৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

কেরালার বাম দুর্গে ঐতিহাসিক জয় পেল হিজাবী মুসলিম তরুণী

কেরালার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে বামপন্থিদের অন্যতম শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত পেরামব্রা বিধানসভা কেন্দ্রে এবার দেখা দিয়েছে এক নাটকীয় পরিবর্তন। যেখানে একসময় বাম জোটের নিরঙ্কুশ প্রভাব ছিল, সেখানে সাম্প্রতিক নির্বাচনে ভোটের হিসাব-নিকাশ বদলে দিয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিয়েছে ভোটাররা। স্থানীয় ইস্যু, প্রার্থী নির্বাচন এবং জাতীয় রাজনীতির প্রভাব—সব মিলিয়ে পেরামব্রার এই ফলাফল শুধু একটি আসনের নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক সমীকরণেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।

মঙ্গলবার (৫ মে) প্রকাশিত নির্বাচনী ফলাফলে দেখা গেছে, সেখানে সিপিআই(এম)-এর প্রবীণ নেতা রামকৃষ্ণানকে পরাজিত করে বিপুল জয় পেয়েছেন ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগের প্রার্থী ফাতেমা তাহলিয়া।

এই জয়ের মাধ্যমে ৩৪ বছর বয়সী এই আইনজীবী কেবল বাম দুর্গে ফাটলই ধরাননি, বরং মুসলিম লীগের ইতিহাসে প্রথম নারী বিধায়ক হিসেবে এক অনন্য রেকর্ড গড়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পেরামব্রার এই ফলাফল কেরালার ঐতিহ্যগত রাজনৈতিক সমীকরণে একটি নতুন ও শক্তিশালী বার্তা প্রদান করেছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ফাতেমা তাহলিয়া মোট ৬৩ হাজার ৯৯৯ ভোট পেয়ে ৪ হাজার ৭০০ ভোটের ব্যবধানে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করেছেন। কোজিকোড জেলার পেরুভায়ালে জন্মগ্রহণ করা এই তরুণী পেশায় একজন আইনজীবী।

তিনি কোজিকোড সরকারি আইন কলেজ থেকে এলএলবি এবং ত্রিশুর সরকারি আইন কলেজ থেকে এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেছেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন এবং মুসলিম স্টুডেন্ট ফেডারেশনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। বর্তমানে তিনি মুসলিম ইয়ুথ লীগের রাজ্য সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করছেন এবং এর আগে কোজিকোড করপোরেশনের কাউন্সিলর হিসেবেও তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে।

তবে ফাতেমা তাহলিয়ার এই নির্বাচনী জয় সহজসাধ্য ছিল না। প্রার্থিতা ঘোষণার পর থেকেই তাকে নানা ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়েছে। হিজাব পরিহিত একজন মুসলিম তরুণী হিসেবে তার নেতৃত্ব গ্রহণ করতে না পেরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিরোধী পক্ষ থেকে ব্যাপক সাইবার হামলা ও অনলাইন হয়রানি চালানো হয়।

এমনকি তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত যোগ্যতা নিয়েও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা হয়েছিল। কিন্তু সব ধরনের প্রতিকূলতা ও কুৎসা উপেক্ষা করে তিনি সাধারণ মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে জনমত গঠন করেন এবং শেষ পর্যন্ত জয় ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হন।

কেরালার এই বিশেষ আসনটিতে গত কয়েক দশক ধরে বামপন্থিদের একচেটিয়া আধিপত্য থাকলেও তাহলিয়ারুণ্যের জোয়ার সেই ধারাকে বদলে দিয়েছে। তার এই বিজয়কে কেরালার রাজনীতিতে নারী ও তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বের বড় বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নির্বাচনের এই ফলাফল কেবল একটি আসনের পরিবর্তন নয়, বরং মুসলিম লীগের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নারীদের অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল। ফাতেমা তাহলিয়া এখন কালিকট জেলা আদালতে আইন পেশার পাশাপাশি বিধানসভাতেও সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হবেন বলে তাঁর সমর্থকরা আশা প্রকাশ করছেন।