আবু নাঈম মু শহীদুল্লাহ
বর্তমান যুগ হলো অবাধ তথ্য প্রবাহের যুগ, যাকে বলা হয় GLOBAL VILLAGE বা বিশ্বগ্রাম । পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা পাওয়া যায় সেকেন্ডের মধ্যে। প্রযুক্তির মাধ্যমে আজকের পৃথিবীর অনেক কিছুই খুব সহজে পাওয়া যায়। কঠিন কাজটিও রিমোট কন্ট্রোলের সুইচ টিপে করা হয়, ক্ষেত্র বিশেষ ভয়েসেরও ব্যবহার হচ্ছে। যা এক সময় মানুষের চিন্তার বাহিরে ছিল। তথ্য প্রযুক্তির এ যুগে পৃথিবীর এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশের যে কোন খবর পাওয়া যায় ইলেকট্রনিক্স ,প্রিন্ট ও সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে। হাজার কোটি মানুষের পৃথিবীতে ৯৫ শতাংশ মানুষ এখন আর চিঠি লিখে বার্তা পাঠায়না । প্রচার মাধ্যম গুলোর মধ্যে প্রিন্ট মিডিয়ার সংখ্যা কমে মানুষ ঝুকছে সোশাল মিডিয়ার দিকে।
যখন থেকে মানুষ ইলেকট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়ার থেকে সোশাল মিডিয়ার দিকে নজর দিয়েছে তখন থেকে তথ্য বা সংবাদের উপর মানুষের আস্থা কমেছে (এটা আমার ব্যক্তিগত মত) এর মুল কারণ হলো, সোশাল মিডিয়াগুলোতে যে কেউ নিজের মত প্রকাশ করতে পারতেছে এটা ভাল দিক কিন্তু তথ্য বা সংবাদের মান নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। আমাদের অনেকে এটার দ্বিমত পোষণ করেন, কারণ তাদের মতে সোশাল মিডিয়ার নিউজকে ওনারা নিউজ মনে করেন না। আমার লেখাটা সংবাদ সংগ্রহক ও প্রকাশকদের নিয়ে ।
সাংবাদিকতা :
সাংবাদিকতা হলো চলন্ত জীবনের শব্দময় প্রতিচ্ছবির নাম। সাংবাদিকগণ এই প্রতিচ্ছবিকে আপন হৃদয়ে ধাারণ করে সর্বসাধারণের কাছে তুলে ধরেন বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ,ইতিহাস ঐতিহ্য ,জীবন সমাজ ও রাষ্ট্রের গতি- প্রকৃতি বর্ণনা,প্রবাসে দেশেকে রিপ্রেজেন্ট করার,একটি কৌশল,চিন্তার পরিবর্তন,ধ্যান-ধারণা বিবর্তন, সমাজপরিবর্তন কিংবা সাংস্কৃতিক রূপান্তরের ধারক-বাহক হলেন সাংবাদিক।
সাংবাদিক শুধু ইতিহাস নির্মাণ করে না-ইতিহাস নির্মাণের সাহায্য করে। সাংবাদিকতা মানুষের জীবন আচরণের এক নিত্যসঙ্গী। এক মহৎ ও সম্মানজনক চ্যালেঞ্জিং পেশার নাম। কঠোর পরিশ্রম ,জীবনের ঝুঁকি স্বল্প আয়ের আদর্শিক পেশার নাম সাংবাদিকতা। পৃথিবীতে বহু পরিশ্রমী ও দুঃসাহসিক মানুষ রয়েছে তারা তাদের পরিশ্রম ও সাহস কাজে লাগিয়ে অর্থ উর্পজনে ব্যস্ত থাকে। শুধু মাত্র সাংবাদিকগন তাদের পরিশ্রম ,সাহসিকতা ও ঝুঁকির বিনিময়ে পারিশ্রমিক চান না অথবা পান না। সাংবাদিকগণ দেশে,সমাজ ও কমিউনিটির কল্যাণে নিবেদিত প্রাণ তারা কাজ করে যায় নিরলসভাবে ।
প্রকৃত সাংবাদিকদের সাংবাদিকতা একটি মহাপবিত্র স্বাস্থ্যসচেতন বিভাগের দায়িত্ব বলা হয়ে থাকে। জ্ঞানীর কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়েও পবিত্র। আর এ কলমের কালির প্রতি দুর্বলতা রয়েছে গণমানুষের। তাই গণমানুষের প্রতি সাংবাদিকদের রয়েছে গুরু দায়িত্ব ।
