়ার কথা ছিল না।
বাংলাদেশের একজন মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার অনেক সময় দেশে নিজস্ব বাড়ি, জমি কিংবা গাড়ি রেখে ইউরোপে আসে। অথচ পর্তুগালে এসে সেই একই পরিবারকে অনেক ক্ষেত্রে ভাড়া বাসায়, কখনো আবার shared accommodation-এ জীবন কাটাতে হয়।
তারপরও তারা থাকে। কারণ তারা শুধু আজকের জীবন দেখেনি। তারা ভবিষ্যৎ দেখেছে। কেন তারা অন্য দেশে যায়নি? এ প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বেতন, সামাজিক সুবিধা, কর্মসংস্থান এবং জীবনযাত্রার কাঠামো ভিন্ন। অনেক অভিবাসীর সামনে অন্য দেশে যাওয়ার সুযোগও ছিল।
কিন্তু তারা পর্তুগালকে বেছে নিয়েছে।
কেউ পাঁচ বছরের নাগরিকত্বের প্রত্যাশায়।
কেউ সহজতর residence pathway-এর কারণে।
কেউ পরিবারকে ভবিষ্যতে স্থিতিশীল করার আশায়।
কেউ শান্তিপূর্ণ পরিবেশের কারণে।
অর্থাৎ অনেক মানুষ তাদের জীবনের একটি বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পর্তুগালের বিদ্যমান আইন ও নীতির ওপর আস্থা রেখে।
এখন সেই নীতি পরিবর্তিত হলে প্রশ্ন উঠবেই:
আগের নীতির ওপর আস্থা রেখে যারা ইতোমধ্যে জীবনের কয়েকটি বছর বিনিয়োগ করেছেন, তাদের জন্য রাষ্ট্রের দায় কোথায়?
আইন পরিবর্তনের অধিকার আছে, কিন্তু আস্থার মূল্যও আছে
কোনো রাষ্ট্রই স্থির নয়। আইন পরিবর্তিত হতে পারে। অভিবাসন নীতি পরিবর্তিত হতে পারে। নাগরিকত্বের শর্তও পরিবর্তিত হতে পারে।
কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি শুধু আইন পরিবর্তনের ক্ষমতায় নয়; বরং আইন পরিবর্তনের সময় ন্যায্যতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং মানুষের legitimate expectation বিবেচনা করার মধ্যেও।
এ কারণেই transitional arrangement অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন আইনে ১৯ মে ২০২৬-এর আগে জমা দেওয়া pending nationality applications পুরোনো নিয়মে চলার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন থেকে যায়।
যারা এখনও নাগরিকত্বের আবেদন করার যোগ্যতা অর্জন করেননি, কিন্তু পুরোনো পাঁচ বছরের সময়সীমার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন, তাদের কি কোনো transitional protection দেওয়া যায় না?
চার বছর।
চার বছর ছয় মাস।
চার বছর আট মাস।
চার বছর এগারো মাস।
এই মানুষগুলোর অবস্থান কি একইভাবে বিবেচনা করা ন্যায্য?
রাষ্ট্রের কাছে এটি একটি নীতিগত প্রশ্ন।
মানুষের কাছে এটি জীবনের প্রশ্ন।
নাগরিকত্ব শুধু পাসপোর্ট নয়
অনেকের কাছে নাগরিকত্ব মানে শুধু একটি পর্তুগিজ পাসপোর্ট নয়।
এটি নিরাপত্তা।
এটি ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা।
এটি সন্তানদের জন্য একটি স্থিতিশীল পরিচয়।
এটি ইউরোপে দীর্ঘমেয়াদি জীবন পরিকল্পনার ভিত্তি।
এটি বারবার residence renewal-এর অনিশ্চয়তা থেকে বেরিয়ে আসার পথ।
তাই নাগরিকত্বের সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে দশ বছরে বাড়ানো মানে শুধু পাঁচ বছর অতিরিক্ত অপেক্ষা নয়।
একজন ২৫ বছর বয়সী মানুষের জন্য এটি জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দশক।
একজন ৩৫ বছর বয়সী মানুষের জন্যও তাই।
একজন পরিবার-পরিকল্পনাকারী মানুষের জন্য এটি আরও বড় বিষয়।
এখন প্রয়োজন অভিবাসী ও সরকারের মধ্যে সংলাপ
পর্তুগালের উচিত এই পরিবর্তনকে শুধু প্রশাসনিক সংস্কার হিসেবে না দেখে এর সামাজিক প্রভাবও মূল্যায়ন করা।
সরকার, Parliament, স্থানীয় প্রশাসন, ব্যবসায়ী সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন এবং অভিবাসী প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি বাস্তব সংলাপ প্রয়োজন।
বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে বৈধভাবে বসবাসরত ব্যক্তিদের নিয়ে পৃথক transitional ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
যারা পাঁচ বছরের সীমার খুব কাছে ছিলেন, তাদের জন্য কি কোনো বিশেষ বিধান সম্ভব?
