কঠোর হচ্ছে ইউরোপের অভিবাসননীতি, প্রস্তুত তো বাংলাদেশ?

আবদুল আহাদ সালমান


ইউরোপ দীর্ঘদিন ধরে উন্নত জীবন, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার আকর্ষণীয় গন্তব্য। বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষ জীবনের সচ্ছলতা, পরিবারের ভবিষ্যৎ এবং নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছেন। তাঁদের কেউ বৈধ কর্মী, কেউ শিক্ষার্থী, কেউ উদ্যোক্তা, আবার কেউ আশ্রয়প্রার্থী। প্রবাসীদের শ্রম, ঘাম ও ত্যাগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন। কিন্তু ইউরোপের অভিবাসননীতি এখন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, আশ্রয়ের আবেদন যাচাই, অনিয়মিত অভিবাসন প্রতিরোধ এবং ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন আরও সমন্বিত ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত?

ইউরোপের অভিবাসননীতিতে নতুন বাস্তবতা :

২০২৬ সালের ১২ জুন থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন অভিবাসন ও আশ্রয়সংক্রান্ত চুক্তি (Pact on Migration and Asylum) কার্যকর হওয়ার পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এর উদ্দেশ্য হলো সদস্যদেশগুলোর মধ্যে অভিবাসন ব্যবস্থাপনার সমন্বয় বাড়ানো, সীমান্তে পরিচয় ও নিরাপত্তা যাচাই জোরদার করা, আশ্রয়ের আবেদন নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া উন্নত করা এবং যাঁদের ইউরোপে থাকার আইনগত অধিকার নেই, তাঁদের ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা কার্যকর করা। তবে নতুন নিয়মের বাস্তবায়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। বিভিন্ন বিধানের প্রয়োগ ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি সদস্যদেশভেদে ভিন্ন হতে পারে।

এ পরিবর্তনকে শুধু সীমান্ত কঠোর করার উদ্যোগ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না। ইউরোপ একই সঙ্গে বৈধ অভিবাসন, দক্ষ কর্মী নিয়োগ এবং শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণের পথও সম্প্রসারণ করতে চায়। অর্থাৎ অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন মানুষের জন্য বৈধ সুযোগ তৈরিও ইউরোপের নীতির অংশ।

তবে বাস্তবতা হলো, বৈধভাবে প্রবেশের অনুমতি, বসবাসের অধিকার, কাজের অনুমতি এবং আশ্রয় পাওয়ার অধিকার এক বিষয় নয়। প্রত্যেকটির জন্য আলাদা আইনি শর্ত রয়েছে। এসব পার্থক্য না বুঝে ইউরোপে আসার পরিকল্পনা করলে একজন অভিবাসীকে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হতে পারে।

ফেরত পাঠানোর নিয়মে কঠোরতা: সতর্ক হওয়া জরুরি :

২০২৬ সালের ১ অক্টোবর ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাউন্সিল এমন একটি নতুন ফেরতসংক্রান্ত বিধিমালায় চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে, যার লক্ষ্য হলো ইউরোপে থাকার আইনগত অধিকার নেই এমন ব্যক্তিদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করা। এতে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে সিদ্ধান্তের সমন্বয়, কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতার বাধ্যবাধকতা এবং নির্দিষ্ট শর্তে ইউরোপের বাইরের দেশে ফেরত পাঠানোর কেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। নতুন নিয়মের লক্ষ্য সব অভিবাসীকে ইউরোপ থেকে বের করে দেওয়া নয়। বৈধ বসবাসের অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তি, নিয়ম মেনে কাজ করা বিদেশি নাগরিক এবং আইনগতভাবে সুরক্ষাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অবস্থান অনিয়মিতভাবে অবস্থানকারীদের মতো নয়। কারও আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে, আপিলের সুযোগ থাকলে কিংবা তাঁর বিশেষ আইনি সুরক্ষার প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট আইন ও ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে।

ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্তও আইন, মৌলিক অধিকার ও প্রযোজ্য বিচারিক প্রতিকারের শর্ত মেনে বাস্তবায়ন করতে হবে। আন্তর্জাতিক সুরক্ষার প্রয়োজন রয়েছে এমন ব্যক্তিকে বিপদের মুখে ফেরত না পাঠানোর নীতিও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য তাই সবচেয়ে জরুরি হলো নিজের আইনি অবস্থান সম্পর্কে সচেতন থাকা, সরকারি চিঠিপত্র উপেক্ষা না করা এবং প্রয়োজনে যোগ্য অভিবাসন আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া। গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অসম্পূর্ণ তথ্য কিংবা দালালের আশ্বাসের ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া বিপজ্জনক।

বৈধ অভিবাসনের পথই হোক অগ্রাধিকার :

বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের সুযোগ সম্প্রসারণ করা। প্রতিবছর বহু মানুষ বিদেশে কাজের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। তাঁদের অনেকে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে বিদেশের শ্রমবাজারে অবদান রাখেন। কিন্তু অন্যদিকে, প্রতারণামূলক নিয়োগ, ভুয়া চাকরির প্রস্তাব, জাল কাগজপত্র এবং অনিরাপদ পথে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা অনেকের জীবনকে বিপন্ন করছে।

কিছু অসাধু মধ্যস্থতাকারী ইউরোপে নিশ্চিত চাকরি, সহজে রেসিডেন্স কার্ড কিংবা দ্রুত নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়। বাস্তবে কোনো বৈধ ভিসা বা চাকরির নিশ্চয়তা না থাকলেও মানুষ জমিজমা বিক্রি করে কিংবা ঋণ নিয়ে তাঁদের হাতে টাকা তুলে দেন। পরে প্রতারণার শিকার হয়ে অনেকে আর্থিকভাবে নিঃস্ব হন। কেউ কেউ বিপজ্জনক পথে যাত্রা করে জীবনও হারান।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশকে শুধু জনসচেতনতামূলক প্রচারণায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বিদেশে কর্মসংস্থানের তথ্য যাচাই, নিয়োগদাতার পরিচয় নিশ্চিত করা, বৈধ চুক্তি, স্বচ্ছ নিয়োগব্যয় এবং প্রতারকদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশগামীদের জন্য সহজবোধ্য ভাষায় দেশভিত্তিক অভিবাসন নির্দেশিকা প্রকাশ করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে বিদেশে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট দেশের ভিসা, কাজের অনুমতি, বেতন, আবাসন এবং বসবাসের শর্ত সম্পর্কে বাস্তব ধারণা দিতে হবে। ইউরোপে প্রবেশ করলেই স্থায়ী বসবাস বা নাগরিকত্ব পাওয়া যাবে, এমন ধারণা থেকে মানুষকে বের করে আনতে হবে।

দক্ষ কর্মী পাঠাতে বাংলাদেশের প্রস্তুতি কোথায়?

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জনসংখ্যার বার্ধক্য, শ্রমবাজারের চাহিদা এবং নির্দিষ্ট পেশায় কর্মীর ঘাটতি আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করছে। কিন্তু এসব সুযোগ কাজে লাগাতে হলে শুধু কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়ালেই হবে না। প্রয়োজন এমন কর্মী, যাঁরা সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষা জানেন, পেশাগত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং কর্মক্ষেত্রের নিয়মকানুন সম্পর্কে সচেতন।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বাংলাদেশের মধ্যে এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ রয়েছে। ২০২৪ থেকে ২০২৭ মেয়াদে পরিচালিত ‘Supporting a Talent Partnership with Bangladesh’ প্রকল্পের লক্ষ্য হলো দক্ষতা উন্নয়ন, শ্রমিকের চলাচল, দক্ষতার স্বীকৃতি এবং নিরাপদ ও বৈধ শ্রম অভিবাসনের পথ তৈরিতে সহযোগিতা করা।

এ উদ্যোগকে কার্যকর শ্রমবাজারভিত্তিক অংশীদারত্বে রূপ দিতে হবে। কোন দেশে কোন পেশায় কর্মীর চাহিদা রয়েছে, কী ধরনের যোগ্যতা প্রয়োজন, কোন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে এবং কীভাবে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে, এসব বিষয়ে বাংলাদেশকে নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার গড়ে তুলতে হবে।

বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ভাষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, জনশক্তি রপ্তানিসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং ইউরোপীয় নিয়োগদাতাদের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। নার্সিং, পরিচর্যাসেবা, নির্মাণ, কৃষি, আতিথেয়তা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতে সংশ্লিষ্ট দেশের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। তবে কোনো পেশায় কর্মীর ঘাটতি রয়েছে বলেই সেখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশিদের কাজের অনুমতি পাওয়া যাবে, এমন ধারণা করা ঠিক নয়। প্রতিটি দেশের নিজস্ব নিয়োগবিধি ও অভিবাসন আইন রয়েছে।

দক্ষ কর্মী পাঠানোর পাশাপাশি তাঁদের অধিকার রক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায্য বেতন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, লিখিত চুক্তি, সামাজিক সুরক্ষা এবং অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়া শ্রম অভিবাসনকে টেকসই বলা যায় না।

বাংলাদেশ-ইউরোপ শ্রমবাজার চুক্তি: সময়ের দাবি

বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে শ্রমবাজারভিত্তিক সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। তবে এ ক্ষেত্রে একক কোনো উদ্যোগের পরিবর্তে দেশভিত্তিক বাস্তবতা, শ্রমবাজারের চাহিদা এবং আইনি কাঠামো বিবেচনা করে অগ্রসর হতে হবে।

বাংলাদেশ সরকারের উচিত সংশ্লিষ্ট ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় শ্রম সহযোগিতা, দক্ষতা স্বীকৃতি, প্রশিক্ষণ এবং নিয়োগপ্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়ে আলোচনা জোরদার করা। যেখানে সম্ভব, স্বচ্ছ ও নিয়ন্ত্রিত কর্মী নিয়োগের ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।

এ ধরনের চুক্তিতে শুধু কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য থাকলেই হবে না। কর্মীদের বেতন, কাজের শর্ত, নিয়োগব্যয়, নিয়োগদাতার দায়িত্ব, চুক্তি লঙ্ঘনের প্রতিকার এবং দেশে ফিরে পুনর্বাসনের বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।

এখানে কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপের কোন দেশে কোন খাতে কত কর্মীর প্রয়োজন, বাংলাদেশি কর্মীদের কী ঘাটতি রয়েছে এবং সেই ঘাটতি পূরণে কত সময় লাগবে, তার বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন প্রয়োজন। আবেগনির্ভর প্রচারণা নয়, তথ্যনির্ভর প্রস্তুতিই পারে বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে।

দূতাবাস ও প্রবাসী সংগঠনগুলোর ভূমিকা :

ইউরোপে বাংলাদেশি দূতাবাস ও কনস্যুলার প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা শুধু পাসপোর্ট বা ভ্রমণসংক্রান্ত সেবায় সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। অভিবাসীদের অধিকার, শ্রমবাজারের সুযোগ, প্রতারণা প্রতিরোধ এবং জরুরি আইনি সহায়তার বিষয়ে তথ্য সরবরাহও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

প্রবাসীদের জন্য নিয়মিত আইনি সচেতনতামূলক সভা, যাচাইকৃত তথ্য প্রকাশ, শ্রমিকদের অভিযোগ গ্রহণ এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। বিশেষ করে নতুন অভিবাসী, শিক্ষার্থী ও অল্প দক্ষতার কর্মীদের জন্য সহজবোধ্য নির্দেশিকা তৈরি করা যেতে পারে।

একই সঙ্গে প্রবাসী ব্যবসায়ী সংগঠন, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও সংবাদমাধ্যমগুলোকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। কোনো ভিসা বা চাকরির বিষয়ে নিশ্চিত সাফল্যের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরিবর্তে যাচাইকৃত তথ্য প্রচার করা জরুরি। ভুয়া সংবাদ ও গুজব অনেক সময় মানুষের আর্থিক ক্ষতি এবং আইনি বিপদের কারণ হয়।

