জুনের এক সকালে ইংরেজি ক্লাস শুরু করেন ইয়াইজা ফেরেইরো কোলিয়াসোস। তাঁর সামনে বসে আছে আট শিশু। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। এটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শেষ শ্রেণি। সবচেয়ে ছোটরা চতুর্থ শ্রেণির। একসঙ্গে তাদের পড়ানো সবসময় সহজ নয় বলে জানান ৩০ বছর বয়সী কোলিয়াসোস। তবে শিক্ষার্থী এত কম যে আলাদা করে ক্লাস নেওয়ার সুযোগ নেই।
স্পেনের ভিলারদেভোস এলাকার রোদোলফো নুনিয়েস রদ্রিগেস নার্সারি ও প্রাথমিক বিদ্যালয়টি চালু হয় ১৯৭৪ সালে। স্কুলটি ভিলারদেভোস ও আশপাশের গ্রামের ৭০০ শিশুর জন্য তৈরি করা হয়েছিল।
এখন সেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ৩১। প্রাক-প্রাথমিক থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত সব মিলিয়ে এই সংখ্যা। স্কুলে ঘণ্টা বাজার শব্দ ছাড়া তেমন কোনো আওয়াজ শোনা যায় না। বিরতির সময়ও ভবনটি অস্বাভাবিক নীরব থাকে।
গ্রামেও একই চিত্র। রাস্তায় যাদের দেখা যায়, তাদের বেশির ভাগই বয়স্ক। অনেক বাড়ি পরিত্যক্ত। কিছু বাড়ির দেয়ালে ঝুলছে ‘Se vende’ লেখা সাইনবোর্ড। এর অর্থ ‘বিক্রি হবে’। ভিলারদেভোসের পরিস্থিতি চরম। তবে এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়।
পুরো ইউরোপেই জন্মহার কমছে। বাড়ছে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা। একই সময়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করা তরুণের সংখ্যাও কমছে।
আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্র একটি প্রজন্মভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমান কর্মজীবীরা বয়স্কদের পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবার খরচ বহন করেন। তাঁদের আশা, ভবিষ্যতে নতুন প্রজন্মও একইভাবে তাঁদের দায়িত্ব নেবে। কিন্তু কম জন্মহার সেই ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করছে।
অবসর নেওয়ার বয়সে পৌঁছাচ্ছে বড় একটি প্রজন্ম। অন্যদিকে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছে তুলনামূলক কম তরুণ। ইউরোপে পেনশন সংস্কার ইতোমধ্যে বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রেও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ দীর্ঘদিনের।
জনসংখ্যা আরও বয়স্ক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই চাপ বাড়বে।তাই শাসকদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে। মানুষকে কি আরও বেশি সন্তান নিতে উৎসাহিত করা সম্ভব? আর তা সম্ভব না হলে অভিবাসনের মাধ্যমে কি এই জনসংখ্যাগত সংকট সামাল দেওয়া যাবে?
কেন কমছে জন্মহার :
ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে জন্মহার কমে ১ দশমিক ৩৪-এ দাঁড়িয়েছে। ইউরোপের বড় দেশগুলোর মধ্যে স্পেনে জন্মহার সবচেয়ে কম। সেখানে এটি ১ দশমিক ১। আর সেটিও ক্রমেই কমছে। যুক্তরাষ্ট্রও খুব একটা স্বস্তিতে নেই। দীর্ঘদিন ইউরোপের চেয়ে বেশি থাকা দেশটির জন্মহার এখন প্রতিস্থাপন হারের অনেক নিচে।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটির জন্মহার ছিল ১ দশমিক ৬। দীর্ঘদিন কম জন্মহারকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখা হয়নি।
কারণ এর প্রভাব দেখা দিতে কয়েক দশক সময় লাগে। জন্ম কমার পরপরই শ্রমিক সংকট তৈরি হয় না। সাধারণত একটি প্রজন্ম বড় হওয়ার পর এর প্রভাব স্পষ্ট হয়। ততদিনে স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থী কমে যায়। পেনশন ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ে। কিন্তু তখন জনসংখ্যার গতিপথ বদলানো কঠিন হয়ে পড়ে।
ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশকে আগে থেকেই বেশি ঝুঁকিতে দেখা হচ্ছিল। তাইওয়ান, হংকং ও সিঙ্গাপুরে জন্মহার ইতোমধ্যে একজন নারীর জন্য এক সন্তানেরও নিচে নেমে গেছে।
তবে প্রশ্ন হলো, জন্মহার কমছে কেন?
