বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় সাড়ে ছয় বছরে প্রাণ গেছে প্রায় ৮ হাজার শিশুর

দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় আট হাজার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী ছিল। এভাবে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ২ হাজার ৯৫৮ শিশু। এ ছাড়া পথচারী হিসেবে ২ হাজার ৮১২ এবং বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী হিসেবে ২ হাজার ১৯৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

বুধবার (২১ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। সংস্থাটি ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম এবং নিজস্ব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছে।

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত শিশুদের ৩৫ দশমিক ৩১ শতাংশই ছিল পথচারী। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ২৭১ শিশু প্রাণ হারিয়েছে থ্রি-হুইলারের ধাক্কায়। এ ছাড়া বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পিকআপের মতো ভারী যানবাহনের চাপায় বা ধাক্কায় মারা গেছে ১ হাজার ১২৬ শিশু। প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের ধাক্কায় নিহত হয়েছে ৩১৭ শিশু। মোটরসাইকেলের ধাক্কায় প্রাণ গেছে আরও ৯৮ শিশুর।

গ্রামীণ সড়কেই বেশি প্রাণহানি :

সড়কের ধরন অনুযায়ী পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, শিশু মৃত্যুর সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে গ্রামীণ সড়কে। এসব সড়কে ২ হাজার ৭১৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা মোট প্রাণহানির ৩৪ দশমিক ০৭ শতাংশ। এ ছাড়া আঞ্চলিক সড়কে ২ হাজার ৮২, মহাসড়কে ১ হাজার ৯৭৪ এবং শহরের সড়কে ১ হাজার ১৯৪ শিশু প্রাণ হারিয়েছে।

দুর্ঘটনার সময় বিবেচনায় বিকেল ছিল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এ সময়ে ২ হাজার ৬৩৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সকালে প্রাণ গেছে ২ হাজার ১৬৮ শিশুর, দুপুরে ১ হাজার ৮১৩ জনের। অন্যদিকে রাতে ৫৯৮, সন্ধ্যায় ৫৪৬ এবং ভোরে ২০৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

কিশোরদের মৃত্যুর সংখ্যা বেশি :

বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নিহত শিশুদের মধ্যে ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এই বয়সসীমায় প্রাণ হারিয়েছে ৩ হাজার ৫৪৭ শিশু, যা মোট মৃত্যুর ৪৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এ ছাড়া ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী ২ হাজার ৮৮৪ এবং শূন্য থেকে ৫ বছর বয়সী ১ হাজার ৫৩২ শিশু সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ২ হাজার ৫১৩ শিশুর। আর বাড়ির আশপাশের সড়কে খেলাধুলার সময় দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা গেছে ৯৬২ শিশু।

শিশু মৃত্যুর পেছনে যেসব কারণ :

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষণে শিশুদের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শিশুবান্ধব সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থার অভাব, নিরাপদে সড়ক ব্যবহারের বিষয়ে অসচেতনতা এবং পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ না দেওয়া। পাশাপাশি অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের যানবাহন চালানো এবং দুর্ঘটনায় আহত শিশুদের যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়াও মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

সংস্থাটি বলছে, গ্রামীণ এলাকায় বসতবাড়ির পাশ দিয়ে যানবাহন চলাচল করলেও অনেক ক্ষেত্রে ট্রাফিক নিয়ম যথাযথভাবে মানা হয় না। এসব সড়কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাও সীমিত। ফলে বাড়ির আশপাশে চলাফেরা ও খেলাধুলার সময় শিশুরা দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে থাকে।

সড়ক নিরাপত্তায় একাধিক সুপারিশ :

শিশুদের প্রাণহানি কমাতে সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থাকে নিরাপদ ও শিশুবান্ধব করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। একই সঙ্গে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক সচেতনতা বাড়ানো এবং অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

এ ছাড়া জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসাসেবা উন্নত করা, চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে বিশেষ সরকারি তহবিল গঠন এবং সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানের পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সড়ক ব্যবস্থাপনার নানা ত্রুটির কারণে শিশুরা প্রাণ হারাচ্ছে, অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করছে। এ ধরনের ক্ষতি শুধু সংশ্লিষ্ট পরিবার নয়, পুরো জাতির জন্যই অপূরণীয়।

Home R3