ফ্রান্সের শিক্ষার্থীরা কেন বিক্ষোভ করছে?

ফ্রান্সের কিশোর শিক্ষার্থীরা টানা তিন সপ্তাহ ধরে তাদের উচ্চমাধ্যমিক স্কুল অবরোধ করে আসছে। তবে এখনো তাদের শান্ত করার কোনো উপায় খুঁজে পায়নি দেশটির সরকার। মঙ্গলবার দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সারা দেশে প্রায় ২ লাখ ৫৬ হাজার মানুষ বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে শুধু প্যারিসেই ছিলেন ৫৬ হাজার মানুষ। শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় সংগঠন জানিয়েছে, ওই দিনের বিক্ষোভে প্রায় ১ হাজার ৮০০টি লিসে বা উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। এসব স্কুলে সাধারণত ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে।

এই আন্দোলনের শুরু প্যারিসের একটি শহরতলিতে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ক্রেতেই শহরের লিসে সাঁ এক্সুপেরির শিক্ষার্থীরা শিক্ষক ধর্মঘটের সঙ্গে সংহতি জানায়। ওই শিক্ষকেরা পর্যাপ্ত শিক্ষক ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবের প্রতিবাদ করছিলেন। কর্তৃপক্ষ দ্রুত অতিরিক্ত কর্মী পাঠায়। তাদের মধ্যে একজন উপপ্রধান শিক্ষক ও একজন নার্সও ছিলেন। এরপর ওই স্কুলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে।

কিন্তু এরই মধ্যে আন্দোলন অন্য স্কুলে ছড়িয়ে পড়ে। পরে তা প্যারিসের শ্রমজীবী মানুষের বসবাসের এলাকা অবেরভিলিয়ে, এরপর মার্সেই, লিল, স্ত্রাসবুর্গ, তুলুজ ও রেন শহরেও ছড়িয়ে যায়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে সরকারি মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে প্রায় ১০ শতাংশ ক্লাস নেওয়া সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে প্রায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে অনুপস্থিত শিক্ষকদের বদলি শিক্ষকও পাওয়া যায়নি।

শিক্ষার্থীরা বলছে, অনেক শ্রেণিকক্ষে ৩৫ জনের বেশি শিক্ষার্থী থাকে। পর্যাপ্ত চেয়ার নেই, টয়লেটের সংখ্যাও কম। অনেক স্কুলের দেয়াল দিয়ে পানি পড়ে। এ ছাড়া গ্রীষ্মকালের তীব্র তাপপ্রবাহ নিয়েও তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। ওই তাপপ্রবাহে ফ্রান্সে প্রায় ৮ হাজার মানুষ মারা যায়।

কিছু শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্ম ‘পারকুরসুপ’ নিয়েও অসন্তুষ্ট। তাদের মতে, এই ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের মধ্যে চাপ ও অনাস্থা বাড়াচ্ছে।

সবকিছুর পেছনে অর্থের বিষয়টিও রয়েছে। শিক্ষক ও গবেষকেরা বলছেন, গত এক দশকে শিক্ষার্থীপ্রতি অর্থ বরাদ্দ মোটামুটি একই রয়েছে। অথচ স্কুলগুলোর দায়িত্ব ও কাজ বেড়েছে। ফ্রান্স সরকার ২০২৭ সালের বাজেটের ঘাটতি কমানোর চেষ্টা করছে। এ কারণে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ছে মাত্র ১ দশমিক ৭ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কম।

দরিদ্র শহরতলির শিক্ষার্থীরা বলছে, একটি শিশু কোথায় বাস করে, তার ওপর তার শিক্ষার মান নির্ভর করা উচিত নয়।

আগুন, কাঁদানে গ্যাস ও গ্রেপ্তার :

বেশিরভাগ বিক্ষোভ মিছিল শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে কিছু জায়গায় সহিংসতার ঘটনাই এখন বেশি আলোচনায় এসেছে। বিক্ষোভকারীরা কয়েকটি স্কুলের বাইরে আগুন দিয়েছে। জবাবে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও পানি ছোড়ার কামান ব্যবহার করেছে।

ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত অন্তত ২১৫ জন কিশোর শিক্ষার্থী ও ৮৫ জন স্কুলকর্মী আহত হয়েছেন। তিনি এটিকে কয়েক দশকের মধ্যে ফ্রান্সের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতি বলে উল্লেখ করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, বিক্ষোভে ৭০০ জনের বেশি পুলিশ সদস্যও আহত হয়েছেন। উত্তর ফ্রান্সে একটি গ্রেনেড বিস্ফোরণে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর তার একটি হাত হারিয়েছে।