এর অনেক ব্যাখ্যা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী কারেন বেঞ্জামিন গুজ্জো মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রে জন্মহার কমার একটি কারণ জনস্বাস্থ্যের উন্নতি। মানুষ এখন কিশোর বয়সে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ এড়াতে বেশি সক্ষম।
তবে এর বাইরেও ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে পরিস্থিতি অনেকটা একই। বাড়ির দাম ও ভাড়া বেড়েছে। নারীরা ক্যারিয়ারকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। পুরুষদের পরিবার শুরু করতে বেশি সময় লাগছে।
ধর্মের প্রভাব কমেছে। স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের বাস্তব সম্পর্ক দুর্বল করছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়ও অনেককে সন্তান নেওয়া নিয়ে নিরুৎসাহিত করছে।
প্রতিটি ব্যাখ্যারই সমর্থক রয়েছে। এসব নিয়ে বই ও পডকাস্টও হয়েছে। তবে কোনো একটি কারণ দিয়ে পুরো বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায় না। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক বারকায় ওজকানও একটি কারণকে দায়ী করার পক্ষপাতী নন। ৪৭ বছর বয়সী এই দুই সন্তানের বাবা মনে করেন, বিভিন্ন কারণ একসঙ্গে কাজ করছে।
অনিশ্চিত চাকরির বাজার ও বাড়তি আবাসন খরচ এর মধ্যে রয়েছে। একই সঙ্গে মানুষের মূল্যবোধ বদলেছে। শিক্ষাজীবন দীর্ঘ হয়েছে। সন্তান পালনের প্রত্যাশাও বেড়েছে। তবে এসব কারণের একটি সাধারণ ফল আছে। সেটি হলো সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেওয়া।
বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, তরুণ-তরুণীরা এখনও গড়ে প্রায় দুই সন্তান চান। কিন্তু পেশাগত, আর্থিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত তারা সন্তান নেওয়া পিছিয়ে দেন। অনেক সময় এই অপেক্ষা তাদের পরিকল্পনার চেয়েও দীর্ঘ হয়। ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যাবিদ ইভা বোজুওঁও একই কথা বলেন। তাঁর নিজের জীবনেও এর অভিজ্ঞতা রয়েছে।
৩৪ বছর বয়সে তিনি ও তাঁর সঙ্গী সন্তান নেওয়ার চেষ্টা শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত পাঁচ বছর পর আইভিএফের মাধ্যমে তাঁরা সফল হন। তিনি বলেন, “৩৪ বছর বয়সে শুরু করার সময় আমি কখনো ভাবিনি যে এ ধরনের সমস্যায় পড়ব।”
এখন তাঁর বয়স ৪৮। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে দেরিতে সন্তান নেওয়া নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁর মতে, সন্তান নেওয়া পিছিয়ে দেওয়ার প্রবণতা এখন শুধু ধনী বা শহুরে মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমাজের সব শ্রেণিতেই এটি দেখা যাচ্ছে।
প্রজনন চিকিৎসা অনেক সময় মানুষকে ভুল ধারণা দেয়। এতে সন্তান ধারণের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। কিন্তু এটি সন্তানের নিশ্চয়তা দেয় না। বয়সের প্রভাবও পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।
বোজুওঁ বলেন, এই চিকিৎসা ব্যয়বহুল। এটি সবার নাগালের মধ্যে নেই। ফলে বৈষম্য তৈরি হয়। আর অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসা সফল হয় না। সন্তান রাষ্ট্রের জন্য জরুরি, পরিবারের জন্য ব্যয়বহুল
