আন্তর্জাতিক জলসীমায় গাজাগামী মানবিক সহায়তা বহর ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ থেকে ইসরাইলি বাহিনীর হাতে আটক হওয়া আন্তর্জাতিক অধিকারকর্মীরা অবশেষে মুক্ত হয়ে তুরস্কে পৌঁছেছেন। টার্কিশ এয়ারলাইন্সের তিনটি বিশেষ ফ্লাইটে করে ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরে নামার পর, ইসরাইলি বন্দিশালায় তাদের ওপর চালানো অমানবিক ও ভয়ংকর নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন এই সমাজকর্মীরা।
তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলুকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তারা জানান, এই বর্বরতা আত্মরক্ষার জন্য ছিল না, এটি ছিল নিষ্ঠুর শাস্তি।
আনাদোলুর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুক্ত হয়ে আসা বিভিন্ন দেশের সমাজকর্মীদের শরীরে এখনও ইসরায়েলি পৈশাচিকতার ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট।
কানাডিয়ান অধিকারকর্মী ইহাব লোতায়েফ তার ব্যান্ডেজ করা হাত দেখিয়ে জানান, আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে তাদের ধরে নিয়ে যাওয়ার পর বন্দিশালায় তীব্র মানবিক সংকট তৈরি হয়েছিল। সেখানে অন্য বন্দিদের সাহায্য করা ও তৃষ্ণার্ত মানুষকে পানি দেওয়াটাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
লোতায়েফ বলেন, আমি খাঁচাবন্দি তৃষ্ণার্ত মানুষদের পানি দিচ্ছিলাম, যা এক ইসরায়েলি সৈন্যের সহ্য হয়নি। সে ক্ষিপ্ত হয়ে এসে সরাসরি আমার হাতে ছুরি দিয়ে আঘাত করে। ছুরির আঘাতে আমার হাতের স্বাভাবিক অনুভূতি হারিয়ে ফেলি। ওরা আমাদের ওপর প্রচণ্ড সহিংসতা চালিয়েছে। অনেকের পাঁজর ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সেই মারধর আত্মরক্ষার জন্য ছিল না; ওটা ছিল স্রেফ আমাদের শাস্তি দেওয়ার জন্য।
ভ্যাঙ্কুভার থেকে আসা আরেক কানাডিয়ান নাগরিক মাইকেল ফ্রান্স জানান, গাজায় মানবিক সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার অপরাধে ইসরায়েলি বাহিনী তাদের দুটি জাহাজকে ভাসমান টর্চার সেলে রূপান্তর করেছিল।
ফ্রান্স বলেন, আমাদের একটি মালবাহী লোহার কনটেইনারের ভেতর আটকে রাখা হয়েছিল। সম্পূর্ণ লোহার মেঝেতে আমাদের ঘুমাতে হতো। তারা আমাদের স্বাগত জানিয়েছিল ইলেকট্রোশক ডিভাইস দিয়ে। এছাড়া মানসিক নির্যাতনের অংশ হিসেবে প্রতি দুই-তিন ঘণ্টা পর পর কনটেইনারের ভেতর ফ্ল্যাশ ব্যাং গ্রেনেড ফাটানো হতো, যাতে আমরা ঘুমাতে না পারি।
তিনি আরও জানান, তার মাথায় ও মুখে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। জুতোবিহীন খালি পায়ের ওপর ইসরায়েলি সেনারা ভারী মিলিটারি বুট দিয়ে অনবরত পাড়া দিয়েছিল। তবে ফ্রান্স জোর দিয়ে বলেন, আমরা কোনো হিরো নই। আমরা আমাদের ক্ষত নিয়ে কথা বলছি কেবল ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য। কারণ, গাজার মানুষ প্রতিদিন যা সহ্য করছে, তার তুলনায় আমাদের ওপর হওয়া এই আচরণ কিছুই না।
নিউজিল্যান্ডের মাওরি সম্প্রদায়ের অধিকারকর্মী হাহোনা ওর্মসবি জানান, জাহাজ থেকে ধরে তাদের আশদোদ বন্দরে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত নির্মমভাবে পেটানো হয়েছে। ওর্মসবি বলেন, আমাকে চেয়ারে বেঁধে যৌনাঙ্গে লাথি মারা হয়েছে, অনবরত মুখে ঘুসি মারা হয়েছে। আমি পুরোটা সময় চুপ ছিলাম, তাও রেহাই পাইনি। আমার ধারণা, আমার আদিবাসী চেহারা ও শরীরের মাওরি ট্যাটু দেখে বর্ণবাদী মনোভাব থেকেই ওই সেনারা আমার ওপর বেশি ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছে। দেয়ালের সঙ্গে সজোরে আঘাত করায় তাঁর ঠোঁট ও হাত কেটে গেছে।
তবে এই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার পরও ফ্লোটিলার অধিকারকর্মীরা একবাক্যে জানিয়েছেন, তাদের এই বেদনা গাজার ফিলিস্তিনিদের প্রতিদিনের যন্ত্রণার তুলনায় অত্যন্ত সামান্য। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো ইসরায়েলি ‘গণহত্যা’ বন্ধে বিশ্বের সব দেশের সরকারকে কেবল বিবৃতি না দিয়ে অবিলম্বে যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।