আবদুল আহাদ সালমান
উন্নত জীবনের আশায় মানুষ নিজের দেশ ছেড়ে ইউরোপে আসেন। স্বপ্ন দেখেন, ভালো আয় করবেন, পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবেন, সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়বেন। দেশে থাকা মা-বাবার পাশে দাঁড়াবেন। নিজের ও পরিবারের জন্য একটি নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করবেন।
কিন্তু ইউরোপে এসে অনেকের সেই স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে পর্তুগালে বসবাসরত অনেক প্রবাসীর জীবনে এখন সবচেয়ে বড় চিন্তার নাম বাসাভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ এবং মাস শেষে সংসার চালানোর হিসাব।
দেশে হয়তো নিজের বাড়ি ছিল। থাকার জন্য আলাদা করে ভাড়া গুনতে হতো না। পরিবারের সবাই মিলে মোটামুটি স্বচ্ছন্দে জীবন কাটত। অথচ বিদেশে এসে সেই মানুষটিকেই একটি রুমের ভাড়া জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয়। অনেককে অন্যের সঙ্গে বাসা ভাগাভাগি করে থাকতে হয়। মাস শেষে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে নিজের প্রয়োজনও কমিয়ে আনতে হয়।
প্রশ্ন হলো, যে উন্নত জীবনের আশায় মানুষ দেশ ছাড়েন, সেই জীবনের বাস্তব চিত্র কি এমন হওয়ার কথা?
বেতন আছে, কিন্তু সংসার চলে কীভাবে?
২০২৬ সালে পর্তুগালের জাতীয় সর্বনিম্ন মাসিক বেতন ৯২০ ইউরো। এই বেতন থেকে সামাজিক নিরাপত্তার জন্য ১১ শতাংশ কেটে নিলে হাতে থাকে প্রায় ৮১৯ ইউরো। আয়কর প্রযোজ্য হলে হাতে পাওয়া অর্থের পরিমাণ আরও কমতে পারে।
এবার একজন সাধারণ কর্মজীবী মানুষের কথা ভাবুন। তিনি প্রতিদিন কাজে যান, পরিশ্রম করেন এবং মাস শেষে বেতন পান। সেই টাকা দিয়ে তাঁকে বাসাভাড়া, খাবার, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, যাতায়াত ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে হয়।
দেশে থাকা পরিবারের জন্য টাকা পাঠানোর দায়িত্বও অনেকের রয়েছে।
এখন যদি তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান পর্তুগালে থাকেন, তাহলে খরচ আরও বেড়ে যায়। সন্তানদের খাবার, পোশাক, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে হয়। পরিবারের জন্য উপযুক্ত একটি বাসাও প্রয়োজন।
ধরা যাক, একটি বাসার মাসিক ভাড়া ৯০০ ইউরো। অথচ একজন কর্মীর হাতে বেতন আসে প্রায় ৮১৯ ইউরো। অর্থাৎ, তাঁর পুরো বেতন দিয়েও বাসাভাড়া পরিশোধ করা সম্ভব নয়। খাবার কেনা, বিল দেওয়া কিংবা পরিবারের অন্য খরচ মেটানোর প্রশ্ন তো পরেই আসে।
এ অবস্থায় একজন মানুষ কীভাবে সংসার চালাবেন?
তাঁকে কি আরও বেশি কাজ করতে হবে? স্ত্রীকেও কি কাজে নামতে হবে? সন্তানদের প্রয়োজন কমিয়ে দিতে হবে? নাকি পরিবারের সবাইকে নিয়ে ছোট একটি বাসায় আরও কয়েকজনের সঙ্গে থাকতে হবে?