কম জন্মহারের পেছনে একটি বড় অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব রয়েছে। কল্যাণ রাষ্ট্রের জন্য সন্তান প্রয়োজন। কিন্তু সন্তান বড় করা পরিবারের জন্য ব্যয়বহুল। আগে সন্তানরা পরিবারের কাজে সহায়তা করত। বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মায়ের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করত। আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রে সেই ভূমিকা অনেকটাই হারিয়েছে।
বোজুওঁ বলেন, “কল্যাণ রাষ্ট্রের কার্যক্রমের জন্য সন্তান প্রয়োজন। কিন্তু পরিবারের অর্থনীতিতে তাদের সরাসরি কোনো অর্থনৈতিক ভূমিকা নেই।” সন্তান মানুষকে আনন্দ ও জীবনের অর্থ দিতে পারে। কিন্তু তাদের বড় করতে অনেক খরচ হয়। সন্তান পালনের কারণে ক্যারিয়ারে বিরতি আসতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে আয়ও কমে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবিত্ত একটি পরিবারের একটি সন্তান বড় করতে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার ডলার খরচ হয়। মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের তথ্যের ভিত্তিতে এই হিসাব করা হয়েছে। ব্রিটেনে এই খরচ প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড বলে জানিয়েছে দারিদ্র্যবিরোধী সংগঠন চাইল্ড পোভার্টি অ্যাকশন গ্রুপ।
শুধু অবসর জীবনের আর্থিক নিরাপত্তার কথা ভাবলে, কোনো পরিবার হয়তো সন্তান পালনের বদলে ওই অর্থ সঞ্চয় ও বিনিয়োগ করাকে বেশি লাভজনক মনে করতে পারে।
একজন পরিবারের জন্য এই সিদ্ধান্ত যুক্তিসঙ্গত মনে হতে পারে। কিন্তু পুরো সমাজের অনেক পরিবার একই সিদ্ধান্ত নিলে এর বড় প্রভাব পড়ে। জার্মানির ফেডারেল ইনস্টিটিউট ফর পপুলেশন রিসার্চের গবেষণা পরিচালক মার্টিন বুজার বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন।
তাঁর মতে, শিল্পোন্নত একটি দেশের জীবনযাত্রার মান শুধু জনসংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অবসর নেওয়া মানুষের তুলনায় কতজন নতুন কর্মী শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে।
তিনি বলেন, “দুই দিক মোটামুটি ভারসাম্যে থাকলে অর্থনীতি ও কল্যাণ ব্যবস্থা ভালোভাবে চলে। কিন্তু তরুণের সংখ্যা কমে গেলে এবং একই সময়ে অনেক মানুষ অবসরে গেলে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে।”
তরুণদের সন্তান নেওয়ার অনীহা :
ভিলারদেভোসে ফিরে আবার শ্রেণিকক্ষে দেখা যায় ইয়াইজা ফেরেইরো কোলিয়াসোসকে। ক্লাস শেষ হলেও তিনি সেখানে বসে নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বলছিলেন।
৩০ বছর বয়সী এই শিক্ষিকার কোনো সন্তান নেই। তাঁর সব নারী বন্ধুরও একই অবস্থা। তিনি বলেন, “আমরা কাজ করি। এরপর নিজেদের জন্য সময় কাটাতে চাই। আনন্দ করতে চাই।”
কোলিয়াসোস ও তাঁর বন্ধুরা মাঝে মাঝে পরিবার গঠনের কথা আলোচনা করেন। তবে মা হলে কী কী ছাড় দিতে হবে, তা নিয়ে তিনি চিন্তিত। তিনি বলেন, “আমার সন্তান হলে বর্তমান জীবন আর চালিয়ে যেতে পারব না।”
গর্ভধারণের পর তাঁর শরীরে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, সেটিও তাঁকে ভাবায়। সন্তান নিতে উৎসাহ দিয়ে সফল হয়নি সরকার ইউরোপের বিভিন্ন সরকার বহু বছর ধরে মানুষকে সন্তান নিতে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছে।
কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো দেশই জন্মহার কমার প্রবণতা উল্টে দেওয়ার নির্ভরযোগ্য উপায় খুঁজে পায়নি। দুই দশক আগে জার্মানি তিন বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য শিশু পরিচর্যা ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে বাড়ায়। এর একটি উদ্দেশ্য ছিল সাবেক পশ্চিম ও পূর্ব জার্মানির মধ্যে পার্থক্য কমানো।
এর পর কয়েক বছর দেশটির জন্মহার বাড়ে। প্রতি নারীর সন্তানসংখ্যা প্রায় ১ দশমিক ৪ থেকে বেড়ে ১ দশমিক ৬ হয়। কিন্তু পরে সেই বৃদ্ধি থেমে যায়। আবারও জন্মহার কমতে শুরু করে।
২০২৫ সালে জার্মানির জন্মহার নতুন রেকর্ড সর্বনিম্নে নেমে ১ দশমিক ৩২-এ দাঁড়ায়। হাঙ্গেরি অবশ্য আর্থিক সুবিধার ওপর বেশি জোর দিয়েছিল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের সরকার সন্তান নেওয়া পরিবারকে বিভিন্ন বোনাস ও কর সুবিধা দেয়। চার বা তার বেশি সন্তানের মায়েদের আয়কর থেকেও ছাড় দেওয়া হয়।
এর ফলে জন্মহার ২০১০-এর দশকের শুরুতে প্রায় ১ দশমিক ২৫ থেকে বেড়ে ২০২১ সালে ১ দশমিক ৬ হয়। পরে সেটি আবার কমে প্রায় ১ দশমিক ৪-এ নেমে যায়। মানুষকে প্রচারণার মাধ্যমে সন্তান নিতে উৎসাহিত করার চেষ্টাও খুব একটা সফল হয়নি।
২০১৬ সালে ইতালি ‘ফার্টিলিটি ডে’ নামে একটি প্রচারণা শুরু করে। একটি বিজ্ঞাপনে এক তরুণীকে হাতে বালুঘড়ি নিয়ে দেখানো হয়। পাশে লেখা ছিল, “সৌন্দর্যের কোনো বয়স নেই। প্রজননক্ষমতার আছে।” বিজ্ঞাপনটি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। বোজুওঁ বলেন, এ ধরনের প্রচারণা তৈরি করা খুব কঠিন। তাঁর মতে, নারীদের বেশি বয়সে সন্তান নিলে সমস্যা হতে পারে বলে সতর্ক করলে তারা অপরাধবোধ ও উদ্বেগে ভুগতে পারেন।
তিনি বলেন, সন্তান নেওয়ার জন্য ভালো পরিবেশ তৈরি করতে কিছু সরকারি নীতি কাজে আসতে পারে। এসব ব্যবস্থা না থাকলে কিছু দেশে জন্মহার আরও কম হতে পারত।
তবে এখন পর্যন্ত কোনো নীতিই জন্মহার বাড়ানোর প্রধান কারণ হয়ে উঠতে পারেনি।
অভিবাসন কি বিকল্প সমাধান?
পরিবারকে সন্তান নিতে উৎসাহিত করা বা কর ছাড় দেওয়ার মতো পদক্ষেপ যেখানে খুব বেশি কাজ করেনি, সেখানে একটি বিষয় জনসংখ্যার হিসাব বদলে দিয়েছে। সেটি হলো অভিবাসন। স্পেন এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। জন্মহারের হিসাবে দেশটির জনসংখ্যা কমে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। এক দশক আগে স্পেনের জনসংখ্যা ছিল ৪ কোটি ৬৫ লাখ। এখন তা প্রায় ৫ কোটিতে পৌঁছেছে।
স্পেনের বিখ্যাত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এসাদে-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশটির কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ৭০ শতাংশের বেশি এসেছে বিদেশে জন্ম নেওয়া কর্মীদের মাধ্যমে। তবে স্পেনের অভিবাসন নীতি ইউরোপের অন্য দেশগুলোর জন্য সহজ কোনো মডেল নয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্পেনে অনেক অভিবাসী এসেছে লাতিন আমেরিকা থেকে। বিশেষ করে কলম্বিয়া ও ভেনেজুয়েলা থেকে। এসব দেশে স্প্যানিশ ভাষা প্রচলিত। খ্রিষ্টান ধর্মও প্রধান ধর্ম। এ কারণে তাদের একীভূত হওয়া কিছুটা সহজ হয়েছে। তবে এটাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটে না। ইউরোপের অন্য অনেক দেশে অভিবাসীদের গ্রহণ করা বেশি কঠিন।
