জার্মানিতে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণের পর প্রথম কয়েকটি দিন যেন কেটে যায় একরকম স্বপ্নের ঘোরে। বিমানবন্দরের ছবি, নতুন শহর ঘুরে দেখা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই মুহূর্তগুলো ভাগাভাগি করার মধ্যেই শেষ হয় প্রাথমিক উচ্ছ্বাস।
তবে প্রথম সপ্তাহ শেষ হতেই অনেকের সামনে আসে বাস্তবতা। পরিবার, মায়ের হাতের রান্না, বন্ধু-বান্ধব এবং পরিচিত পরিবেশের জন্য মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে শুরু হয় সম্পূর্ণ নতুন কর্মপরিবেশ, ভিন্ন ভাষা এবং অপরিচিত সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অনুভূতিকে বলা হয় ‘সংস্কৃতিজনিত ধাক্কা’ এবং ‘দেশকাতরতা’। জার্মানিতে পৌঁছানোর পর প্রথম ৩০ দিনের মধ্যে এমন মানসিক পরিবর্তন হওয়া একেবারেই স্বাভাবিক।
নতুন পরিবেশে নিজেকে মানসিকভাবে দৃঢ় রাখা এবং একজন দক্ষ পেশাজীবীর মতো দ্রুত মানিয়ে নিতে অভিজ্ঞরা কয়েকটি বাস্তবসম্মত পরামর্শ দিয়েছেন।
দেশের মায়া কাটাতে যা করবেন :
নির্দিষ্ট সময়ে পরিবারের সঙ্গে কথা বলুন : সারাদিন বারবার দেশে যোগাযোগ না করে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন। যেমন, কাজ শেষে বা পরিবারের সুবিধাজনক সময়ে কথা বলুন। সারাক্ষণ ফোনে ব্যস্ত থাকলে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
নিজেই রান্না শুরু করুন : শুরু থেকেই দেশি খাবার রান্নার চেষ্টা করুন। পরিচিত স্বাদের খাবার মানসিক চাপ অনেকটাই কমিয়ে দেয় এবং ঘরের অনুভূতি ফিরিয়ে আনে।
স্থানীয় প্রবাসী কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত হোন : নিজ শহর বা দেশের প্রবাসীদের সঙ্গে পরিচিত হন। ছুটির দিনে একসঙ্গে সময় কাটানো বা এক কাপ চায়ের আড্ডাও একাকীত্ব অনেকটা দূর করতে পারে।
জার্মান কর্মসংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার উপায় : জার্মানিতে কর্মক্ষেত্রে শুধু দক্ষতাই নয়, একজন কর্মীর আচরণ, দায়িত্ববোধ এবং শেখার আগ্রহকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সময়ানুবর্তিতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিন : কাজের জায়গা বা প্রশিক্ষণকেন্দ্রে কখনো দেরি করবেন না। বরং নির্ধারিত সময়ের ৫ থেকে ১০ মিনিট আগে পৌঁছানোর অভ্যাস গড়ে তুলুন। এটি আপনার দায়িত্বশীলতার পরিচয় বহন করে।
হাসিমুখে অভিবাদন ও আত্মবিশ্বাসী আচরণ : সহকর্মীদের প্রতিদিন স্পষ্টভাবে শুভেচ্ছা জানান এবং কথা বলার সময় চোখে চোখ রেখে কথা বলুন। এটি পেশাদার ও আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তিত্বের পরিচায়ক।
ভাষা নিয়ে ভয় নয় : প্রাথমিক জার্মান ভাষা জানা থাকলেও স্থানীয়দের দ্রুত কথা বলা বা আঞ্চলিক উচ্চারণ বুঝতে শুরুতে সমস্যা হওয়াই স্বাভাবিক।
ভুল করতে ভয় পাবেন না : শুরুতে ভুল হওয়া স্বাভাবিক। শেখার আগ্রহ দেখালে সহকর্মীরা সাধারণত সমালোচনা না করে সহযোগিতাই করেন।
না বুঝলে আবার জিজ্ঞেস করুন : কোনো নির্দেশনা পরিষ্কার না হলে অনুমান করে কাজ না করে বিনয়ের সঙ্গে আবার ধীরে বুঝিয়ে বলতে অনুরোধ করুন। এতে ভুলের সম্ভাবনা কমে।
সবসময় একটি ছোট নোটবই সঙ্গে রাখুন : কাজের প্রথম ৩০ দিনে অনেক নতুন নিয়ম ও নির্দেশনা জানতে হয়। তাই পকেটে একটি ছোট নোটবই ও কলম রাখুন। প্রশিক্ষক বা সুপারভাইজার কোনো নির্দেশনা দিলে সঙ্গে সঙ্গে লিখে রাখুন। এতে একই বিষয় বারবার জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন হয় না এবং আপনার পেশাদারিত্বও প্রকাশ পায়।
মনে রাখুন :
একদিনে নতুন দেশ, নতুন সংস্কৃতি এবং নতুন কর্মপরিবেশের সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। প্রথম দিকে ক্লান্তি, একাকীত্ব বা মন খারাপ হওয়া স্বাভাবিক।
তবে ধৈর্য ধরে প্রথম ৩০ দিনের এই সময়টি পার করতে পারলে ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস বাড়ে, নতুন পরিবেশ পরিচিত হয়ে ওঠে এবং একসময় এই চ্যালেঞ্জগুলোই আপনার সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হয়। তখনই শুরু হয় একটি স্বাধীন, আত্মনির্ভরশীল এবং আন্তর্জাতিক জীবনের নতুন অধ্যায়।