সংবাদ মাধ্যম :
যতটুকু তথ্য পাওয়া যায় ১৬০৫ সালে প্রথম সংবাদ পত্র প্রকাশিত হয় স্ট্রাসবর্গ থেকে যার নাম ছিলো রিলেশন অলার ফুর্নেমেন উন্ড গেডেনকভর্ডিগেন হিস্টরিয়েন । আর ইংরেজি দৈনিক হিসাবে ১৭০২-১৭৩৫ সাল পর্যন্ত ডেইলি ক্যুরান্ট নামে প্রকাশিত হয়েছিল ।তবে ১৯৫০ এর দশকে দিয়ারিও কারিওকা সংবাদপত্রের সংস্কার রূপকে ব্রাজিলে আধুনিক সাংবাদিকতার জন্ম বলে চিহ্নিত করা হয়। প্রথম বাংলা পত্রিকা প্রকাশিত হয় ১৯৩১ সালে সংবাদ প্রভাকর নামে যার মালিক ছিলেন ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্ত ।প্রথমে সাপ্তাহিক ৮ বছর পর দৈনিক পত্রিকায় রুপান্তরিত হয়। ব্রিটিশ ভারত ও বিদেশের সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি এই সংবাদপত্র ধর্ম, রাজনীতি, সমাজও সাহিত্য সম্পর্কে নিজস্ব মতামত প্রকাশ করত৷ বাংলার নবজাগরণ ও নীল বিদ্রোহের প্রতি মানুষকে সহানুভূতিশীল করে তোলার ক্ষেত্রে এই সংবাদপত্রের বিশেষ প্রভাব ছিল৷ ১৯৫৩ সালে ইত্তেফাক ,সাপ্তাহিক সোনার বাংলা ছাড়াও বেশ কিছু পত্রিকা প্রকাশ হত ।তবে স্বাধীন বাংলার প্রথম পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল আজাদী ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে।
সংবাদ প্রচারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া যেমন টেলিভিশন , বেতার বা রেডিও ,টেলিযোগাযোগ ।এ সকল মাধ্যম গুলো প্রযুক্তির আধুনিকতার পাশাপাশি অনেক উন্নতি হয়েছে।
তবে সর্ব প্রথম টেলিভিশনে প্রচার শুরু হয় ১৮৬২ সালে তারের মাধ্যমে প্রথম স্থির ছবি পাঠানোর মাধ্যমে। এরপর ১৮৭৩ সালে বিজ্ঞানী মে ও স্মিথ ইলেকট্রনিক সিগনালের মাধ্যমে ছবি পাঠানোর পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। ব্রিটিশবিজ্ঞানী জন লগি বেয়ার্ড ১৯২৬ সালে প্রথম টেলিভিশন আবিষ্কার করেন এবং সাদা কালো ছবি দূরে বৈদ্যুতিক সম্প্রচারে পাঠাতে সক্ষম হন। এর পর রুশ বংশোদ্ভুত প্রকৌশলী আইজাক শোয়েনবারগের কৃতিত্বে ১৯৩৬ সালে প্রথম টিভি সম্প্রচার শুরু করে বিবিসি। টেলিভিশন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চালু হয় ১৯৪০ সালে।
তবে পূর্নতা লাভ করে ১৯৪৫ সালে। বিশ্বযুদ্ধের পর টেলিভিশন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সূচিত হয়। গত শতাব্দীর ৫০ এর দশকে টেলিভিশন গনমাধ্যমের ভূমিকায় উঠে আসে।
রেডিও বা বেতার তরঙ্গের অস্তিত্ব প্রথম প্রমাণ করেছিলেন জার্মান পদার্থবিদ হেনরিখ হার্টজ ১১ নভেম্বর, ১৮৮৬ সালে । ১৮৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে, পদার্থবিজ্ঞানীরা তড়িৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গ অধ্যয়ন করার জন্য যে কৌশলগুলি ব্যবহার করছিলেন তার উপর ভিত্তি করে, গুগলিয়েলমো মার্কনি দূর-দূরত্বের রেডিও যোগাযোগের জন্য প্রথম যন্ত্র তৈরি করেছিলেন,১৮৯৫ সালে যা এক কিলোমিটার দূরের একটি উৎসে বেতার মোর্স কোড বার্তা পাঠাতে সক্ষম এবং এটি ছিল ১২ ডিসেম্বর, ১৯০১-এর প্রথম ট্রান্সআটলান্টিক সংকেত। প্রথম বাণিজ্যিক রেডিও সম্প্রচার করা হয়েছিল ২ নভেম্বর, ১৯২০ সালে ।
