১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

মতামত
সম্পাদকীয়

বিজয় দিবস : ঈমান, দেশপ্রেম এবং ন্যায়–ইনসাফের রাষ্ট্র নির্মাণ

বিজয় দিবস : ঈমান, দেশপ্রেম এবং ন্যায়–ইনসাফের রাষ্ট্র নির্মাণ

১৬ ডিসেম্বর-বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে এক অলৌকিক দিন, এক নবজন্মের মুহূর্ত, এক জাতির পুনরুত্থানের চিহ্ন। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান, লক্ষ প্রাণের আত্মদান, কোটি মানুষের আহাজারি, অগণিত শহীদের অশ্রু ও রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ এই দিনে পেয়েছিল কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। তাই এদিনের আনন্দ নিছক উৎসব নয়; এদিন কৃতজ্ঞতা, স্মরণ, আত্মপরিশুদ্ধি এবং আল্লাহর মহত্ত্ব ঘোষণার দিন। ইসলাম বিজয়কে যেমন আল্লাহর অনুগ্রহ মনে করে, তেমনই এই বিজয়ের উপলক্ষকে মুমিনের জন্য তাসবিহ, শুকরিয়া ও ক্ষমা প্রার্থনার সময় হিসেবে বর্ণনা করে।

বাংলাদেশের বিজয় দিবস তাই কেবল রাজনৈতিক নয়; এটি একটি গভীর ধর্মীয়-আধ্যাত্মিক তাৎপর্যপূর্ণ দিনও। জাতির প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ-এটাই এই দিনের মূল বার্তা।

ইসলামে বিজয়ের চেতনা ও দেশপ্রেমের প্রেরণা :

ইসলাম দেশপ্রেমকে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত ঘোষণা করেছে। নবীজি সাঃ বলেছেন-হুব্বুল ওয়াতান মিনাল ঈমান-দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ।

এই হাদিস মুসলমানের দেশপ্রেমকে এক ইবাদত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। দেশকে ভালোবাসা মানে দেশের জনগণকে ভালোবাসা, দেশের স্বাধীনতা রক্ষা করা, দেশের পতাকাকে সম্মান করা, শহীদদের স্মরণ করা এবং দেশের জন্য আত্মদানকারীদের শ্রদ্ধা করা।

কুরআনুল কারিমে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসে, তখন তাসবিহ ও ইস্তেগফার করতে হবে। সুরা নসর এই তাৎপর্যেই নাজিল হয়েছে।

অতএব, বিজয় দিবসে আনন্দ, শোকরিয়া, মিষ্টি বিতরণ, আলোচনা, সেমিনার আয়োজন, শিক্ষার্থীদের মাঝে দেশপ্রেম জাগ্রত করা-এসব ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ, বরং প্রশংসনীয়।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই উদযাপন করেছেন বিজয় দিবস; মক্কা বিজয়ের উদাহরণ :

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরত করে ১০ বছর নির্বাসন জীবন কাটানোর পর যখন বিজয় ও স্বাধীনতার মুখ দেখলেন-মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে-তখন তিনি ৮ রাকাআত নামাজ পড়ে আনন্দ প্রকাশ করলেন। তিনি মক্কার অত্যাচারীদের প্রতিশোধ নেননি; বরং ঘোষণা করলেন- “যারা কাবাঘরে আশ্রয় নেবে, তারা নিরাপদ।”

এই ঘোষণা মানবিকতার, ক্ষমার, ঐক্যের। ইসলামের বিজয় উৎসবের এটাই প্রকৃত রূপ। যারা আজ বলে বিজয় দিবস উদযাপন করা ইসলামের বিরোধী-তারা ইতিহাস জানে না।

বাংলার দীর্ঘতম সংগ্রাম-ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা :

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল স্বাধীনতার মাটিতে বপন করা প্রথম বীজ। রফিক, বরকত, সালাম, জব্বারদের রক্তে রাঙানো ২১ ফেব্রুয়ারি বাঙালিকে শিখিয়েছে নিজের ভাষার জন্য, নিজের অধিকার ও মর্যাদার জন্য দাঁড়াতে হয়। তারপর ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-এর ঐতিহাসিক ছয় দফা, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান-প্রতিটি সংগ্রাম স্বাধীনতার পর্বতচূড়ায় ওঠার ধাপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাক হানাদার বাহিনীর ভয়াল আক্রমণ-অগ্নি-ঝড়ের মতো ছড়িয়ে পড়া হত্যাযজ্ঞ-বাংলার মানুষের জীবনে যে অমানবিক ট্র্যাজেডি সৃষ্টি করেছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। নয় মাস পর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জিত হয় অসংখ্য শহীদের রক্তে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রাণ, সংগ্রামের শিরোমণি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই বাঙালিকে মুক্তির পথে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর ভাষণ, তাঁর সাহস, তাঁর আত্মত্যাগ ইতিহাসকে বদলে দিয়েছে।

