ছবি: রবার্ট অ্যাশার
নির্যাতন, বিনা কারণে আটক এবং খাবার-পানির তীব্র সংকটের অভিযোগ করেছেন পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মৌরিতানিয়া থেকে বিতাড়িত অভিবাসীরা। এমনকি তাদের অনেককে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই আটক করে প্রতিবেশী দেশ সেনেগালের রোসো শহরে পাঠানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসনবিষয়ক সংস্থা মিক্সড মাইগ্রেশন সেন্টারের (এমএমসি) এক মাঠপর্যায়ের গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
চলতি বছরের আগস্টে এমএমসির পশ্চিম আফ্রিকাবিষয়ক এক কর্মকর্তা সেনেগাল ও মৌরিতানিয়ার সীমান্তবর্তী রোসো শহর পরিদর্শন করেন। এ সময় সম্প্রতি মৌরিতানিয়া থেকে বিতাড়িত অভিবাসী এবং স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। ওই সপ্তাহে তিন দফায় প্রায় ১০০ জনসহ বেশ কয়েকটি দলকে সীমান্ত দিয়ে সেনেগালে পাঠানো হয়।
এমএমসির কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, অভিবাসীদের মুখে সবচেয়ে বেশি শোনা গেছে, ‘আমাদের সাথে এমন আচরণ করা হয়, যেন আমরা মানুষ নই।’
অভিবাসীদের অভিযোগ, মৌরিতানিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী পরিচয়পত্র যাচাই না করেই অভিযান চালিয়ে লোকজনকে আটক করছে। এমনকি বৈধ কাগজপত্র থাকা ব্যক্তিরাও এসব অভিযানের শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে বুরকিনা ফাসো, মালি, গিনি ও আইভরি কোস্টের কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিকদের বেশি লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
টোগোর এক নারী জানান, বৈধ কাগজপত্র সংগ্রহ করতে তিনি প্রায় ৫ লাখ পশ্চিম আফ্রিকান সিএফএ ফ্রাঁ (প্রায় ৮৫০ ডলার) খরচ করেছিলেন। কিন্তু কাগজপত্র সঙ্গে থাকা সত্ত্বেও তা যাচাই না করেই তাঁকে বিতাড়িত করা হয়। অন্যদের অভিযোগ, অভিযানের সময় তাদের পরিচয়পত্র ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে।
আটক ব্যক্তিদের কয়েকজন জানান, তাদের কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগও দেওয়া হয়নি। আটককেন্দ্রে প্রতিদিন মাত্র একবার খাবার দেওয়া হতো। প্রায় ৪০ জন বা তার বেশি মানুষ একত্র হওয়ার পর তাদের সেনেগালে পাঠানো হতো।
এ ঘটনায় পরিবার বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এক নারী জানান, তিন মাস বয়সী শিশুকে বাসায় রেখে খাবার কিনতে নিচে যাওয়ার সময় অভিযানে আটক হন তিনি। পরে তাঁকে সেনেগালে পাঠানো হয়। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) কর্মীরা শিশুটিকে খুঁজে বের করে রোসোতে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেন।
রোসোতে পৌঁছানোর পরও অভিবাসীরা মানবিক সংকটে পড়ছেন। সেনেগালের পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের ছেড়ে দিলেও খাবার, পানি, আশ্রয় কিংবা বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় একটি মানবিক সংগঠন সপ্তাহের কর্মদিবসগুলোতে খাবার ও পানি সরবরাহ করে। তবে সপ্তাহান্তে কোনো নিয়মিত সহায়তা নেই। এক শনিবার প্রায় ১০০ মানুষ দিনভর খাবার ও পানি ছাড়াই কাটিয়েছেন।
পুরুষদের জন্য নদীর পাশে একটি খোলা আশ্রয়কেন্দ্র থাকলেও নারীদের থাকার তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। অনেকের কাজ ও অর্থ না থাকায় খোলা জায়গায় রাত কাটাতে হচ্ছে। কেউ কেউ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও সঙ্গে আনতে পারেননি।
এমএমসির জুন ২০২৬-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মৌরিতানিয়ায় অভিবাসনবিরোধী অভিযানের সময় ৩০ হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে অন্তত ১৮ হাজার ৩০০ জনকে মালি ও সেনেগালে বিতাড়িত করা হয়েছে।
এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মৌরিতানিয়া ২০২৪ সালে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, মানবপাচার প্রতিরোধ ও শরণার্থীদের সহায়তায় ২১ কোটি ইউরোর অংশীদারত্ব ঘোষণা করে। তবে বিতাড়িত অভিবাসীদের পরবর্তী নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
এমএমসির গবেষকদের মতে, রোসোতে বিতাড়িত মানুষের সংখ্যা বাড়লেও খাবার, আশ্রয় ও চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। পরিস্থিতির উন্নতির পরিবর্তে দিন দিন অবনতি হচ্ছে।
সূত্র : ইনফোমাইগ্রেন্টস