টেলিযোগাযোগ:
খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দে মেসোপটেমিয়ায় টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল ইউফ্রেটিস নদীর তীরে মালির আক্কাদিয়ান নগরীতে আলোক সংকেতের মাধ্যমে সংবাদ প্রেরণ করা হতো ১৭৫৪ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসি পদার্থবিদ জাঁ-আন্তোয়িন নুলে বৈদ্যুতিক ট্রান্সমিশন উদ্ভাবন করেন।১৭৯২ সালে ক্লদ শাপে (Claude Chappe) নামে একজন ফরাসি প্রকৌশলী প্রথম দৃশ্যমান টেলিগ্রাফ যন্ত্র তৈরি করেন যা লিল ও প্যারিস এর মাঝে সংযোগ স্থাপন করে। এ ক্ষেত্রে সেমাফোর পদ্ধতি ব্যবহৃত হত। সেমাফোর পদ্ধতিতে দুটি পতাকার বিভিন্ন অবস্থানের মাধ্যমে বিভিন্ন বর্ণ নির্দেশ করে সংকেত পাঠানো হয়। লিল থেকে প্যারিস পর্যন্ত স্থাপিত প্রথম সংযোগটি পরে স্ট্রাসবার্গ পর্যন্ত বর্ধিত হয়।
এ সকল যোগাযোগ ও সংবাদ মাধ্যম গুলোর দেখানো পথনির্দেশিকায় আধুনিক মিডিয়া গুলো তাদের যাত্রা শুরু করেছিল প্রশস্ত রাস্তা ধরে । আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে হাতের নাগালে ও চোখের সামনে পাওয়া মানুষগুলোর কাছে টেলিযোগাযোগ ,রেডিও,টেলিভিশন ,পত্রিকা অনেকটা অপরিচিত হতে চলছে।
সাংবাদিকদের কাজ ও গুনাবলী ঃ সংবাদ সংগ্রহ করা ,সংবাদের সত্যতা যাচাই করা ,সংবাদ সম্পাদনা করা, সাক্ষাৎকার নেওয়া , বিশেষ প্রতিবেদন তৈরী করা, কলম লেখা ও বাছাই করা, তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষন করা , প্রয়োজনীয় ছবি সংগ্রহ করা ।
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ-ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কারটিস ডি ম্যাভোগাম বলেছেন, ২০ টি গুণের অধিকারী হলে একজন সাংবাদিককে যোগ্য সাংবাদিক হিসাবে স্বীকার করা যাবে।
১। বুদ্ধিমত্তা থাকতে হবে
২। তাকে হতে হবে বন্ধুত্বভাবাপন্ন। বিকৃত মেজাজের লোক এ পেশায় অযোগ্য।
৩। যথেষ্ট সাহসের অধিকিারী হতে হবে। সাহস দিয়েই সকল প্রতিকূলতাকে মোকাবেলা করতে হবে।
৪। তার উদ্ভাবনী শক্তি থাকতে হবে।
৫। তার প্রচুর সাংগঠনিক শক্তি থাকতে হবে। ব্যক্তিজীবনে তিনি একজন সুসংগঠিত মানুষ।
৬। প্রচুর ধৈর্য্যশীল হতে হবে। যেকোন ব্যর্থতাকে অসীম ধৈর্য্য ও সাধনার মাধ্যমে সফলতা আনতে হবে।
৭। অত্যন্ত সৎ হতে হবে। কারন সাংবাদিকতা পেশাটা অনেক বড় প্রলোভনের। নিজ কর্তব্যে বলিয়ান হয়ে সকল লোভ লালসা পরিহার করতে হবে।
৮। পর্যাপ্ত কল্পনা শক্তি থাকতে হবে। তবে সবসময় কল্পনার রাজ্যে ডুবে থাকতে হবে এমনটি নয়।
৯। নানারুপ প্রতিকুল পরিবেশ পরিস্থিতি যেমন,যুদ্ধ, দাঙ্গা,অফিসের প্রতিকুল পরিবেশে কাজ করার জন্য তার প্রবল স্নায়ু শক্তি থাকতে হবে।