নতুন অভিবাসীদের অনেকে স্থানীয় ভাষা জানেন না। অনেকের প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা বা কাজের অভিজ্ঞতার স্বীকৃতিও থাকে না। সংস্কৃতিগত পার্থক্যও থাকে।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো থেকে আসা অভিবাসীরা স্পেনের লাতিন আমেরিকান অভিবাসীদের তুলনায় বেশি রাজনৈতিক ও সামাজিক বিরোধিতার মুখে পড়েছেন। এ কারণেই সম্ভবত স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ অন্য অনেক ইউরোপীয় নেতার চেয়ে বড় পরিসরে অভিবাসনকে বেশি সমর্থন করেন।
সানচেজের যুক্তি, অর্থনীতি সচল রাখতে এবং কল্যাণ রাষ্ট্রের ব্যয় চালাতে স্পেনের তরুণ কর্মী প্রয়োজন। তাঁর সরকার সম্প্রতি অবৈধভাবে বসবাসকারী অভিবাসীদের বৈধ করার জন্য ইউরোপের অন্যতম বড় কর্মসূচি চালু করেছে।
জুলাইয়ের শুরু পর্যন্ত ১২ লাখ মানুষ এই কর্মসূচিতে আবেদন করেছেন। তবে অভিবাসন একটি জনসংখ্যাগত সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে নতুন রাজনৈতিক সমস্যা তৈরি করছে। সানচেজের সমালোচকেরা বলছেন, সরকার অভিবাসনের অর্থনৈতিক সুবিধাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
অন্যদিকে আবাসন, স্কুল ও সরকারি সেবার ওপর চাপকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। অভিবাসীদের সমাজে একীভূত করা এবং সামাজিক সংহতি বজায় রাখার সমস্যাও রয়েছে। স্পেনের রক্ষণশীল বিরোধী দল ও কট্টর ডানপন্থী ভক্স পার্টি সানচেজকে অবৈধ অভিবাসন উৎসাহিত করার অভিযোগ করেছে।
ভক্স নেতা সান্তিয়াগো আবাসকাল বলেছেন, সরকারের নীতি অভিবাসীদের স্পেনে আসতে উৎসাহিত করছে। তিনি এটিকে ‘আক্রমণ’ হিসেবেও বর্ণনা করেছেন।
জুলাইয়ের শেষ দিকে মরক্কোর উত্তর উপকূলে অবস্থিত স্পেনের ভূখণ্ড সেউতায় বড় ধরনের অভিবাসন সংকট দেখা যায়। প্রায় কয়েক হাজার অভিবাসী ওই এলাকায় প্রবেশ করেন। তাদের বেশির ভাগই ছিলেন তরুণ পুরুষ।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খায়। এর পেছনে মরক্কো সরকারের ভূমিকা ছিল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দ্রুত দেখা দেয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭ দেশের মধ্যে ২২ জন নেতা একটি চিঠিতে সতর্ক করেন, স্পেনের উদার অভিবাসন নীতি অনিয়মিত অভিবাসনকে উৎসাহিত করতে পারে। এতে অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপরও চাপ বাড়তে পারে।
অভিবাসন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও সন্দেহ বাড়ছে। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউগভের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, সুইডেন ও ডেনমার্কের বেশির ভাগ মানুষ মনে করেন, গত এক দশকে এসব দেশে অভিবাসন বেশি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও প্রায় অর্ধেক মানুষ অভিবাসীদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর পক্ষে। এই বিতর্ক দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
কম জন্মহারের প্রভাব যেমন স্পষ্ট হতে কয়েক দশক লাগে, তেমনি বড় পরিসরের অভিবাসনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও ধীরে ধীরে দেখা যায়।
পরিবর্তন ও প্রতিরোধ :
