যুক্তরাজ্যের প্রথম হিজাব পরিহিতা বিচারক হলেন ব্যারিস্টার রাফিয়া আরশাদ

যুক্তরাজ্যে প্রথম হিজাব পরিহিত ডেপুটি ডিস্ট্রিক্ট জজ হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মুসলিম নারী রাফিয়া আরশাদ। ১৭ বছর আইন পেশায় কাজ করার অভিজ্ঞতার পর গত সপ্তাহে মিডল্যান্ডস সার্কিটে তাঁকে এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।

রাফিয়া বলেন, তাঁর এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং সব নারীর জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মুসলিম নারীদের জন্য এটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

সম্প্রতি সংবাদমাধ্যম মেট্রোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি জানি, বিষয়টি শুধু আমাকে ঘিরে নয়। এটি সব নারীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তবে মুসলিম নারীদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।’

নিজের কর্মজীবনের শুরুর দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি জানান, ছোটবেলায় তাঁর মনে আশঙ্কা ছিল, নিম্নবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা এবং সংখ্যালঘু জাতিগত পরিচয়ের কারণে আইন পেশায় তাঁকে সহজে গ্রহণ করা হবে না।

নতুন এই বিচারক বলেন, নিজের অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে তিনি আইন পেশায় বৈচিত্র্য ও সমান সুযোগের বিষয়টি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে চান। তাঁর ভাষায়, ‘বৈচিত্র্যের কণ্ঠস্বর যেন স্পষ্টভাবে শোনা যায়, তা নিশ্চিত করতে চাই।’

নিয়োগ পাওয়ার পর মানুষের কাছ থেকে পাওয়া ইতিবাচক সাড়া তাঁকে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত করেছে বলে জানান রাফিয়া। তিনি বলেন, অনেক নারী তাঁকে ইমেইল করে জানিয়েছেন, হিজাব পরার কারণে তাঁরা কখনো ভাবতেই পারেননি যে ব্যারিস্টার হতে পারবেন, বিচারক হওয়া তো দূরের কথা।

লন্ডনে প্রশিক্ষণ শেষে ২০০২ সালে আইন পেশায় আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হন রাফিয়া। ২০০৪ সালে তিনি সেন্ট মেরিজ ফ্যামিলি ল চেম্বার্সে যোগ দেন। কর্মজীবনে শিশুদের অভিভাবকত্ব ও পারিবারিক বিরোধ, জোরপূর্বক বিয়ে, নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণ এবং ইসলামি আইনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মামলায় কাজ করেছেন তিনি।

তবে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও কর্মক্ষেত্রে এখনো বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয় বলে জানান রাফিয়া। তিনি বলেন, আদালতে অনেক সময় তাঁকে আইনজীবীর পরিবর্তে মামলার পক্ষভুক্ত ব্যক্তি কিংবা দোভাষী বলে ভুল করা হয়। সম্প্রতি আদালতের একজন কর্মচারীও তাঁকে এভাবে ভুল করেছিলেন।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি এমনটি বলেছেন, তাঁর প্রতি আমার কোনো বিরূপ মনোভাব নেই। তবে ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, সমাজে এখনো এমন ধারণা রয়েছে যে উচ্চপর্যায়ের পেশাজীবীদের চেহারা আমার মতো হতে পারে না।’

নারীদের পেশাগত জীবনে এগিয়ে যাওয়ার পথে আত্মবিশ্বাসের অভাবও একটি বড় বাধা বলে মনে করেন তিনি। রাফিয়া বলেন, অনেক সময় আদালতে দাঁড়িয়েও তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে, তিনি আদৌ এই কাজের যোগ্য কি না।

নিজের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কথা তুলে ধরে রাফিয়া জানান, ২০০১ সালে ইনস অব কোর্ট স্কুল অব ল-এ বৃত্তির সাক্ষাৎকার দিতে যাওয়ার আগে পরিবারের এক সদস্য তাঁকে হিজাব না পরার পরামর্শ দিয়েছিলেন। ওই সদস্যের আশঙ্কা ছিল, হিজাব পরলে বৃত্তি পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যাবে।

কিন্তু সেই পরামর্শ উপেক্ষা করে হিজাব পরেই সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। রাফিয়া বলেন, ‘আমি হিজাব পরেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কারণ, মানুষকে তার নিজস্ব পরিচয়সহ গ্রহণ করা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। পেশাগত জীবনে এগিয়ে যেতে যদি আমাকে অন্য মানুষ হতে হতো, তাহলে সেটি আমি চাইতাম না।’

পরবর্তী সময়ে ব্যারিস্টার হিসেবে সফলতা অর্জনের পাশাপাশি ইসলামি পারিবারিক আইনবিষয়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থও লিখেছেন তিনি।

রাফিয়ার নিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছে সেন্ট মেরিজ ফ্যামিলি ল চেম্বার্সের প্রধানরা। ভিকি হজেস ও জুডি ক্ল্যাক্সটন বলেন, আইন পেশায় মুসলিম নারীদের এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি এবং সমতা ও বৈচিত্র্য প্রতিষ্ঠায় রাফিয়া দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছেন। যোগ্যতার ভিত্তিতেই তিনি এই নিয়োগ পেয়েছেন এবং তাঁর জন্য প্রতিষ্ঠানটি গর্বিত।

রাফিয়া বলেন, বিচার বিভাগে অন্তর্ভুক্তি ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়া হলেও পেশাগত ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যের পক্ষে কথা বলার দায়িত্ব তিনি নিজেও অনুভব করেন।

তিনি বলেন, ‘এখন তাঁদের হয়ে কণ্ঠস্বর তুলে ধরার দায়িত্ব আমার। বৈচিত্র্যের কথা যেন স্পষ্টভাবে শোনা যায় এবং যথাযথ জায়গায় পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে চাই।’

সূত্র : দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট, দ্য ন্যাশনাল

Home R3