১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ইউরোপ

নাগরিকত্বের জন্য এক মিলিয়নেরও বেশি আবেদন; কনসুলেট সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে স্পেন

নাগরিকত্বের জন্য এক মিলিয়নেরও বেশি আবেদন; কনসুলেট সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে স্পেন

স্পেনের নাগরিকত্ব পেতে আগ্রহী স্পেনীয় নির্বাসিত বা অভিবাসীদের বংশধরদের ভিড়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্পেনীয় কনস্যুলেটগুলোতে রেকর্ডসংখ্যক আবেদন জমা পড়ছে। দেশটির গণতান্ত্রিক স্মৃতি সংক্রান্ত আইন-এর অধীনে এখন পর্যন্ত ১০ লাখেরও বেশি আবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে আবেদনের অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন অপেক্ষায় রয়েছে আরো ১৩ লাখের বেশি আবেদনকারী। এই ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ের যেকোনো কনস্যুলার চাপকে ছাড়িয়ে গেছে।

 

আবেদনকারীদের ঢল:

বিদেশে বসবাসরত স্পেনীয় নাগরিকদের সাধারণ পরিষদ-সিজিসিইই (সিজিসিইই) এর তথ্য অনুযায়ী, আর্জেন্টিনা থেকে এসেছে সবচেয়ে বেশি আবেদন, যা প্রায় ১০ লাখের মতো। এরপর রয়েছে যথাক্রমে-হাভানা (কিউবা) থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার, মেক্সিকো সিটি থেকে ১ লাখ ৬৫ হাজার, সাও পাওলো (ব্রাজিল) থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার, মায়ামি (যুক্তরাষ্ট্র) থেকে ১ লাখ ২০ হাজার এবং কারাকাস (ভেনেজুয়েলা) থেকে ৪০ হাজার আবেদন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংখ্যাগুলো স্পেনের পূর্ববর্তী ২০০৭ সালের ঐতিহাসিক স্মৃতি সংক্রান্ত আইন–এর তুলনায় ৪ দশমিক ৫ গুণ বেশি, যা একটি ঐতিহাসিক রেকর্ড।

কনস্যুলেটগুলোতে চাপ

২১ অক্টোবর ছিল আবেদন জমা দেওয়ার চূড়ান্ত তারিখ। সময়সীমার আগে কয়েক মাসে হাজার হাজার আবেদন জমা পড়তে শুরু করে, যা কনস্যুলেটগুলোর সক্ষমতার বাইরে চলে যায়। ফলে যারা শেষ সময়ের আগে কেবল অনলাইনে সাক্ষাৎ সময় নির্ধারণ করতে পেরেছেন কিন্তু কাগজপত্র জমা দিতে পারেননি, তাদের আবেদনও বৈধ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।

আবেদন প্রত্যাখ্যানের হার

এ পর্যন্ত জমা পড়া ১০ লাখ আবেদন-এর প্রায় ৫০ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত হয়ে নাগরিকত্ব অনুমোদিত হয়েছে। প্রত্যাখ্যানের হার মাত্র ২ শতাংশ-এর কম, যা এই আইনের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার ইঙ্গিত দেয়। অনেক আবেদনকারী এখনো আনুষ্ঠানিক নাগরিক নিবন্ধনের অপেক্ষায় আছেন, যা পুরো প্রক্রিয়াকে আরও ধীর করে দিচ্ছে।

সিজিসিইই (সিজিসিইই)-এর সতর্কবার্তা

বিদেশে বসবাসরত স্পেনীয় নাগরিকদের সাধারণ পরিষদ-সিজিসিইই সিজিসিইই–এর সভাপতি ভায়োলেটা আলোনসো পেলায়েজ এল পাইস –কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, “এই অপ্রত্যাশিত আবেদনপ্রবাহ সামলাতে সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত জনবল, প্রযুক্তি এবং অবকাঠামোগত সহায়তা দিতে হবে। নইলে আবেদন প্রক্রিয়া দশকের পর দশক পিছিয়ে যাবে।”

তিনি প্রস্তাব দিয়েছেন, স্পেনের ৭ হাজারেরও বেশি নাগরিক নিবন্ধন দপ্তর যেন বিদেশে নাগরিকত্ব পাওয়া নতুন স্পেনীয়দের নিবন্ধনে সহায়তা করে। আরও কর্মী নিয়োগ করা, এবং তথ্যকে ডিজিটাল আকারে রূপান্তর করার মতো নিয়মিত কাজগুলো বাইরের সংস্থাকে দেয়া যেতে পারে।

অন্যান্য সেবা পরিস্থিতি

অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে কনস্যুলেটগুলোতে সাধারণ সেবাগুলোও ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে, বিদেশে জন্ম নেওয়া স্পেনীয় শিশুদের জন্ম নিবন্ধন, পাসপোর্ট ইস্যু, বিবাহ–মৃত্যু সনদ, এসব কাজেও এখন উল্লেখযোগ্য বিলম্ব দেখা যাচ্ছে। CGCEE জানায়, নাগরিকত্ব পাওয়া মানুষ বাড়ার সাথে সাথে কনস্যুলেট সেবার চাহিদা আরও বহুগুণ বাড়বে।

বিদেশে স্পেনীয় নাগরিকের সংখ্যা:

বর্তমানে বিদেশে বসবাসরত স্পেনীয় নাগরিক সংখ্যা ৩ মিলিয়নেরও বেশি। নতুন নাগরিকত্ব অনুমোদনের ফলে এই সংখ্যা ৫ মিলিয়নের কাছাকাছি পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

এডিই (এডিই)-এর রিপোর্ট:

স্পেনীয় কূটনীতিকদের বৃহত্তম সংগঠন-এডিই(ADE) গত বছর জানিয়েছিল, সরকারি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২৮টি কনস্যুলেট সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চলছে, ৬৮টিতে প্রবেশগম্যতার সমস্যা রয়েছে, ১৪টিতে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই, এবং অন্তত ১৭টি ভবন জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ADE সতর্ক করে বলেছে, অনেক কনস্যুলেট স্পেনের পেশাগত স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষেত্র নিরাপত্তার নিয়ম মানছে না।

 

দীর্ঘ লাইন ও দীর্ঘ অপেক্ষা:

স্পেনীয় বংশধরদের নাগরিকত্ব স্বীকৃতি, একদিকে ঐতিহাসিক একটি পদক্ষেপ, অন্যদিকে ব্যবস্থাপনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। প্রবাহিত আবেদন, সীমিত কর্মী, দুর্বল অবকাঠামো, সব মিলিয়ে আবেদনকারীদের জন্য অপেক্ষার সময় হতে পারে বহু বছর, এমনকি কেউ কেউ জীবদ্দশায় ফলাফল দেখতে নাও পারেন বলে আশঙ্কা করছে সংশ্লিষ্টরা।