ফ্রান্স থেকে ব্রিটেনে যাওয়ার জন্য অভিবাসীরা ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিতে এখন আগের চেয়ে আরও দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ ব্যবহার করছেন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চ্যানেলে ফরাসি কর্তৃপক্ষের নজরদারি ও টহল বাড়ানোর পর পাচারকারীরা নতুন নতুন স্থান থেকে নৌকা ছাড়ানোর চেষ্টা করছে।
উত্তর ফ্রান্সের ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপথের তুলনায় কিছু নতুন যাত্রাস্থল পাঁচ গুণ পর্যন্ত দূরে। গত ২১ সেপ্টেম্বর উত্তর ফ্রান্সের পোর্ট-অঁ-বেসাঁ শহর থেকে প্রায় ৫০ জনকে নিয়ে একটি নৌকা ব্রিটেনের উদ্দেশে রওনা হয়। প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত নৌকাটি ব্রিটিশ উপকূলের দিকে যাচ্ছিল।
পোর্ট-অঁ-বেসাঁ শহরটি কানের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। সেখান থেকে সাধারণত ফেরিতে ব্রিটেনের পোর্টসমাউথ ও প্লাইমাউথে যাওয়া যায়। এই এলাকা থেকে সরাসরি ব্রিটিশ উপকূলের দিকে গেলে নৌকাটি সাসেক্সের ওয়ার্দিং ও হ্যাম্পশায়ারের পোর্টসমাউথের মাঝামাঝি এলাকায় পৌঁছানোর কথা। এটি অভিবাসীদের প্রচলিত গন্তব্য ডোভারের আশপাশের কেন্ট অঞ্চল থেকে অনেক পশ্চিমে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ফ্রান্স থ্রি নরম্যান্ডি জানিয়েছে, নৌকাটি থামানোর বদলে ফরাসি কর্তৃপক্ষ সেটিকে নিরাপদে ব্রিটিশ উপকূলে পৌঁছানো পর্যন্ত সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে স্থানীয় জবুর্গ উপকূলরক্ষী পরিচালনা কেন্দ্র জানায়, ছোট নৌকাটির সঙ্গে থাকার জন্য দুটি জাহাজ পাঠানো হয়েছে।
পোর্ট-অঁ-বেসাঁ থেকে ব্রিটেনের সবচেয়ে কাছের উপকূলের দূরত্ব প্রায় ১৬০ কিলোমিটার। এটি ক্যালের উপকূল থেকে ইংল্যান্ডের কেন্ট পর্যন্ত অভিবাসীদের ব্যবহৃত প্রচলিত পথের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ দীর্ঘ।
পোর্ট-অঁ-বেসাঁ থেকে রওনা হওয়ার পর নৌকাটি কাছের ভারাভিল সৈকতে থামে। স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেখানে প্রায় ১৫ জনকে নৌকায় উঠতে দেখা যায়।
নরম্যান্ডির ক্যালভাদোস অঞ্চলের আরেকটি সৈকত ক্যাবুর্গে নৌকায় ওঠার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় অন্তত চারজনকে আটক করে পুলিশ। ফরাসি আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম উয়েস্ট ফ্রান্সের প্রকাশিত ছবিতে পুলিশকে ওই ব্যক্তিদের সৈকত থেকে নিয়ে যেতে দেখা যায়।
দূরবর্তী এলাকা থেকে যাত্রার চেষ্টা বাড়ছে :
চলতি বছরের শুরুতে ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে অনিয়মিতভাবে ব্রিটেনে প্রবেশ ঠেকাতে ফ্রান্সকে দেওয়া অর্থ বাড়িয়েছে ব্রিটিশ সরকার। এরপর পাচারকারীরা উপকূলের এমন কিছু এলাকা থেকে নৌকা ছাড়ানোর চেষ্টা করছে, যেগুলো আগে প্রায় অকল্পনীয় ছিল।
গত সপ্তাহে ফরাসি সরকার সতর্ক করে জানিয়েছে, অভিবাসীদের যাত্রার স্থান ক্রমেই দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে সেইন-ম্যারিটিম প্রিফেকচারে নৌকায় ব্রিটেন যাওয়ার ৫৬টি চেষ্টা রেকর্ড করা হয়েছে। অথচ ২০২৫ সালের পুরো বছরে এমন চেষ্টা হয়েছিল ৩১টি।
সীমান্ত পুলিশ জানিয়েছে, পাচারকারীরা তাদের কৌশলেও পরিবর্তন আনছে। এখন ব্রিটেনে যাওয়ার জন্য আরও বড় নৌকা ব্যবহার করা হচ্ছে। কয়েক মাস আগে ১৮ মিটার দীর্ঘ একটি শক্তপোক্ত রাবারের নৌকায় একসঙ্গে ২৩০ জন অভিবাসী ব্রিটেনে পৌঁছান। এটি ছিল একবারে সবচেয়ে বেশি মানুষের পৌঁছানোর নতুন রেকর্ড।
ইংলিশ চ্যানেলে ঝুঁকি বাড়ছে :
ইংলিশ চ্যানেলে প্রাণহানিও অব্যাহত রয়েছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইগ্রেশন অবজারভেটরির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে এই বিপজ্জনক যাত্রায় অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থার ‘মিসিং মাইগ্র্যান্টস’ প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে ইউরোপের মূল ভূখণ্ড থেকে ব্রিটেন যাওয়ার পথে অন্তত ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই হিসাবের মধ্যে সমুদ্রে যাত্রা করে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের পাশাপাশি চ্যানেল উপকূলে পার হওয়ার অপেক্ষায় বিভিন্ন কারণে মারা যাওয়া এবং ট্রাক বা ট্রেনে করে ব্রিটেনে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিরাও রয়েছেন।
গত কয়েক বছরে বেশিরভাগ মৃত্যুর ঘটনা অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই ছোট ও অনিরাপদ নৌকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বেশি মানুষের কাছ থেকে বেশি অর্থ আদায়ের জন্য পাচারকারীরা এসব নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রী তোলে।
অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে কেউ কেউ পানিতে ডুবে নয়, বরং নৌকার ভেতরে চাপা পড়ে বা শ্বাসরোধ হয়ে মারা যান। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত নৌপথ হওয়ায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
নজরদারিতে ফ্রন্টেক্সের সহায়তা :
ইংলিশ চ্যানেলে নজরদারি আরও বাড়াতে ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্স দুটি জাহাজ পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।
তবে ফ্রন্টেক্সের জাহাজ দুটি সরাসরি আটক বা উদ্ধার অভিযানে অংশ নেবে না। তারা মূলত ফরাসি টহল দলকে নজরদারিতে সহায়তা করবে।
ব্রিটেনে অনিয়মিত অভিবাসীদের প্রবেশ এখনো দেশটির অন্যতম বড় রাজনৈতিক ইস্যু। অভিবাসনবিরোধী নীতির পক্ষে থাকা কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর প্রতি জনসমর্থনও বেড়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে শ্রমিক দলের সরকার নেওয়া কিছু পদক্ষেপের পর ব্রিটেনে অনিয়মিত অভিবাসী পৌঁছানোর হার কমেছে এবং তা সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
সূত্র : ইনফোমাইগ্রেন্টস