ভিলারদেভোস থেকে প্রায় ১ হাজার ৩৫০ কিলোমিটার উত্তরে লুটন শহর। লন্ডন থেকে ট্রেনে প্রায় ৩০ মিনিট দূরের এই শহর ইউরোপের জনসংখ্যার ভিন্ন একটি চিত্র দেখায়। লুটনে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ বাস করে। ২০২৪ সালে শহরটির জন্মহার ছিল ২ দশমিক ০। এটি পুরো ইংল্যান্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ।
ইংল্যান্ডের জাতীয় জন্মহার ছিল প্রায় ১ দশমিক ৪। শহর প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এর একটি বড় কারণ হলো লুটনের নারীরা তুলনামূলক কম বয়সে সন্তান নেন। লুটনে প্রতি তিনটি শিশুর মধ্যে একটি জন্ম নেয় ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী নারীর ঘরে। ইংল্যান্ডজুড়ে এই হার চারটির মধ্যে একটি।
অন্যদিকে ৩৫ থেকে ৩৯ বছর বয়সী নারীদের সন্তান জন্ম দেওয়ার হার জাতীয়ভাবে লুটনের চেয়ে বেশি। লুটনের এই চিত্রে অভিবাসনের বড় ভূমিকা রয়েছে। ২০২৫ সালে লুটনে জন্ম নেওয়া শিশুদের দুই-তৃতীয়াংশের মা বিদেশে জন্মগ্রহণ করেছেন।
স্থানীয় কাউন্সিলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইংল্যান্ডজুড়ে এই হার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। শহরের কাউন্সিলের প্রধান লেবার পার্টির রাজনীতিক তাহমিনা সেলিম লুটনকে ‘বহু সংস্কৃতির শহর এবং এ নিয়ে গর্বিত’ বলে বর্ণনা করেন। শেফিল্ডে জন্ম নেওয়া সেলিমের বাবা-মা পাঞ্জাব থেকে এসেছিলেন।
তাঁর মতে, লুটনে পরিবারগুলো আসতে আগ্রহী হওয়ার কারণ রয়েছে। এখানে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন জায়গায় কাজের সুযোগ আছে। আবার লন্ডনের তুলনায় আবাসনের খরচও কম। লুটনের বুরি পার্ক এলাকায় এই বৈচিত্র্য সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
অনেক নতুন পরিবার এখানে বসতি গড়েছে। এ এলাকার দোকান, ট্রাভেল এজেন্সি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে বড় মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি স্পষ্ট।দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে এলাকার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগও রয়েছে। হিজাব পরা নারীদের রাস্তায় প্রায়ই দেখা যায়। ট্রাভেল এজেন্সিগুলো হজ ও ওমরাহর বিজ্ঞাপন দেয়। দোকানগুলোতে হালাল খাবারও পাওয়া যায়।
তবে লুটন বড় পরিসরের অভিবাসনের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ারও উদাহরণ। তাহমিনা সেলিম মনে করেন, অভিবাসনের কারণে শহরটি আরও তরুণ ও উন্মুক্ত হয়েছে।
অন্যদিকে অনেকে মনে করেন, লুটন এমন একটি দেশের প্রতীক হয়ে উঠেছে, যা জনসংখ্যা ও সংস্কৃতির দিক থেকে দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কট্টর ডানপন্থী সংগঠন ইংলিশ ডিফেন্স লিগ ২০০৯ সালে লুটনে আত্মপ্রকাশ করে। ফুটবল সমর্থকদের একটি অংশকে সঙ্গে নিয়ে সংগঠনটি অভিবাসন ও ইসলামের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালায়।
এর সবচেয়ে পরিচিত নেতা স্টিফেন ইয়াক্সলি-লেনন। তিনি টমি রবিনসন নামে বেশি পরিচিত। তাঁর বাড়িও লুটনে। রবিনসনও একই বিষয়কে নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রে রেখেছেন। এখন তাঁর প্রভাব লুটনের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসে লন্ডনে তাঁর ‘ইউনাইট দ্য কিংডম’ সমাবেশে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ অংশ নেয়।
