১৩ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

চীনের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিতে প্রস্তুত ইউরোপীয় পার্লামেন্ট

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের চীনবিষয়ক বাণিজ্য প্রতিনিধি প্যাসকাল ক্যানফিন বলেছেন, চীনের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা। ইউরোপের শিল্পখাতকে শক্তিশালী করতে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ একটি আইনে এ ধরনের পদক্ষেপের পক্ষে সমর্থন বাড়ছে।

ব্রাসেলস থেকে পলিটিকোর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের জ্যেষ্ঠ সদস্য প্যাসকাল ক্যানফিন বলেন, চীনের বিষয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে কঠোর অবস্থানের পক্ষে ঐকমত্য তৈরি হচ্ছে।

চীনের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য সম্পর্কের বিষয়ে পার্লামেন্টের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি ক্যানফিন চীনের দ্রুত বাড়তে থাকা রপ্তানি নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন।

ফরাসি এই রাজনীতিক বলেন, “চীনের পুরো নীতির উদ্দেশ্য হলো তাদের নিজস্ব শক্তি, মূল্যবোধ এবং কমিউনিস্ট পার্টির একনায়কতন্ত্রের ভিত্তিতে নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থার নেতৃত্ব দেওয়া।”

চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বর্তমানে বাণিজ্য ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা চলছে। চীনের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দৈনিক বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ১০০ কোটি ইউরো। চীন থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানির ফলে ইউরোপের স্থানীয় উৎপাদকরা চাপের মুখে পড়ছেন। বিশেষ করে গাড়ি ও রাসায়নিক শিল্পে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইউরোপের শিল্পভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য কমিশনার মারোস শেফচোভিচ আগামী অক্টোবর মাসে চীন সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। বাণিজ্য নিয়ে চলমান আলোচনার অংশ হিসেবে তিনি বেইজিং যাবেন। তিনি বলেছেন, অক্টোবরের মধ্যে অগ্রগতি না হলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।

চীনের শিল্পখাতে আধিপত্য মোকাবিলায় ইউরোপীয় কমিশনও বিভিন্ন পদক্ষেপ বিবেচনা করছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা বিভিন্ন দেশের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নতুন নিয়ম এবং হাইব্রিড বৈদ্যুতিক গাড়ির মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের আমদানি সীমিত করার ব্যবস্থা রয়েছে।

বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় পার্লামেন্টের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটি চীনের অতিরিক্ত রপ্তানি এবং কাঁচামাল থেকে সেমিকন্ডাক্টর পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীনের ওপর ইউরোপের অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর পক্ষে অবস্থান নেয়। তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতাকে “অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের” ঝুঁকি মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

চীনের সঙ্গে আগের মতো সম্পর্ক আর নয় :

ক্যানফিন বলেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আগের মতো স্বাভাবিক নীতি আর চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, এমন উপলব্ধি ইউরোপীয় আইনপ্রণেতাদের মধ্যে বাড়ছে। চীনের বিষয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে আরও কঠোর শিল্পনীতি গ্রহণের পক্ষে সমর্থন বাড়ছে বলেও তিনি জানান।

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা বর্তমানে প্রস্তাবিত ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাকসেলারেটর অ্যাক্ট নিয়ে নিজেদের অবস্থান ঠিক করছেন। এই আইনের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব সরকারি ক্রয়ে ইউরোপীয় কৌশলগত শিল্পপণ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

এ ছাড়া আইনপ্রণেতারা ‘মেড ইন ইউরোপ’ নীতির আওতায় ইউরোপের নিজস্ব শিল্পকে আরও সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আরও কঠোরভাবে যাচাইয়ের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন।

চীনকে মোকাবিলা এবং ইউরোপের শিল্পভিত্তি শক্তিশালী করার উদ্যোগ হিসেবেই এই নীতিকে দেখা হচ্ছে।

ক্যানফিন বলেন, ইউরোপের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চীন নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও দেশটির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পক্ষে সমর্থন বাড়ছে। বাম ও ডান উভয় রাজনৈতিক শিবির থেকেই এ অবস্থানের প্রতি সমর্থন পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি বলেন, “আমি বলছি না যে বিষয়টি চূড়ান্ত হয়ে গেছে। তবে আমি মনে করি, পার্লামেন্টের ভেতরে আমরা এই লড়াইয়ে জয়ী হতে পারি।”

জার্মানির অবস্থান নিয়েও পরিবর্তনের আভাস :

ক্যানফিন সতর্ক করে বলেন, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের তুলনায় বিভিন্ন দেশের সরকার চীনের বিষয়ে তুলনামূলক সতর্ক অবস্থান নিতে পারে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো ইতোমধ্যে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাকসেলারেটর অ্যাক্টের কিছু অংশ পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। বিশেষ করে ‘মেড ইন ইউরোপ’ নীতির আওতা কিছুটা শিথিল করে যেসব দেশের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুক্ত বাণিজ্য বা সরকারি ক্রয় চুক্তি রয়েছে, তাদের নির্দিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রে সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

তবে ক্যানফিনের মতে, ইউরোপের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি জার্মানিও ধীরে ধীরে চীনের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের দিকে এগোচ্ছে। দেশটির ছোট ও মাঝারি ব্যবসাগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে সমর্থন বাড়ছে। যদিও বড় জার্মান কোম্পানিগুলোর অনেকেই এখনো চীনের বাজারে বড় ধরনের বিনিয়োগ করে যাচ্ছে।

ক্যানফিন বলেন, “জার্মান সরকার সবসময় মনে করেছে, বিএমডব্লিউ, বিএএসএফ ও মার্সিডিজের জন্য যা ভালো, তা সবার জন্যই ভালো। আজ সেই ধারণা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।”

বার্লিনের অবস্থান কতটা বদলাবে, তা জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের জোট সরকারের শক্তির ওপর নির্ভর করছে। গত সপ্তাহে পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি বা এএফডি বড় জয় পাওয়ার পর মের্ৎস রাজনৈতিক চাপে রয়েছেন।

চীনের দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষক এবং ফেব্রুয়ারিতে মের্ৎসের প্রথম চীন সফরের আগে তাকে পরামর্শ দেওয়া ইয়র্গ ভুটকে বলেন, মের্ৎসের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হলে বার্লিনের অগ্রাধিকার তালিকায় চীনের গুরুত্ব আরও কমে যেতে পারে।

তবে বড় প্রশ্ন হলো, ইউরোপের শিল্প সুরক্ষায় মের্ৎসের সাম্প্রতিক কঠোর বক্তব্যকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হবে। জুলাইয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে এক সংবাদ সম্মেলনে মের্ৎস বলেছিলেন, চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্তের কারণে ইউরোপে কর্মসংস্থান কমছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি মেনে নিতে তিনি প্রস্তুত নন।

এর আগে জার্মানির পরপর কয়েকটি সরকার চীনের বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। কারণ, চীনের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিলে সেখানে ব্যবসা করা জার্মান কোম্পানিগুলো চীনের পাল্টা পদক্ষেপের মুখে পড়তে পারে।

ভুটকের মতে, মের্ৎসের সাম্প্রতিক কঠোর বক্তব্যের একটি বড় কারণ ছিল দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচন।

সূত্র : পলিটিকো

Home R3