পুলিশ এখন পর্যন্ত ৬ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের ৮৭ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। অধিকারকর্মী ও শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছে, শিশুদের ওপর পুলিশ অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করছে।

সরকার এবং মেরিন ল্য পেনের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল র‌্যালি দল এই অস্থিরতার জন্য কট্টর বামপন্থী দল লা ফ্রঁস ইনসুমিজকে দায়ী করেছে। তবে দলটি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

লেফটেন্যান্ট নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ তার সমর্থকদের শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। শিক্ষকদের সংগঠনগুলোও বিক্ষোভে যোগ দিয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে প্রথমে এই আন্দোলনকে বৈধ বলে মন্তব্য করেছিলেন। পরে তিনি বলেন, সহিংস গোষ্ঠীগুলো আন্দোলনটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে হওয়া বিক্ষোভে পুলিশকে সাময়িকভাবে স্টান গ্রেনেড ব্যবহার না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দেশজুড়ে কয়েক দিন ধরে চলা শিক্ষার্থী বিক্ষোভে পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ বাড়তে থাকায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের কঠোর আচরণের দৃশ্য দেখা গেছে। এসব অভিযোগের পর পুলিশ অসদাচরণের অভিযোগে ১৮টি অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করেছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের উদ্যোগ :

প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু মন্ত্রীদের অক্টোবরের শেষ নাগাদ প্রথম দফার প্রস্তাব দিতে বলেছেন। এসব প্রস্তাবের মধ্যে অনুপস্থিত শিক্ষকদের পরিবর্তে নতুন শিক্ষক নিয়োগ, স্কুলের দৈনিক সময়সূচি পর্যালোচনা এবং পুরোনো স্কুল ভবন মেরামতের বিষয় রয়েছে।

মাসের শেষ নাগাদ এসব কাজের সময়সূচি ও অর্থের পরিকল্পনাও দেওয়ার কথা রয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রী জেফ্রে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ জানানোর জন্য একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করেছেন। পাশাপাশি প্রতিটি স্কুলে অর্ধদিনের আলোচনা আয়োজনের পরিকল্পনাও করেছেন।

সরকার উচ্চশিক্ষায় কিছু নিবন্ধন ফি বাড়ানোর প্রস্তাবও বাতিল করেছে। তবে শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলো বলছে, এসব পদক্ষেপ কোনো বাস্তব সমাধান নয়। তারা আরও বিক্ষোভের আহ্বান জানিয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রী জেফ্রে স্বীকার করেছেন, এই আন্দোলনের কোনো একক জাতীয় দাবি নেই। কারণ স্থানীয় বিভিন্ন সমস্যা থেকে আন্দোলনটি ধীরে ধীরে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

ফ্রান্সের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা এর আগেও স্কুলের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আন্দোলন করেছে। ১৯৯৮ সালে প্রায় ৩ লাখ শিক্ষার্থী এক দিনে মিছিল করে আরও শিক্ষক নিয়োগ ও ছোট শ্রেণিকক্ষের দাবি জানিয়েছিল। ২০০৮ সালে শিক্ষক পদ কমানোর পরিকল্পনার বিরুদ্ধে তারা রাস্তায় নামে। ২০১৮ সালে তারা বেকালোরিয়া পরীক্ষার সংস্কারের প্রতিবাদ করে।

তবে এবারের আন্দোলন বিক্ষোভের বড় আকার এবং আটক হওয়া অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীর সংখ্যার কারণে আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে।

ভেঙে পড়া স্কুল ও শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভ শুধু ফ্রান্সেই দেখা যাচ্ছে না। ভারতেও ককরোচ জনতা পার্টি নামে একটি দল গত ১৫ আগস্ট দেশজুড়ে ‘স্কুল ঠিক করো’ নামে একটি প্রচারণা শুরু করেছে। এর মাধ্যমে গ্রামের সরকারি স্কুলগুলোর মৌলিক সুযোগ-সুবিধা পরীক্ষা করতে অভিভাবকদের আহ্বান জানানো হয়েছে।

শিক্ষার ব্যয় বাড়ার বিরোধিতা করে বেলজিয়ামেও বিক্ষোভ হয়েছে। দেশটির লিয়েজ শহরে অনুষ্ঠিত এসব বিক্ষোভের কিছু অংশ সহিংস হয়ে উঠলে ১০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

মাকতুব মিডিয়ায় কলামটি লিখেছেন, ইন্তেজার সাইফি

Home R3