বাস্তবে অনেক প্রবাসীকে এমন কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হয়।
একই বাসায় অনেকের বসবাস, তবু খরচ সামলানো কঠিন :
লিসবন ও আশপাশের এলাকায় বাসাভাড়ার চাপ অনেক কর্মজীবী মানুষের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি পরিবারের উপযোগী বাসা ভাড়া নিতে গেলেই আয়ের বড় অংশ ব্যয় হয়ে যেতে পারে।
এ কারণে অনেকে এক বাসায় কয়েকজন মিলে থাকেন। কেউ একটি রুম ভাড়া নেন, কেউ আবার একই রুমে একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে বসবাস করেন। এতে খরচ কিছুটা কমলেও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, মানসিক শান্তি ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ কমে যায়।
যাঁরা অবিবাহিত, তাঁদের জীবনেও রয়েছে নানা কষ্ট। দীর্ঘ কর্মঘণ্টার পর নিজের মতো করে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ অনেক সময় থাকে না। আবার যাঁদের স্ত্রী-সন্তান দেশে রয়েছেন, তাঁরা একদিকে বিদেশে নিজের খরচ চালান, অন্যদিকে দেশে পরিবারের জন্য টাকা পাঠান।
অনেকের কাছে মাস শেষে সঞ্চয় তো দূরের কথা, প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, সবাই একই পরিস্থিতিতে নেই। কারও আয় বেশি, কারও কম। কারও বাসাভাড়া কম, কারও বেশি। তবু নিম্ন আয়ের কর্মজীবী মানুষের জন্য আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান যে বড় সমস্যা, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
দেশে স্বচ্ছন্দ জীবন, বিদেশে প্রতিদিনের হিসাব :
প্রবাসজীবনের সবচেয়ে কষ্টের দিকগুলোর একটি হলো, অনেক মানুষ নিজের দেশেই তুলনামূলক স্বচ্ছন্দ জীবন ছেড়ে বিদেশে এসে নতুন করে সংগ্রাম শুরু করেন।
দেশে নিজের বাড়ি থাকলে অন্তত মাথা গোঁজার জায়গা নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। পরিবারের সদস্যরা কাছাকাছি থাকেন। বিপদে-আপদে আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত মানুষের সাহায্য পাওয়া যায়।
কিন্তু বিদেশে এসে সবকিছু নতুন করে গড়ে তুলতে হয়। বাসা ভাড়া নিতে হয়, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে হয়, কাজ খুঁজতে হয় এবং নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়।
তারপরও মানুষ বিদেশে থাকেন। কারণ তাঁদের সামনে রয়েছে ভবিষ্যতের স্বপ্ন। তাঁরা চান সন্তানরা ভালোভাবে লেখাপড়া করুক, নিরাপদ পরিবেশে বড় হোক এবং জীবনে ভালো সুযোগ পাক।
অনেকে নিজেদের কষ্টের কথা পরিবারের কাছে প্রকাশও করেন না। দেশে থাকা মা-বাবা কিংবা স্ত্রী-সন্তান যেন দুশ্চিন্তা না করেন, সে জন্য নিজের সমস্যাগুলো আড়াল করে রাখেন।
বাইরে থেকে তাঁদের জীবন ভালো মনে হলেও ভেতরে ভেতরে অনেকেই প্রতিদিন সংগ্রাম করেন।
তবে এটাও সত্য, ইউরোপে বসবাস করলেই সবার জীবন কষ্টের হয় না। অনেকেই ভালো আয় করেন, ব্যবসা গড়ে তোলেন এবং সুন্দর জীবনযাপন করেন। কিন্তু যাঁরা অল্প আয়ে সংসার চালান, তাঁদের বাস্তবতাও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
শুধু বেতন বাড়ালেই কি সমস্যার সমাধান হবে?
পর্তুগালে সর্বনিম্ন বেতন বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি বাসাভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামও বিবেচনায় নিতে হবে।
বেতন বাড়ল, কিন্তু সেই তুলনায় বাসাভাড়া আরও বেড়ে গেল। খাবার, পরিবহন ও অন্যান্য খরচও বাড়তে থাকল। তাহলে সাধারণ মানুষের জীবনে সেই বেতন বৃদ্ধির সুফল কতটা পৌঁছাবে?
একজন মানুষ নিয়মিত কাজ করেন। তিনি আইন মেনে চলেন, কর দেন এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখেন। তাঁর প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। তিনি চান, নিজের আয় দিয়ে পরিবারের মৌলিক প্রয়োজনগুলো পূরণ করতে পারবেন।
সরকারের কাছে তাই শুধু কর্মসংস্থান সৃষ্টি কিংবা বেতন বৃদ্ধির হিসাব থাকলেই চলবে না। একজন সাধারণ কর্মী তাঁর আয়ে বাসাভাড়া দিতে পারছেন কি না, খাবার কিনতে পারছেন কি না এবং পরিবার নিয়ে সম্মানজনকভাবে থাকতে পারছেন কি না, সেটিও বিবেচনা করা জরুরি।
সাশ্রয়ী বাসার সংখ্যা বাড়ানো, নিম্ন আয়ের পরিবারকে কার্যকর সহায়তা দেওয়া এবং আবাসন ব্যয়ের চাপ কমাতে বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে স্থানীয় নাগরিক ও অভিবাসী, উভয় শ্রেণির নিম্ন আয়ের মানুষের সমস্যাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ আবাসন সংকট কোনো একটি সম্প্রদায়ের সমস্যা নয়। এটি সমাজের সামগ্রিক সমস্যা।
