জাপানে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসে রুপার পদক জিতেছেন আফগান নারী সাইক্লিস্ট ফারিবা হাশিমি। তার এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম ও সাহসিকতার গল্প। ২০২১ সালে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ফিরে আসার পর দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। এর আগে নিরাপত্তার জন্য কয়েক বছর ছেলের ছদ্মবেশে সাইক্লিং অনুশীলন করেছিলেন ফারিবা।
ফারিবার বয়স এখন ২৩ বছর। তিনি বলেন, এশিয়ান গেমসে রুপার পদক জয় তার জন্য ‘বিশেষ কিছু’। এই সাফল্য আফগানিস্তানের অন্য নারীদেরও নিজেদের স্বপ্ন পূরণের জন্য চেষ্টা করতে অনুপ্রাণিত করবে বলে আশা করেন তিনি।
ফারিবা দাবি করেন, ‘আমি এমন একটি দেশে জন্মেছি, যেখানে স্বপ্ন দেখা নারীদের ওপর হামলা করা হয়। আমি সেই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে পেরেছি বলে খুবই খুশি। আমি আশা করি, পরবর্তী প্রজন্মের নারীরা কোনো ভয় ছাড়াই এখানে এসে নিজেদের দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে। কারণ এই মুহূর্তে আফগানিস্তানে এ ধরনের স্বাধীনতা নেই।’
সাইকেল চালানোর কারণে হামলার শিকার :
২২ সেপ্টেম্বর জাপানের নাগোয়া শহরে অনুষ্ঠিত নারীদের রোড রেসে রুপার পদক জেতেন ফারিবা। এর আগে গত সপ্তাহের শেষ দিকে নারীদের ব্যক্তিগত টাইম ট্রায়ালে সপ্তম হয়েছিলেন তিনি।
রয়টার্সকে আফগান সামাজিক চিত্র তুলে ধরে ফারিবা জানান, আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় ফারিয়াব প্রদেশে সাইকেল চালানোর সময় তাকে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়া হতো। অনেকে বোতলও ছুড়ে মারত। এমনকি তার বাবা তাকে সতর্ক করেছিলেন, সাইক্লিং করতে গিয়ে তিনি নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছেন।
ফারিবা বলেন, ‘কখনো কখনো আমার মাথায় বড় পাথর ছোড়া হয়েছে। মানুষ আমাদের লক্ষ্য করে বোতল ছুড়ত। তারা আক্রমণ করে আমাদের বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য করার চেষ্টা করত।’
তবে এত কিছুর পরও নিজের দেশের মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা রয়েছে বলে জানান ফারিবা। তিনি বলেন, ‘আমার সময়টা খুব খারাপ গেছে। কিন্তু আমি বলছি না যে আমার দেশের মানুষ খারাপ। আমাদের দেশ অনেক সুন্দর। তবে মানুষের মানসিকতা ভিন্ন।’
পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে একপর্যায়ে ছেলের ছদ্মবেশে সাইক্লিং অনুশীলন শুরু করেন তিনি।
ফারিবা বলেন, ‘প্রশিক্ষণে যাওয়ার সময় আমি সবসময় পুরুষের পোশাক পরতাম। মানুষ যেন আমাকে চিনতে না পারে বা আক্রমণ না করে, সে জন্য দুই-তিন ধরনের মুখোশও ব্যবহার করতাম।’
তার ভাষায়, তালেবান তাদের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার স্বপ্ন পূরণের জন্য আমি দেশ ছেড়েছি। মানুষের ছোড়া পাথর থেকে বাঁচতেও আমি দেশ ছেড়েছি।’
ছয় বছর ধরে পরিবারের কাছ থেকে দূরে :
বর্তমানে ইতালিতে বসবাস করছেন ফারিবা। বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিযোগিতার জন্য সেখানেই নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন তিনি। সাবেক বিশ্ব সাইক্লিং চ্যাম্পিয়ন আলেসান্দ্রা ক্যাপেল্লোত্তোর সহায়তায় আফগানিস্তান থেকে বের হয়ে ইতালিতে নতুন জীবন শুরু করার সুযোগ পান ফারিবা।
তবে নিজের দেশ ও পরিবারের কথা এখনো মনে পড়ে তার। রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘আমি আমার দেশে থাকতে পারি না, এটা খুবই কষ্টের। অনেক দিন ধরে আমি আমার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে পারিনি।’
ভবিষ্যতে আফগানিস্তানে ফিরে কিছু পরিবর্তন আনার স্বপ্নও দেখেন তিনি। ফারিবা বলেন, ‘ভবিষ্যতে আমি আমার দেশের কিছু বিষয় পরিবর্তন করতে চাই। দেশে ফিরে নিজের মানুষদের অনুপ্রাণিত করাই আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।’
১৫ বছর বয়সে সাইক্লিং শুরু :
১৫ বছর বয়সে সাইক্লিংয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় ফারিবার। তার বড় বোন ইউলদুজ তখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন। বোনের অনুপ্রেরণায় ফারিবাও সাইক্লিং শুরু করেন।
সাইক্লিং সম্পর্কে ফারিবা বলেন, ‘আমি মনে করতাম, আমি যেন এমন একটি পাখি, যে উড়তে পারে।’
পরে দুই বোন একসঙ্গে সাইক্লিংয়ে আফগানিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করতে শুরু করেন। তারা বিশ্বের বিভিন্ন বড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন এবং আফগান নারীদের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
দুই বোন দুই বছর আগে প্যারিস অলিম্পিকেও অংশ নেন। ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকেও অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
ফারিবা বলেন, ‘আমি কখনো হাল ছাড়তে চাই না।’
সূত্র : ইনফোমাইগ্রেন্টস