যারা দীর্ঘদিন কর ও Social Security প্রদান করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে কি অতীতের residence period-এর মূল্যায়ন করা যায়?
যারা পুরোনো আইনের ওপর ভিত্তি করে Portugal-এ জীবন গড়ে তুলেছেন, তাদের legitimate expectation কীভাবে বিবেচনা করা হবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু অভিবাসীদের জন্য নয়, পর্তুগালের সামাজিক আস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
পর্তুগালকে অভিবাসীদের প্রতিপক্ষ নয়, অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে
অভিবাসীদের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক হওয়া উচিত পারস্পরিক আস্থার।
অভিবাসী রাষ্ট্রের আইন মেনে চলবে।
কর দেবে।
কাজ করবে।
সমাজে অবদান রাখবে।
আর রাষ্ট্র তাকে দেবে স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং মর্যাদা।
এই ভারসাম্য নষ্ট হলে শুধু অভিবাসী ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, রাষ্ট্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কারণ আস্থা হারালে মানুষ নতুন করে সিদ্ধান্ত নেয়। কেউ দেশ বদলায়। কেউ বিনিয়োগের পরিকল্পনা পরিবর্তন করে। কেউ পরিবার আনার সিদ্ধান্ত স্থগিত করে। কেউ আবার ভবিষ্যতের জন্য অন্য ইউরোপীয় দেশকে বেছে নেয়।
তাই এটি কেবল নাগরিকত্ব আইনের প্রশ্ন নয়।
এটি পর্তুগালের অভিবাসন নীতির বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন।
শেষ কথা
যে মানুষটি পাঁচ বছরের স্বপ্ন নিয়ে পর্তুগালে এসেছিল, তাকে শুধু একটি residence number হিসেবে দেখা যাবে না।
তার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার।
একটি জীবনের সঞ্চয়।
অসংখ্য রাতের পরিশ্রম।
দেশ থেকে দূরে থাকার কষ্ট।
সন্তানের মুখ দেখার আকাঙ্ক্ষা।
বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিন্তা।
এবং একটি উন্নত ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
রাষ্ট্রের আইন পরিবর্তনের অধিকার আছে। কিন্তু মানুষের স্বপ্ন ও ত্যাগের মূল্যও আছে।
তাই আজ পর্তুগালের নীতিনির্ধারকদের কাছে প্রশ্নটি সরল:
যারা পুরোনো পাঁচ বছরের নিয়মের ওপর বিশ্বাস রেখে নিজেদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বছরগুলো পর্তুগালে বিনিয়োগ করেছে, তাদের স্বপ্নের প্রতি কি একটি ন্যায্য transitional পথ তৈরি করা যায় না?
কারণ একজন অভিবাসীর কাছে পাঁচ বছর শুধু পাঁচটি বছর নয়।
এটি তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান পাঁচটি বছর।
আর সেই পাঁচ বছর যদি হঠাৎ আরও পাঁচ বছরের অপেক্ষায় পরিণত হয়, তাহলে রাষ্ট্রের কাছে সেটি একটি নতুন আইন হতে পারে; কিন্তু একজন মানুষের কাছে সেটি হতে পারে তার জীবনের একটি ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন।
লেখক : আবদুল আহাদ সালমান
প্রেসিডেন্ট : পর্তুগাল বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির (PBCCI)
সম্পাদক: ইউরোবাংলা