প্রবাসীরা শুধু শ্রমিক নন, তাঁরাও মানুষ :
অভিবাসীরা বিভিন্ন খাতে কাজ করেন। কেউ রেস্তোরাঁয়, কেউ নির্মাণশিল্পে, কেউ পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে, কেউ কারখানায়, আবার কেউ ব্যবসা-বাণিজ্যে যুক্ত রয়েছেন। তাঁদের শ্রমে অর্থনীতির নানা খাত সচল থাকে।
কিন্তু একজন মানুষের পরিচয় শুধু তাঁর কাজ কিংবা উপার্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর পরিবার আছে, স্বপ্ন আছে, বিশ্রামের প্রয়োজন আছে এবং সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার আছে।
একজন কর্মী সারাদিন পরিশ্রম করার পর যদি নিজের পরিবারের জন্য একটি নিরাপদ বাসা নিশ্চিত করতে না পারেন, তাহলে তাঁর জীবনের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
প্রবাসীদের সমস্যার কথা বলা মানে কোনো দেশের বিরুদ্ধে কথা বলা নয়। বরং যে সমাজে মানুষ কাজ করেন এবং অবদান রাখেন, সেই সমাজে তাঁদের জীবনযাত্রার বাস্তবতা তুলে ধরা প্রয়োজন।
একটি দেশের অর্থনীতি তখনই সাধারণ মানুষের জন্য কল্যাণকর হয়ে ওঠে, যখন সেই অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল কর্মজীবী মানুষের জীবনেও প্রতিফলিত হয়।
উন্নত জীবনের প্রকৃত অর্থ কী?
উন্নত জীবন মানে শুধু ইউরোপে বসবাস করা নয়। উন্নত জীবন মানে এমন আয়, যা দিয়ে একজন মানুষ নিজের প্রয়োজন মেটাতে পারবেন। এমন বাসস্থান, যেখানে পরিবার নিরাপদে থাকতে পারবে। এমন পরিবেশ, যেখানে সন্তানরা ভালোভাবে বড় হবে এবং মা-বাবা ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন।
অবশ্যই জীবনে এগিয়ে যেতে পরিশ্রম করতে হয়। প্রবাসে এসে অনেক কিছু ত্যাগ করতে হয়। নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে হয়। কিন্তু পরিশ্রমের পাশাপাশি মানুষের ন্যূনতম জীবনযাপনের সুযোগও থাকা প্রয়োজন।
একজন মানুষ যদি প্রতিদিন কাজ করেন, অথচ মাস শেষে তাঁর হাতে প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর মতো অর্থ না থাকে, তাহলে শুধু তাঁকে আরও পরিশ্রম করার পরামর্শ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যায় না।
ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় নীতি, সামাজিক সহায়তা এবং সাশ্রয়ী আবাসনের সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষ নিজের দেশ ছেড়ে পর্তুগালে আসেন একটু ভালোভাবে বাঁচার আশায়। কেউ নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে আসেন, কেউ সন্তানদের সুন্দর জীবন দিতে চান, কেউ আবার পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চান।
তাঁদের এই স্বপ্ন অন্যায় নয়। তাঁরা বিলাসিতা চান না। তাঁরা চান পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য, পরিবারের জন্য একটি নিরাপদ বাসা এবং প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পর কিছু অর্থ সঞ্চয় করার সুযোগ।
কিন্তু যখন একজন কর্মীর পুরো বেতনও বাসাভাড়া মেটানোর জন্য যথেষ্ট হয় না, তখন সেই বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা হওয়া জরুরি।
আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রবাসীরা শুধু অর্থ উপার্জনের যন্ত্র নন। তাঁরাও মানুষ। তাঁদেরও ক্লান্তি আছে, দুশ্চিন্তা আছে, পরিবারের প্রতি দায়িত্ব আছে এবং সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন আছে।
উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে মানুষকে শুধু কাজের সুযোগ করে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সেই মানুষ যেন তাঁর উপার্জন দিয়ে নিজের ও পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরির চেষ্টাও থাকতে হবে।
কারণ একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু তার অর্থনীতি কত বড়, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। প্রকৃত উন্নয়নের অন্যতম মাপকাঠি হলো, একজন সাধারণ কর্মজীবী মানুষ তাঁর পরিশ্রমের আয় দিয়ে কতটা সম্মানজনক ও নিরাপদ জীবনযাপন করতে পারছেন।
ইউরোপের স্বপ্ন তখনই সত্যিকার অর্থে পূর্ণতা পাবে, যখন প্রবাসীদের জীবন শুধু টিকে থাকার সংগ্রামে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তাঁরা পরিবার নিয়ে একটু স্বস্তিতে বাঁচার সুযোগও পাবেন।
লেখক : প্রেসিডেন্ট, পর্তুগাল বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির; সম্পাদক, ইউরোবাংলা