প্যারিসে অভিবাসীদের মর্যাদা রক্ষার আহ্বান পোপের

ফ্রান্স সফরের দ্বিতীয় দিনে শনিবার প্যারিসের একটি অভিবাসী সহায়তা কেন্দ্রে গিয়ে অভিবাসী ও নির্বাসিত ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন পোপ লিও চতুর্দশ। এ সময় তিনি মানুষের মর্যাদা রক্ষা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

প্যারিসের ১৮তম অ্যারোন্দিসমঁতে অবস্থিত ‘ম্যাজোঁ বাখিতা’ নামের ওই কেন্দ্রটি ২০১৯ সাল থেকে বিভিন্ন দেশের ও ধর্মের অভিবাসী ও নির্বাসিত ব্যক্তিদের সহায়তা দিয়ে আসছে। কেন্দ্রটির নাম নেওয়া হয়েছে সুদানের সাবেক দাসী জোসেফিন বাখিতার নাম থেকে, যিনি পরে ধর্মযাজক হন এবং ক্যাথলিক চার্চের ধর্মীয় ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি পান।

শনিবার কেন্দ্রটিতে আফগানিস্তান ও নাইজেরিয়া থেকে আসা নির্বাসিত ব্যক্তিদের বক্তব্য শোনেন পোপ লিও। পরে তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে সাক্ষাৎ এবং ‘মর্যাদা ও শান্তির সঙ্গে একসঙ্গে বসবাস’ করা সম্ভব।

পোপ বলেন,এটি এমন একটি বাড়ি, যা পুরো শহরকে দেখায় যে মানুষের মধ্যে সাক্ষাৎ করা এবং মর্যাদা ও শান্তির সঙ্গে একসঙ্গে বসবাস করা সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, “চার্চ ও মানবতার ইতিহাস তাদের দ্বারা লেখা হয় না, যারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে এবং জায়গা দখল করে বিজয়ী হওয়ার ছাপ দেয়। বরং তাদের দ্বারা লেখা হয়, যারা জায়গা তৈরি করে, শান্তির প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করে, মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি করে এবং জীবনকে উৎসাহিত করে।”

পোপ লিও বলেন, সেইন্ট বাখিতা আমাদের অদৃশ্য মানুষদের দেখতে আহ্বান জানান। অর্থনীতি ও সংস্কৃতি যাদের আজ দাসত্বের মধ্যে ঠেলে দেয়, তাদের মুক্ত করতে এবং প্রতিটি ভাই ও বোনের অসীম মর্যাদাকে সম্মান করতে তিনি আমাদের আহ্বান জানান।

ম্যাজোঁ বাখিতার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কয়েক মাস পর ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনের আগে অভিবাসন ইস্যু আবারও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে আসতে পারে। এমন সময়ে পোপের এই সফরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন তারা।

কেন্দ্রটি পরিচালনাকারী সংগঠনের কর্মকর্তারা জানান, ২০১৭ সালে প্রয়াত পোপ ফ্রান্সিস বিদেশিদের ‘স্বাগত জানানো, সুরক্ষা দেওয়া, উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করা এবং সমাজে অন্তর্ভুক্ত করার’ আহ্বান জানিয়েছিলেন। সেই আহ্বানের পরই ম্যাজোঁ বাখিতার কার্যক্রম শুরু হয়।

আলজেরিয়া, আফগানিস্তান, বেলারুশ, ইরাক ও আইভরি কোস্ট থেকে আসা ৬ জন অভিবাসী ও নির্বাসিত ব্যক্তির সঙ্গে পোপ লিও সাক্ষাৎ করেন। তাদের কেউ মুসলিম, কেউ খ্রিস্টান। বৈধতা থাকুক বা না থাকুক, নির্বাসিত ও অভিবাসীদের সহায়তা দিয়ে আসছে কেন্দ্রটি।

ম্যাজোঁ বাখিতার প্রেসিডেন্ট ভ্যালেরি মোনিওদ বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, “এটি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। ফ্রান্সে যখন কঠিন একটি বছর সামনে আসছে, আর্থিক সংকট ও নির্বাসিত ব্যক্তিদের নিয়ে সহজ ও কঠোর সমাধানের প্রবণতার মধ্যে পোপ ফরাসিদের বলতে এসেছেন যে, আমাদের রাজনৈতিক বিশ্বাস যা-ই হোক না কেন, আমরা সবাই মানুষ এবং মর্যাদা পাওয়ার অধিকার সবার রয়েছে।”

ম্যাজোঁ বাখিতার পরিচালক ইসাবেল কোশোয়া বলেন, ফরাসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রায় ৭ মাস আগে পোপ আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, ‘‘অন্য দেশ থেকে আসা মানুষদের স্বাগত জানানো ক্যাথলিক চার্চের সামাজিক মতবাদের অংশ।

ফ্রান্সে পোপের এই সফর অভিবাসীদের মর্যাদা রক্ষার বিষয়ে তার আগের অবস্থানেরও ধারাবাহিকতা বলে মনে করা হচ্ছে। ২০২৫ সালের মে মাসে পোপ নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে রবার্ট ফ্রান্সিস প্রেভোস্ট নিয়মিতভাবে নির্বাসিত ও শরণার্থীদের মর্যাদা রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিরও তিনি সমালোচনা করেছেন।

ম্যাজোঁ বাখিতায় পোপের সফর প্রায় ৩০ মিনিট স্থায়ী হয়। কেন্দ্রটির দেয়ালে বাইবেলের মথি রচিত সুসমাচারের একটি বাণী লেখা রয়েছে— “আমি একজন বিদেশি ছিলাম এবং তোমরা আমাকে গ্রহণ করেছিলে।”

ফ্রান্সের অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা কেন্দ্রের সমন্বয়কারী মার্সেলা ভিয়ালোবোস বলেন, অভিবাসীরা বর্তমান সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা এবং ইউরোপীয় সমাজকে তারা নিজেদের দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া মানুষদের কীভাবে গ্রহণ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে ভাবতে বাধ্য করছে।

তিনি বলেন, পোপ লিও চতুর্দশ এদিন যেসব নারী-পুরুষ মানুষের জন্য কাজ করছেন, তাদের সঙ্গে সময় কাটাতে এসেছেন—এটি তাদের কাজের প্রতি বড় ধরনের স্বীকৃতি।

ফ্রান্স সফরের দ্বিতীয় দিনে পোপ লিও চতুর্দশের আরও একটি বড় কর্মসূচি ছিল। শনিবার বিকেলে প্যারিসের প্লাস দ্য লা কনকর্ড ও অ্যাভিনিউ শঁ-এলিজেতে তিনি একটি বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এতে প্রায় ৭ লাখ মানুষের অংশ নিয়েছেন বলে জানিয়েছে ভ্যাটিকান কর্তৃপক্ষ।

সূত্র : ইনফোমাইগ্রেন্টস বাংলা

Home R3