বিজয় দিবসে তাঁকে স্মরণ করা জাতির দায়িত্ব, ইতিহাসের দাবি।

বিজয় দিবসের ধর্মীয় তাৎপর্য-শহীদদের মর্যাদা :

ইসলাম শহীদকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহর পথে একদিন সীমান্ত পাহারা দেওয়া এক মাসের নফল রোজা-নামাজের চেয়ে উত্তম।” (মুসলিম)

বাংলার শহীদরা এই সম্মানেই ভূষিত।

নতুন বাংলাদেশ: ন্যায়, ইনসাফ ও গণমানুষের মুক্তির নতুন যাত্রা :

বাংলাদেশ শুধু ১৯৭১-এর জন্য অপেক্ষা করেনি; সময়ের প্রতিটি বাঁকে এ দেশ নতুন নতুন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে উন্নত, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যে “নতুন বাংলাদেশ”–এর বাস্তবতা তৈরি হয়েছে-সেটি মূলত ন্যায়পরায়ণ, দুর্নীতিমুক্ত, গণমানুষের স্বাধীনতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার আরেক বৃহৎ আন্দোলন।

জুলাই আন্দোলন-নতুন জাগরণের প্রতীক :

জুলাই আন্দোলন ছিল ক্ষমতার জুলুম, অবিচার, নিপীড়ন ও দমনপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
এর শহীদরা যেমন গণমানুষের অধিকারের জন্য প্রাণ দিয়েছেন, ঠিক যেমন ১৯৭১-এ শহীদরা দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন।

জুলাই আন্দোলন আমাদের শেখায়- স্বাধীনতা কেবল একবার অর্জন করলেই শেষ নয়; স্বাধীনতা রক্ষায় প্রতিটি যুগে সংগ্রাম করতে হয়।

জুলাই শহীদরা নতুন সময়ের শহীদ-ন্যায়বিচারের জন্য প্রাণ উৎসর্গকারী।

নতুন বাংলাদেশ-ঐক্য, ন্যায় ও মানবিকতার রাষ্ট্র আজ বাংলাদেশ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে- দুর্নীতি মুক্ত রাষ্ট্রের স্বপ্ন, বিচারহীনতার অবসান, জনগণের অধিকার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, সবার জন্য সমান সুযোগ এসবই নতুন বাংলাদেশের দাবি।

বিজয় দিবস তাই নতুন করে আমাদের জাতির উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে দেয়
ন্যায় প্রতিষ্ঠা করো, দুর্নীতির বিরুদ্ধে শপথ নাও, মানবিক রাষ্ট্র গড়ো।

ঐক্য-নতুন বিজয়ের পূর্বশর্ত :

ইসলাম মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশ দিয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ঐক্য মানে- প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা, ছাত্র, তরুণ, শ্রমজীবী মানুষের নিরাপত্তা, মুক্তচিন্তা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষা, দেশকে বিভেদ নয়, ঐক্যের পথে নিয়ে যাওয়া

নতুন বাংলাদেশ কোনো দলীয় এজেন্ডা নয়-এটি এক মানবিক রাষ্ট্র নির্মাণের যাত্রা। ১৬ ডিসেম্বরের নতুন পাঠ-অতীতের গৌরব, বর্তমানের সংগ্রাম, ভবিষ্যতের অঙ্গীকার

এ বিজয় দিবসে আমাদের দায়িত্ব :

১। শহীদদের স্মরণ ও দোয়া ,- ১৯৫২, ১৯৭১, এবং জুলাই আন্দোলনের শহীদদের সম্মান দেওয়া।

২। দেশের উন্নয়নে নিজেদের উৎসর্গ,- প্রত্যেকে নিজের স্থানে দেশকে উন্নত করতে ভূমিকা রাখা।

৩। সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পথে অটল থাকা,- যেখানে অন্যায়, সেখানেই প্রতিবাদ-এই নৈতিক অবস্থানই স্বাধীনতার সারমর্ম।

৪। জাতীয় পতাকার সম্মান,- পতাকা উত্তোলন শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ঈমানের অংশ।

৫। ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠন,- বর্ণ, দল, মত-সব বিভেদ ভুলে একটি মানবিক ন্যায় ইনসাফ ও কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া।

বিজয় দিবস শুধু অতীতের স্মৃতি নয়-এটি বর্তমানের দায়িত্ব ও ভবিষ্যতের শপথ :

১৬ ডিসেম্বর আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়- আল্লাহর অনুগ্রহ ছাড়া বিজয় আসে না, শহীদদের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা মুমিনের কর্তব্য, দেশকে ভালোবাসা ঈমানের অঙ্গ, ঐক্য ছাড়া কোনো জাতি টিকে থাকতে পারে না

বিজয় দিবস তাই আমাদের আহ্বান জানায়, বাংলাদেশকে সুন্দর, ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ন্যায় ইনসাফ ও কল্যাণ রাষ্ট্র ও ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করো। ১৯৭১-এর চেতনা ও নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নকে মিলিয়ে নতুন একটি সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলো।

লেখক : সম্পাদক, ইউরোবাংলা