১০। যথেষ্ট কাজের গতি থাকতে হবে। নিদৃষ্ট সময়ের মধ্যে কপি শেষ করতে হবে, এবং তা হতে হবে নির্ভূল।
১১। একজন সাংবাদিক কে হতে হবে নিয়মানুবর্তী। কারন নিদৃষ্ট সময়ে উপস্থিত হতে না পারলে সে মিস করতে পারে অনেক কিছুই।
১২। একজন সাংবাদিক হবেন পর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার অধিকারী। ভাল-মন্দ উভয় দিক পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা থাকতে হবে।
১৩। তিনি এমন ব্যক্তিত্বের অধিকার হবেন যাতে সবাই তাকে গ্রহন করেন।
১৪। বিভিন্ন পরিবেশ, পরিস্থিতি ও লোকের সঙ্গে মানিয়ে চলার ক্ষমতা থাকতে হবে।
১৫। উচুঁ মাপের রসবোধ একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিত্ব কে আরো ফুটিয়ে তোলে। তাই কখনো কখনো একজন সাংবাদিক উচুঁ মাপের রসিকও হবেন।
১৬। যেকোন গঠন মূলক কাজে উদ্যোগী হতে হবে। অর্থ্যাৎ উদ্যোগ গ্রহন করার প্রবনতা তার মাঝে থাকতে হবে।
১৭। তিনি হবেন সহনশীল। কাজের চাপে অনেক সময় আহার নিদ্রা সময়মত নাও হতে পারে।এসকল প্রতিকুলতা সহ্য করার মানসিকতা থাকতে হবে।
১৮। তিনি হবেন সরল ব্যক্তিত্ব। সময় সময় হাসিমুখে থাকাটা ও একটি গুন। একজন সাংবাদিক কখনো জীবন বিমুখ নয়, তিনি হবেন জীবন দরদী।
১৯। মানসিকভাবে সতর্ক থাকতে হবে। যেকোন সময় যেকোন সাধারন ঘটনা অমূল্য সংবাদে পরিনত হতে পারে।
২০। সাংবাদিক কে হতে হবে কুটবুদ্ধি সম্পন্ন। কোন কোন জটিল বিষয়ের সমাধান কুটবুদ্ধি ছাড়া সম্ভব নয়। এজন্য বলা হয় সাংবাদিকতা ও গোয়েন্দাগিরি মধ্যে একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।
এছাড়াও একজন সাংবাদিক হবেন নিরপেক্ষ মানসিকতা সম্পন্ন। তার থাকবে প্রখর স্মৃতি শক্তি, উত্তম রুচির অধিকারী, সৎ ও একনিষ্ঠ কর্মী। কোন লোভের বশবর্তী হয়ে ভূল তথ্য প্রদান তার পেশা ও নৈতিকতার উপর চরম আঘাত হানে।
সাংবাদিক ও সংবাদ মাধ্যমের দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা :
সংবাদপত্র বা সংবাদ মাধ্যম হলো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে চতুর্থ স্তম্ভ। রাষ্ট্রের কোন স্তম্ভই পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং পরিপূরক। বলা সমীচীন সংবাদপত্রকে প্রতিটি সূর্যোদয়েই পাঠক তথা দেশের নাগরিকদের সমীপে উপস্থিত হতে হয়; প্রতিদিনই তাকে সত্যবাদিতা ও ন্যায়নিষ্ঠার পরীক্ষা দিতে হয়।আর সংবাদ মাধ্যম টেলিভিশন ও রেডিও প্রতি ঘন্টায় সততা আর জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হয় । তার সম্পাদকীয় নীতি স্বচ্ছ, ইতিবাচক, গণমুখী ও দায়িত্বশীল হবে- এটাই সবাই প্রত্যাশা করে । গণমানুষের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান, অসত্য সংবাদ বর্জন , দেশ ও জাতির কল্যাণে সব সময়ে নিজেদের সমর্পণ করে সত্য সংবাদ তুলে ধরা সাংবাদিকদের মুল দায়িত্ব ।
লেখক : বাংলাদেশ মানবাধিকার কাউন্সিলের স্থায়ী সদস্য