১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে আট বিভাগে সর্বাত্মক অবরোধের ডাক

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে এবার সারাদেশে অবরোধের ডাক দিয়েছে ইনকিলাব মঞ্চ।

শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) রাত সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর শাহবাগে বিক্ষোভ কর্মসূচি থেকে আট বিভাগীয় শহরে অবরোধ কর্মসূচির ঘোষণা দেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের।

তিনি জানান, আজ রোববার বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দেশের আট বিভাগে এই কর্মসূচি পালিত হবে। এদিকে শাহবাগে ৩৪ ঘণ্টা অবরোধের পর রাতে শাহবাগে ইনকিলাব মঞ্চের কর্মসূচিতে হাজির হয়ে হাদি হত্যার বিচার দ্রুত শুরু করার আশ্বাস দিয়েছেন তথ্য উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।

তিনি বলেন, ‘ভারত থেকে আসামি ফেরত এনে দ্রুত মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। চার্জশিট থেকে রায়– সব ধাপেই দ্রুত অগ্রগতি নিশ্চিত করা হবে। দেশের মানুষ ন্যায়বিচার পাবে– এ ব্যাপারে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ।’

গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর থেকে হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে শাহবাগে অবস্থান শুরু করে ইনকিলাব মঞ্চ। পরে সারারাত তারা সেখানে অবস্থান করে। গতকাল শনিবার বেলা ১১টার দিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান হাদির কবর জিয়ারত করতে এলে দুপুর ১২টা পর্যন্ত শাহবাগ মোড় ছেড়ে আজিজ সুপারমার্কেটের সামনে অবস্থান নেন তারা। এরপর আবার শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নিয়ে বিচার না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন আব্দুল্লাহ আল জাবের।

শাহবাগে উপদেষ্টা রিজওয়ানা বলেন, ‘হাদির হত্যায় জড়িতদের সবাইকে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তদন্তের চূড়ান্ত ধাপ প্রায় শেষের পথে। সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করে ৭ জানুয়ারির পর দ্রুত নির্ভুল ও শক্ত প্রমাণভিত্তিক অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি চার্জশিট দিতে চাই, যাতে কোথাও কোনো ফাঁকফোকর না থাকে। তদন্ত, ফরেনসিক পরীক্ষা ও প্রমাণ যাচাই শেষ করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হবে। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই দ্রুত বিচার নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।’

এ সময় উপদেষ্টা জানান, হত্যাকাণ্ডের কিছু আসামি দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে। তবে তাদের বিচার এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না। এ বিষয়ে ভারত সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক পর্যায়ে কথা হয়েছে। ভারত আশ্বাস দিয়েছে, বাংলাদেশের অনুরোধে আসামিদের খুঁজে পাওয়া গেলে তাদের ফেরত পাঠাতে সহযোগিতা করবে।

রিজওয়ানা বলেন, ‘পালিয়ে গেলেই দায়মুক্তি নয়। প্রয়োজনে অনুপস্থিতিতেও বিচার প্রক্রিয়া এগোবে। একই সঙ্গে যারা ভারতে আশ্রয় নিয়েছে বলে ধারণা, তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতের সামনে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছি।’

তদন্ত-সংক্রান্ত তথ্য আপাতত প্রকাশ না করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা শত্রুপক্ষের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কাজ করছি। তাই তদন্তের স্বার্থে কিছু বিষয় এখন বলা যাচ্ছে না। তবে ডিবি পুলিশ ২৮ ডিসেম্বর সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে সংবাদ সম্মেলনে আরও বিস্তারিত জানাবে।’

শহীদ হাদির পরিবারের সঙ্গে সরকারের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে জানিয়ে উপদেষ্টা রিজওয়ানা বলেন, ‘এই নৃশংস হত্যার বিচার আমরা বিলম্বিত করতে চাই না। চার্জশিট থেকে রায়– সব ধাপেই দ্রুত অগ্রগতি নিশ্চিত করা হবে। দেশের মানুষ ন্যায়বিচার পাবে– এ ব্যাপারে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ।’

এর আগে রাত পৌনে ৮টার দিকে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বলেন, ‘ওসমান হাদি যে লড়াইটা শুরু করেছিলেন, সেটা সাংস্কৃতিক লড়াই। আমরা বাংলাদেশপন্থি সব সাংস্কৃতিক সংগঠনকে জাসাস (জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা), সাইমুম, সসাস (সমন্বিত সাংস্কৃতিক সংসদ), কলরবসহ প্রতিটি সংগঠনকে আমরা আহ্বান জানাই– আমাদের এই লড়াইয়ে আপনারা এসে সমবেত হোন।’

জাবের বলেন, ‘আমরা প্রশাসনকে জানিয়েছি, রাতে প্রয়োজনে আপনারা চারপাশে কড়া পাহারার ব্যবস্থা করেন। এখানে কে কী উদ্দেশ্য নিয়ে আসছে, আমরা জানি না। গতকাল আমরা দেখেছি, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখানে ছিল না। শাহবাগ থানা এখানে। কেউ এসে যদি কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে, এর জন্য আপনারাও দায়ী থাকবেন।’

জাবের বলেন, ‘আপনারা দায়িত্ব পালন করবেন, আমরা আমাদের জায়গা থেকে আপনাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব। কিন্তু আপনারা যদি শুধু থানায় বসে থাকেন এবং এখানে যদি কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়, এর দায় আপনারা এড়াতে পারবেন না।’

অবরোধ না তোলার বিষয়ে বলেন, ‘এখানে ড. ইউনূসও যদি আসেন এবং আমাদের অবরোধ তুলে নিতে বলেন, আমরা অবরোধ তুলব না। অবরোধ অবরোধের মতো থাকবে, আমাদের লড়াই চলছে, আমাদের লড়াই চলবে। আমরা শুধু শুনব তারা কী বলতে চায়, সিদ্ধান্ত তো আমরা নেব।’

গতকাল শনিবারও রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ হয়। ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীর পাশাপাশি নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এই কর্মসূচিতে অংশ দেন। এদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে একই দাবিতে নানা কর্মসূচি পালিত হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল সকালে ওসমান হাদির কবর জিয়ারত করতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আগমন ও নিরাপত্তাজনিত কারণে শাহবাগ মোড় থেকে সরে আজিজ সুপারমার্কেটের সামনে অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তারা ফের শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন। আন্দোলনকারীদের স্লোগানে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে।

ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শুক্রবার জুমার নামাজের পর থেকেই ওসমান হাদি হত্যার বিচার নিশ্চিতের দাবিতে তারা ‘অনির্দিষ্টকালের জন্য’ এই কর্মসূচি শুরু করবেন। শুক্রবার সারারাত তারা শাহবাগ মোড়েই অবস্থান করেন। আন্দোলনের মুখে শাহবাগ এলাকায় ব্যাপক পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।