প্রবাসী সংগঠনগুলো চাইলে ইউরোপের নিয়োগদাতা, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে যোগাযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ ধরনের উদ্যোগে স্বচ্ছতা, আইন মেনে চলা এবং কর্মীদের স্বার্থ রক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

অভিবাসী মানেই সমস্যা নয়, সঠিক ব্যবস্থাপনা জরুরি :

ইউরোপের অভিবাসননীতি নিয়ে আলোচনায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। রাষ্ট্রের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অভিবাসন আইন কার্যকর করার অধিকার রয়েছে। একই সঙ্গে বৈধ অভিবাসীদের অধিকার রক্ষা, আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন ন্যায়সংগতভাবে বিবেচনা এবং মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করাও জরুরি।

সব অভিবাসীকে একই পরিচয়ে চিহ্নিত করা যেমন অন্যায্য, তেমনি বৈধতার প্রশ্নকে উপেক্ষা করাও বাস্তবসম্মত নয়। অনিয়মিত অভিবাসনের সমস্যা মোকাবিলায় শুধু ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা জোরদার করলেই হবে না; বৈধ পথে কাজের সুযোগ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নিরাপদ অভিবাসনের পথও সম্প্রসারণ করতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য এই বাস্তবতা একই সঙ্গে সতর্কবার্তা ও সম্ভাবনার দরজা। ইউরোপে শ্রমিকের চাহিদা থাকলে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে, কিন্তু তা করতে হবে দক্ষতা, বৈধতা এবং অধিকার সুরক্ষার ভিত্তিতে। অন্যদিকে, ইউরোপে বসবাসরত বাংলাদেশিদেরও নিজ নিজ আইনি অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং দায়িত্বশীলভাবে আইন মেনে চলতে হবে।

এখনই প্রয়োজন সমন্বিত জাতীয় প্রস্তুতি :

ইউরোপের পরিবর্তিত অভিবাসন বাস্তবতার সঙ্গে তাল মেলাতে বাংলাদেশকে কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রথমত, বৈধ অভিবাসনের দেশভিত্তিক তথ্য সহজলভ্য করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, ভুয়া চাকরি, জাল ভিসা ও মানবপাচারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। চতুর্থত, ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে শ্রম সহযোগিতা ও দক্ষতার স্বীকৃতি নিয়ে আলোচনা জোরদার করতে হবে। পঞ্চমত, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের অধিকার রক্ষা ও দেশে ফেরার পর পুনর্বাসনের ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত, প্রশিক্ষণকেন্দ্র, প্রবাসী সংগঠন এবং সংবাদমাধ্যমের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। অভিবাসনকে শুধু বিদেশে মানুষ পাঠানোর কার্যক্রম হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি কর্মসংস্থান, শিক্ষা, দক্ষতা, কূটনীতি, মানবাধিকার ও জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি বিষয়।

ইউরোপের অভিবাসননীতি বদলাচ্ছে। এই পরিবর্তনকে ভয় ছড়ানোর উপাদান হিসেবে নয়, বরং নিজেদের প্রস্তুতি যাচাইয়ের সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। বাংলাদেশ যদি এখনই দক্ষ জনশক্তি তৈরি, বৈধ অভিবাসনের পথ সম্প্রসারণ এবং প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তাহলে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা সম্ভব।

প্রশ্নটি তাই শুধু ইউরোপের অভিবাসননীতি কতটা কঠোর হচ্ছে, তা নয়। বড় প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি তার নাগরিকদের নিরাপদ, বৈধ ও মর্যাদাপূর্ণ অভিবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারছে?

প্রবাসীদের স্বপ্নকে দালালের হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, দক্ষতা, কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। সময় এসেছে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে একটি সুপরিকল্পিত, মানবিক ও দূরদর্শী অভিবাসননীতি গড়ে তোলার।

লেখক : সম্পাদক, ইউরোবাংলা ও প্রেসিডেন্ট, পর্তুগাল বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির ( PBCCI )
Home R3