১০ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ইংলিশ চ্যানেলে ২৭ অভিবাসীর মৃত্যু; ১৪ মানবপাচারকারী বিচার শুরু

২০২১ সালে একটি রাবারের নৌকায় করে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন একদল অভিবাসী। সেই নৌকাডুবিতে ৩০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। আধুনিক ইতিহাসে এটিই ইংলিশ চ্যানেলে সবচেয়ে প্রাণঘাতী নৌকাডুবির ঘটনা।

২০২১ সালের ওই মর্মান্তিক ঘটনায় অন্তত ২৭ জন অভিবাসী ডুবে মারা যান। আরও চারজন এখনো নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত। এ ঘটনায় অভিযুক্ত ১৪ জনের বিচার এ সপ্তাহে ফ্রান্সে শুরু হয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, আফগান ও ইরাকি-কুর্দি মানবপাচারকারীরা উত্তর ফ্রান্স থেকে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার এই যাত্রার আয়োজন করেছিল। যাত্রার সময় একটি রাবারের ছোট নৌকায় কয়েক ডজন মানুষ ওঠেন। নৌকাটি খোলা সমুদ্রে চলাচলের জন্য অনুমোদিত ছিল না এবং এতে পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেটও ছিল না।

নৌকার বেশিরভাগ যাত্রী ছিলেন ইরাকি কুর্দি। তাদের মধ্যে আফগানিস্তান, ইথিওপিয়া, মিসর ও ভিয়েতনামের নাগরিকও ছিলেন। নৌকায় থাকা সবচেয়ে কম বয়সী যাত্রীর বয়স ছিল মাত্র সাত বছর।

এই যাত্রায় মাত্র দুজন পুরুষ বেঁচে যান।

অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড, অবৈধ অভিবাসনে সহায়তা এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে।

‘সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল’

বেঁচে যাওয়া দুই ব্যক্তি আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তারা জানান, যাত্রা শুরুর কয়েক ঘণ্টা পর রাবারের নৌকাটিতে পানি ঢুকতে শুরু করে।

সোমালিয়ার নাগরিক ইসা ওমর ফরাসি তদন্তকারীদের বলেন, “রাত প্রায় আড়াইটার দিকে আমরা নৌকা থেকে পানি ফেলে দিতে শুরু করি। কিন্তু হঠাৎ নৌকাটি উল্টে যায়।”

তিনি বলেন, “সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছিল, নারীরা চিৎকার করছিলেন।”

নৌকাটি উল্টে যাওয়ার পর যাত্রীরা পানিতে পড়ে যান এবং অনেকে ডুবে যেতে থাকেন। নৌকাটি ফরাসি ও ব্রিটিশ উদ্ধারকারী সংস্থার কাছে বিপদসংকেত পাঠাতে সক্ষম হলেও প্রায় ১২ ঘণ্টা পর নৌকাটির সন্ধান পাওয়া যায়।

পরে ফ্রান্সের একটি মাছ ধরার নৌযান কালে উপকূলের কাছে পানিতে ভাসতে থাকা মরদেহ দেখতে পায়।

দুই অভিযুক্ত এখনো পলাতক :

বিচারের মুখোমুখি হওয়া ১৪ জন সন্দেহভাজন মানবপাচারকারীর মধ্যে দুজন এখনো পলাতক। তাদের অনুপস্থিতিতেই বিচার হবে।

রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, অভিযুক্তদের মধ্যে মানবপাচারকারী চক্রের সংগঠক, পরিবহনকারী এবং বিভিন্ন কাজের সমন্বয়কারীরা রয়েছেন। তাদের বেশিরভাগই আফগানিস্তানে জন্মগ্রহণ করেছেন।

তবে কয়েকজন আসামির আইনজীবী দাবি করেছেন, তাদের মক্কেলরা ঘটনায় ছোটখাটো ভূমিকা পালন করেছেন। তাই এই মৃত্যুর জন্য তাদের দায়ী করা উচিত নয়।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) আইনজীবী মারি গেগো বলেন, তার মক্কেল নৌকায় ওঠার আগে নিহতদের একজনকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, “তার কাছে তিনি ছিলেন আফগানিস্তানের নিজ গ্রামের একজন বন্ধু। আমরা এখানে নেটওয়ার্কের প্রকৃত দায়ীদের, অর্থাৎ এর প্রধানদের দেখতে পাচ্ছি না।”

ফরাসি সেনাদের বিরুদ্ধেও তদন্ত :

ইংলিশ চ্যানেলের এই ঘটনায় আরও বড় ধরনের দায় কারও ছিল কি না, তা নিয়েও বিচার শুরুর আগে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে উদ্ধারকারী নৌযানগুলো কেন এত দেরিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিল, তা নিয়ে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের তদন্তকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন।

চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাজ্যের এক তদন্তে বলা হয়, বিপদসংকেত পাওয়ার পর ব্রিটিশ ও ফরাসি কর্মকর্তারা দ্রুত পদক্ষেপ নিলে কিছু মানুষের মৃত্যু এড়ানো সম্ভব হতে পারত।

ব্রিটিশ তদন্তকারীরা জানান, ব্রিটিশ কোস্টগার্ডের কাছ থেকে পাওয়া একটি ফোনে ফরাসি একটি নৌযান সাড়া দেয়নি। একই সঙ্গে ব্রিটিশ পক্ষও “বেশ কিছু ভুল সিদ্ধান্ত” নিয়েছিল এবং খুব দ্রুত নিখোঁজদের উদ্ধারের অভিযান বন্ধ করে দিয়েছিল।

ফ্রান্সে দেশটির সামরিক বাহিনীর সাত সদস্যের বিরুদ্ধেও সাহায্য করতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে তদন্ত চলছে।

নিহতদের পরিবারের পক্ষে আইনজীবী থমাস রিকার্ড বলেন, “এই বিচার মানবপাচারকারীদের নিয়ে আইনি প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ। এরপর আশা করছি, সামুদ্রিক বাহিনীর সদস্যদের নিয়েও বিচার হবে।”

সূত্র : ইনফোমাইগ্রেন্ট

Home R3