ভারতে গরু পাচারের অভিযোগে শত শত মুসলিম নাগরিককে পায়ে গুলি করে পঙ্গু করে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে মার্কিন সংবাদ সংস্থা ‘অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস’-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। দেশটির হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠদের সন্তুষ্ট করতে মুসলিমদের টার্গেট করে ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশে পুলিশ এ ধরনের বিচারবহির্ভূত নিপীড়ন চালাচ্ছে বলে জানিয়েছেন মানবাধিকার কর্মীরা।
স্থানীয়ভাবে ‘অপারেশন ল্যাংড়া’ নামে পরিচিত এই কৌশল এখন উত্তর প্রদেশ ছাড়িয়ে ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে।
‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট’-এর গবেষণার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০২০ সাল থেকে উত্তর প্রদেশে গরু পাচারের অভিযোগে প্রায় ৬৫০টি ঘটনায় পুলিশ গুলি চালিয়ে সন্দেহভাজনদের আহত করেছে। এগুলোর নিরপেক্ষ পর্যালোচনায় দেখা গেছে—আক্রান্তদের প্রায় সবাই মুসলিম।
প্রতিটি ঘটনায় দেখা গেছে, গুলির আঘাত একই জায়গায়—পায়ের হাঁটুর ঠিক নিচে। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, কেবল পুলিশ যেসব ঘটনা জনসম্মুখে এনেছে, তার ওপর ভিত্তি করেই এ তথ্য। ফলে বাস্তবে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি।
উত্তর প্রদেশের সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা অমিতাভ জাস এই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, পুলিশ কেবল আত্মরক্ষার্থেই গুলি চালায়। এছাড়া হাঁটুর নিচে গুলি করার কোনো অফিশিয়াল নির্দেশ নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকেরা বলছেন অন্য কথা। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক মেডিসিনের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কলিম খান জানান, দৌড়ে পালানো বা সংঘর্ষে লিপ্ত থাকা কোনো ব্যক্তির পায়ে এত দূর থেকে হাড় না ছুয়ে কেবল মাংসপেশি ভেদ করে সমান্তরালভাবে গুলি লাগা বাস্তবে অসম্ভব। তিনি বলেন, ‘এটি আত্মরক্ষায় করা গুলি নয়, বরং একদম কাছ থেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে চালানো গুলি।’
বিচারবহির্ভূত এই কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ভারতের বিচার বিভাগ থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে এলাহাবাদ হাইকোর্ট উত্তর প্রদেশ পুলিশের এই কর্মকাণ্ডের কড়া সমালোচনা করে জানান, বিচারে পুলিশের এ ধরনের স্বঘোষিত ভূমিকা সম্পূর্ণ বেআইনি। হাইকোর্টের এক বিচারক মন্তব্য করেন, ‘পুলিশের এই এনকাউন্টার, বিশেষ করে সন্দেহভাজনদের পায়ে গুলি করার ঘটনাটি এখন নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, যা সংবিধানের পরিপন্থি।’
মানবাধিকার কর্মী সন্দীপ পান্ডের মতে, ‘এটি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত সহিংসতা। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার এবং উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের ধর্মীয় ভাবাবেগ ও ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কাজে লাগিয়ে হিন্দু ভোটারদের আকৃষ্ট করতে মুসলিমদের এভাবে টার্গেট করা হচ্ছে।’