ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির রামলীলা ময়দানে সমাবেশ করেছে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’। রোববার (২ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচিতে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গে, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবসহ বিরোধী শিবিরের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন।
সমাবেশে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিরোধী নেতারা। তাঁদের বক্তব্যে সংবিধান, গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
রাহুল গান্ধী বলেন, কেউ যত ক্ষমতাশালী বা ধনী হোন না কেন, সংবিধানের ঊর্ধ্বে নন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনসহ বিভিন্ন নির্বাচনে ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে পদ থেকে সরানো এবং তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি। রাহুলের বক্তব্য, জ্ঞানেশ কুমারকে পদ থেকে সরানোর পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপের প্রশ্ন উঠবে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচন কমিশন ও বিজেপির বিরুদ্ধে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করার অভিযোগ তোলেন। পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে জ্ঞানেশ কুমারকে ‘ভ্যানিশ কুমার’ বলে কটাক্ষ করেন তিনি। মমতার দাবি, এই আন্দোলন কোনো দলের ক্ষমতা দখলের লড়াই নয়; বরং সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার রক্ষার উদ্যোগ। গণতন্ত্র রক্ষায় তরুণদেরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
সমাবেশে মল্লিকার্জুন খাড়্গে, অখিলেশ যাদব, তেজস্বী যাদবসহ অন্য বিরোধী নেতারাও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ২১টি বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে কর্মসূচিটি বৃহত্তর বিরোধী মঞ্চের রূপ পায়।
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য হলো, ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্দেশ্য যোগ্য ভোটারদের নাম নিশ্চিত করা এবং ভুয়া, মৃত কিংবা একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত নাম বাদ দেওয়া।
আন্দোলনে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলোর ভূমিকাও আলোচনায় এসেছে। জ্ঞানেশ কুমার ও বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে দিল্লিতে প্রথম দিকের যুব আন্দোলনগুলোর অন্যতম মুখ ছিল ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপক ৩১ অক্টোবর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। মমতা তরুণ আন্দোলনকারীদের ভূমিকার প্রশংসা করেন এবং তাঁদের আন্দোলনের পাশে থাকার বার্তা দেন।
তবে রামলীলা ময়দানের সমাবেশে অংশ নেয়নি সিজেপি। অভিজিৎ দীপক জানান, তাঁদের সংগঠন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মঞ্চ হিসেবে কাজ করে। কোনো রাজনৈতিক জোটের অংশ না হয়েও ভোট চুরির অভিযোগের বিরুদ্ধে যেকোনো সংগঠনের আন্দোলনকে তাঁরা সমর্থন করবেন।
অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নেত্রী নেহা বোরাও এর আগে আন্দোলনে সমর্থন জানিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, এসআইআর বন্ধ এবং সংশ্লিষ্ট আইন প্রত্যাহারের দাবিতে বৃহত্তর গণআন্দোলন প্রয়োজন।
সমাবেশ ঘিরে দিল্লির ব্যবসায়িক ক্ষতির বিষয়টিও সামনে এসেছে। চেম্বার অব ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির চেয়ারম্যান ব্রিজেশ গোয়েলের দাবি, কর্মসূচির কারণে দিল্লির ২০ থেকে ২৫টি বড় বাজারের প্রায় আড়াই লাখ দোকান বন্ধ ছিল। তাঁর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, খুচরা ও পাইকারি ব্যবসা, পরিবহণ ও পর্যটনসহ বিভিন্ন খাতে ক্ষতির পরিমাণ ১০ থেকে ১১ হাজার কোটি টাকা। তবে এটি ব্যবসায়ী সংগঠনটির নিজস্ব হিসাব; ক্ষতির পরিমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
রাহুল গান্ধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের স্থানীয় বাজার থেকে কেনাকাটা করার আহ্বান জানান। অন্যদিকে, বিজেপিও সমাবেশের সময় ও উদ্দেশ্য নিয়ে বিরোধীদের সমালোচনা করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সমাবেশটির তাৎপর্য শুধু জনসমাগমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বিরোধী দলগুলো একটি অভিন্ন ইস্যুতে কতটা ঐক্যবদ্ধ হতে পারে, সেটিও ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রবীণ সাংবাদিক ভূপেন্দ্র চৌবে এনডিটিভির আলোচনায় বলেন, জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর দাবির চেয়েও বিরোধী ঐক্য জোরদারের প্রচেষ্টা এ সমাবেশের বড় তাৎপর্য।
তবে এক দিনের সমাবেশে তৈরি হওয়া ঐক্যকে স্থায়ী নির্বাচনী সমঝোতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। রাজ্যভিত্তিক আসন সমঝোতা, নেতৃত্বের প্রশ্ন এবং দলগুলোর নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থ বিরোধী জোটের সামনে এখনো চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।
বিজেপির মুখপাত্র সম্বিত পাত্র সমাবেশকে ‘বিশৃঙ্খল রাজনৈতিক প্রদর্শনী’ বলে কটাক্ষ করেছেন। ফলে একই কর্মসূচিকে ঘিরে সরকারপক্ষ ও বিরোধীদের বক্তব্যে রাজনৈতিক বিভাজন স্পষ্ট হয়েছে।
সব মিলিয়ে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, ভোটাধিকার, কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা এবং বিরোধী ঐক্য নিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নিয়েছে। আগামী দিনে এ ইস্যুতে বিরোধী দলগুলোর অবস্থান ও কর্মসূচি কোন দিকে এগোয়, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।