ইতালির ভেনিস সংলগ্ন মেস্ত্রে এলাকায় একটি মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রশাসন ও প্রবাসী বাংলাদেশি মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। প্রস্তাবিত মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার নির্মাণের প্রশাসনিক অনুমোদন আটকে যাওয়ায় দাবি আদায়ে শিল্প ও পর্যটন খাতে কর্মবিরতিসহ শহর অচল করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাংলাদেশি প্রবাসীরা।
শুক্রবার যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মেস্ত্রের ভিয়া জিউস্তিজিয়া এলাকায় একটি পরিত্যক্ত করাতকলের জমি কিনে প্রায় ৮ হাজার বর্গমিটার জায়গাজুড়ে মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটি।
তবে গত মে মাসে ভেনিসের নবনির্বাচিত কেন্দ্র-ডানপন্থি মেয়র সিমোনে ভেনতুরিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকল্পটির নগর পরিকল্পনা ও জমি পুনর্বিন্যাসের অনুমোদন আটকে যায়।
ইতালীয় সংবাদপত্র কোরিয়েরে দেল্লা সেরা-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেয়র ভেনতুরিনি বলেন, ৮ হাজার বর্গমিটারের প্রস্তাবিত স্থাপনাটি আয়তনে অতিরিক্ত বড়। যেকোনো আলোচনা শুরুর আগে ইতালীয় সমাজে অভিবাসীদের একীভূত হওয়ার প্রমাণ দেখতে চান তিনি।
বিশেষ করে নারীদের ‘পূর্ণাঙ্গ পর্দা’ পরিধান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন মেয়র। একই সঙ্গে বাংলাদেশি প্রবাসীদের ইতালীয় ভাষা শেখা এবং তাদের সন্তানদের নিয়মিত স্কুলে পাঠানোর ওপর জোর দেন তিনি।
মেয়রের এমন অবস্থান ও শর্তের প্রতিবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশি প্রবাসীরা। বাংলা কমিউনিটির প্রতিনিধি প্রিন্স হাওলাদার বলেন, ভেনিস ও মেস্ত্রে এলাকায় বসবাসরত প্রায় ১০ হাজার থেকে ৪০ হাজার বাংলাদেশির ধর্মীয় অধিকার নিশ্চিত করতে একটি মসজিদ নির্মাণ জরুরি।
তিনি জানান, মসজিদ নির্মাণের বিষয়ে ভেনিসের সাবেক মেয়র লুইগি ব্রুগনারোর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছিল। তবে বর্তমান মেয়র দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়েছে।
দাবি আদায় না হলে রাজপথে আন্দোলন ও ধর্মঘটের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন প্রবাসীরা।
প্রিন্স হাওলাদার বলেন, “ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ ‘ফিনক্যানতিয়েরি’ শিপইয়ার্ডের এক-চতুর্থাংশ শ্রমিকই বাংলাদেশি। এছাড়া স্থানীয় বার, ক্যাফে ও রেস্তোরাঁয় হাজার হাজার বাংলাদেশি কর্মরত। তারা কাজে যাওয়া বন্ধ রাখলে ফিনক্যানতিয়েরি শিপইয়ার্ড বন্ধ হয়ে যাবে এবং পর্যটন খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
এ বিষয়ে ইতালির প্রেসিডেন্ট সার্জিও মাত্তারেল্লার হস্তক্ষেপ চাওয়ার পরিকল্পনাও করছেন প্রবাসীরা।
মসজিদ নির্মাণ নিয়ে বিরোধের জেরে ইতালির রাজনীতিতেও শুরু হয়েছে পাল্টাপাল্টি অবস্থান। দেশটির উপ-প্রধানমন্ত্রী ও ‘দ্য লিগ’ দলের নেতা মাত্তেও সালভিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “ভেনিস বা ইতালির কোথাও আর কোনো মসজিদ করতে দেওয়া হবে না। চাপ দিয়ে বা শহর জিম্মি করে নিজেদের দাবি আদায়ের হুমকি গ্রহণযোগ্য নয়।”
প্রধানমন্ত্রী জিয়োর্জিয়া মেলোনির ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’ দলের নেতা রাফায়েল স্পেরানজা এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য সিলভিয়া সারদোনেও বাংলাদেশি প্রবাসীদের ধর্মঘটের হুমকির সমালোচনা করেছেন।
তবে ভেনিসের কেন্দ্র-বামপন্থী রাজনীতিক আন্দ্রেয়া মারতেল্লার দাবি, ডানপন্থি দল ‘ফুচুরো নাজিওনালে’-র নেতা রবার্তো ভান্নাচ্চির কট্টর অভিবাসনবিরোধী জনপ্রিয়তাকে টেক্কা দিতেই মেয়র ভেনতুরিনি এমন অবস্থান নিয়েছেন।
অন্যদিকে, ভেনিসের সাবেক মেয়র মাসসিমো কাচ্চারি, ইসলামিক সম্প্রদায়ের সভাপতি সাদমির আলিওভস্কি এবং দেশটির শতাধিক মানবাধিকারকর্মী প্রবাসীদের ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তারা আলোচনার মাধ্যমে মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পের আইনি জটিলতা নিরসনের আহ্বান জানিয়েছেন।