ইসরাইলে ভোটগ্রহণ, রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে চাপে নেতানিয়াহু

ইসরাইলে সাধারণ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। গাজা যুদ্ধ, ইরান ও লেবাননের সঙ্গে সংঘাত, আন্তর্জাতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যে এবারের নির্বাচনকে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের ওপর গণভোট হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়, চলবে রাত ১০টা পর্যন্ত। দেশটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ৭৩ লাখ নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার তরুণ এবার প্রথমবারের মতো ভোট দিচ্ছেন।

বিভিন্ন মেয়াদে মোট ১৯ বছর ক্ষমতায় থাকা নেতানিয়াহু ইসরাইলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী। তবে এবারের নির্বাচনে তাঁর ডানপন্থি জোট বিরোধীদের কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ও তার মিত্রদের সঙ্গে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবিরের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ইয়ার লাপিদ ও নাফতালি বেনেটের মতো নেতারাও নির্বাচনী সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, ১২০ আসনের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে নেতানিয়াহুর জোট পিছিয়ে রয়েছে।

নির্বাচনী প্রচারণায় নেতানিয়াহু তাঁর যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েছেন। ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইসরাইলকে সমর্থন দিয়েছেন। রোববার নেতানিয়াহু দাবি করেন, ইরানের হুমকি দূর করতে ট্রাম্প আবারও পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত, তবে তাঁকেই ক্ষমতায় থাকতে হবে।

অন্যদিকে, আইজেনকোট নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ভয় দেখানো, মিথ্যাচার ও হুমকির মাধ্যমে প্রচারণা চালানোর অভিযোগ তুলেছেন। ট্রাম্পের বিষয়ে তিনি বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত যেকোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তিনি পূর্ণ সহযোগিতা করবেন।

সরকার গঠনে নেতানিয়াহুকে আবারও কট্টর ডানপন্থি নেতা ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোট্রিচের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে কয়েকটি পশ্চিমা দেশ তাঁদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তবে জনমত জরিপে বেন-গভিরের জিউইশ পাওয়ার পার্টির সমর্থন বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

অধিকৃত পশ্চিম তীরের কিরিয়াত আরবা বসতিতে ভোট দেওয়ার পর বেন-গভির বলেন, নেতানিয়াহুই আবার প্রধানমন্ত্রী হবেন এবং তাঁর দল নতুন সরকারের ডানপন্থি শক্তি হিসেবে কাজ করবে।

নেতানিয়াহুর বিরোধীদের কাছে এবারের নির্বাচন ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার দায় নির্ধারণেরও একটি সুযোগ। ওই হামলায় ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চলে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে নিয়ে যাওয়া হয়।

হামলার পর গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানে ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাবে অন্তত ৭৪ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। জিম্মিদের সবাইকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে না পারা এবং যুদ্ধ অবসানের সুস্পষ্ট কৌশল না থাকায় নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বেড়েছে।

ক্ষমতায় এলে হামলার আগে ও পরে নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা খতিয়ে দেখতে জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিরোধী দলগুলো। দীর্ঘদিনের দুর্নীতির মামলাও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থানকে চাপে ফেলেছে। তবে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

এদিকে, ইরান ও লেবাননের সঙ্গে সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতাও নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৫ সালে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরাইলের ১২ দিনের বিমান হামলা এবং এ বছর ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক অভিযান আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে।

১২০ আসনের পার্লামেন্টে কোনো পক্ষই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। প্রয়োজনীয় আসন না পেলে সরকার গঠন নিয়ে দীর্ঘ দর-কষাকষি হতে পারে। নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব চালিয়ে যেতে পারেন।

ইসরাইল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের ভিটারবি ফ্যামিলি সেন্টারের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ১৩ শতাংশ ভোটার তখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। ফলে শেষ মুহূর্তের ভোটের হিসাব নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বিরোধী নেতা আইজেনকোট আরব দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোটে যেতে অনাগ্রহী হলেও নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে এসব দলের বাইরে থেকে সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আরব সংখ্যালঘু ভোটারদের উপস্থিতিও নির্বাচনী সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে।

জেরুজালেমের শালোম হার্টম্যান ইনস্টিটিউটের রাজনৈতিক বিশ্লেষক আমোৎস আসা-এল মনে করেন, দুই পক্ষের মধ্যে ভোটের ব্যবধান খুব সামান্য হতে পারে এবং কোনো পক্ষের একচ্ছত্র জয়ের সম্ভাবনা কম।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন আইজেনকোট। তবে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের সমালোচনা করে আট মাস পর তিনি পদত্যাগ করেন। এবার সেই আইজেনকোটই নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক আধিপত্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছেন।

Home R3