এর মাধ্যমে বোঝা যায়, লুটনের মতো জায়গায় শুরু হওয়া ক্ষোভ এখন জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। এর আগের বছরের সেপ্টেম্বরে আরও বড় একটি সমাবেশে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিল। সেখানে ভিডিও লিংকের মাধ্যমে বক্তব্য দেন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে রবিনসনের বক্তব্যকে একাধিকবার প্রচার করেছেন।
লুটনের একটি অলাভজনক সংগঠন ‘ডিসকভার ইসলাম পাবলিক ইনফরমেশন সেন্টার’-এর স্বেচ্ছাসেবক হামজা পার্কার বলেন, “টমি মাঝে মাঝে ক্যামেরা ও বিদেশি সাংবাদিক নিয়ে এখানে আসে। আমাদের উসকে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সে সফল হয় না।”
নীতির সীমাবদ্ধতা :
আবার ভিলারদেভোসে ফিরে আসা যাক। শহরের মেয়র তামারা বালবোয়া গার্সিয়া তাঁর পৌরসভার জনসংখ্যার চিত্র দেখছিলেন। ভিলারদেভোসে মোট বাসিন্দা ১ হাজার ৫৯৮ জন। এর মধ্যে ১৪ বছর বা তার কম বয়সী মাত্র ৬৬ জন। অন্যদিকে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ৯৬০-এর বেশি।
অর্থাৎ একজন শিশু বা কিশোরের বিপরীতে প্রায় ১৫ জন প্রবীণ বাসিন্দা রয়েছেন। এই প্রবণতা চলতে থাকলে একসময় গ্রামের ভবিষ্যৎ থাকবে না বলে মনে করেন গার্সিয়া।
তবে তিনি মনে করেন, এই পরিস্থিতি অনিবার্য নয়। পৌরসভা বিদেশফেরত মানুষ ও নতুন অভিবাসীদের বাড়ি ও কাজ খুঁজে পেতে সহায়তা করছে। বিশেষ করে কৃষি, ওয়াইন উৎপাদন ও বয়স্কদের সেবার ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।
জনসংখ্যা কমলেও ভিলারদেভোসে এখনও একটি সুপারমার্কেট আছে। আছে ফার্মেসি, ফুটবল মাঠ ও খোলা সুইমিংপুল। আছে কয়েকটি বার, একটি ব্যাংকের শাখা এবং অবশ্যই সেই স্কুলটি।
স্কুলটিতে এখন ছোট ছোট ক্লাস হয়। স্থানীয় অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ‘পোর্তাস আবের্তাস’, যার অর্থ ‘খোলা দরজা’, শহরটিকে টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রতিষ্ঠানটির স্থানীয় কার্যালয়ের দায়িত্বে থাকা সমাজকর্মী আন্দ্রেয়া রদ্রিগেস জানান, কীভাবে তারা একটি অভিবাসী পরিবারকে গ্রামে বসতি গড়তে সহায়তা করেছে।
পরিবারটির মা প্রশিক্ষিত নার্স। তিনি দ্রুত কাজ পেয়েছেন। বাবাকে প্রথমে ট্রাকচালকের কাজ দেওয়া হয়। পরে তিনি বেকারির কাজে যোগ দেন। তাদের সন্তানকে একটি স্কুল-পরবর্তী কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়।
রদ্রিগেসের নিজের জীবনও এই উদ্যোগের একটি উদাহরণ। তরুণ বয়সে প্রশিক্ষণের জন্য তিনি ভিলারদেভোস ছেড়ে গিয়েছিলেন। পরে আবার গ্রামে ফিরে আসেন।
চার বছর আগে তিনি ৯২ হাজার ইউরো দিয়ে একটি বাড়ি কিনেছেন। বাড়িটির দাম শুনে অবাক হওয়ায় রদ্রিগেস হেসে বলেন, “বাড়িটি ভালো অবস্থাতেই ছিল!”
মেয়র, স্কুলশিক্ষক এবং গ্রামের আরও অনেক নারীর মতো রদ্রিগেস নিঃসন্তান নন। তাঁর একটি চার বছর বয়সী মেয়ে রয়েছে। তিনি আর সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন কি না, প্রশ্ন করার আগেই রদ্রিগেস উত্তর দেন।
উল্লেখ্য; ব্রিটেনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম পলিটিকো থেকে অনূদিত হয়েছে এই প্রতিবেদনটি। এটি তৈরি করেছে অ্যাক্সেল স্প্রিংগারের গ্লোবাল রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক। প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকরা এতে একসঙ্গে কাজ করেন।