১৪ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

গোপন পাপ: ভয়াবহতা ও পরিত্রাণের উপায়

আবদুল আহাদ সালমান


মানুষ সাধারণত নিজের ভুল ও অপরাধ অন্যের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে চায়। সবাই চায় সমাজে একজন ভালো, সম্মানিত ও সুনামধন্য মানুষ হিসেবে পরিচিত হতে। কিন্তু মানুষের কাছ থেকে কোনো বিষয় কিছু সময়ের জন্য গোপন রাখা সম্ভব হলেও মহান আল্লাহর কাছ থেকে কিছুই গোপন থাকে না। একজন মানুষ যখন ইচ্ছাকৃতভাবে বারবার গোপনে গুনাহ করতে থাকে, তখন ধীরে ধীরে তার অন্তর থেকে আল্লাহভীতি কমে যায়। এর ফলে হৃদয় কঠিন হয়ে যায়, ইবাদতে আগ্রহ কমে, কুরআন তিলাওয়াতের মাধুর্য হারিয়ে যায় এবং আল্লাহর আনুগত্য তার কাছে ভারী মনে হতে থাকে। যদি সে এ অবস্থায় তাওবা না করে, তবে ধীরে ধীরে তার ঈমান দুর্বল হয়ে যায় এবং ভয়াবহ পরিণতির দিকে এগিয়ে যেতে পারে।

গোপন পাপের ভয়াবহতা :

কিছু মানুষ দীর্ঘদিন পাপ করতে করতে এমন অবস্থায় পৌঁছে যায় যে, তারা আর পাপকে পাপই মনে করে না। বরং তাদের কাছে তা স্বাভাবিক কিংবা ভালো কাজ বলে মনে হয়। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন,

যাকে মন্দকর্ম শোভনীয় করে দেখানো হয়, ফলে সে সেটিকে ভালো মনে করে, সে কি তার সমান, যে মন্দকে মন্দ মনে করে? নিশ্চয় আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত করেন। (সূরা ফাতির, আয়াত ৮)

যখন পাপ মানুষের কাছে প্রিয় হয়ে যায়, তখন তাওবা করার সৌভাগ্যও অনেক সময় তার নসিব হয় না। ফলে সে আল্লাহর অসন্তুষ্টি নিয়ে মৃত্যুবরণ করতে পারে।

প্রকাশ্য ও গোপন পাপ :

অনেক মানুষ সমাজে ভালো, ধার্মিক বা দ্বীনদার হিসেবে পরিচিত থাকলেও গোপনে নানা ধরনের গুনাহে লিপ্ত থাকে। এটি একদিকে মুনাফেকির লক্ষণ, অন্যদিকে তার নেক আমল ধ্বংস হওয়ার কারণ হতে পারে। তাই আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন,

তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন সব ধরনের গুনাহ পরিত্যাগ কর। (সূরা আল-আনআম, আয়াত ১২০)

গোপন পাপ বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। যেমন:গোপনে শিরক বা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে পশু জবাই করা, ইবাদত করার সময় মানুষের প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে নিয়ত করা (রিয়া), গোপন ব্যভিচার, অবৈধ সম্পর্ক বা পরকীয়ায় জড়ানো এবং অন্তরের খারাপ চিন্তা ও অসৎ নিয়ত লালন করা।

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, আমার প্রতিপালক প্রকাশ্য ও গোপন সব অশ্লীল কাজ, গুনাহ, অন্যায়-অত্যাচার, শিরক এবং আল্লাহ সম্পর্কে না জেনে কথা বলা হারাম করেছেন। (সূরা আল-আরাফ, আয়াত ৩৩)

বর্তমান সময়ে গোপন পাপের বিস্তার :

বর্তমান যুগে গোপন গুনাহ করার সুযোগ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। বিশেষ করে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের হাতের নাগালে থাকায় অনেক গুনাহ খুব সহজে করা সম্ভব হচ্ছে। আগে একটি সিনেমা দেখতে হলে অনেক দূরে যেতে হতো, কিন্তু এখন কয়েক সেকেন্ডেই মোবাইলে সবকিছু দেখা যায়।

ফলে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, অনেক দ্বীনদার ব্যক্তি এমনকি আলেমদের মধ্যেও কেউ কেউ এসব ফিতনার শিকার হচ্ছেন। তাই বর্তমান সময়ে শক্ত ঈমান, তাকওয়া ও আত্মসংযম ছাড়া গোপন পাপ থেকে বেঁচে থাকা কঠিন।

আলেমদের সতর্কবাণী :

ইমাম ইবনুল জাওযী (রহ.) বলেন, বিশেষ করে গোপন গুনাহ থেকে খুব সতর্ক থাকো। আল্লাহ ও তোমার মধ্যকার গোপন সম্পর্ক ঠিক করে নাও, তাহলে আল্লাহ তোমার প্রকাশ্য অবস্থাও সুন্দর করে দেবেন।

ইমাম ইবনুল আরাবী (রহ.) বলেন, সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সে, যে মানুষের সামনে ভালো আমল করে কিন্তু সেই আল্লাহর অবাধ্য হয়, যিনি তার শাহরগের চেয়েও নিকটবর্তী।

হাফিয ইবনু রজব হাম্বলী (রহ.) বলেন, অনেক সময় মানুষের অজানা গোপন গুনাহই মৃত্যুকালে তার মন্দ পরিণতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন,আল্লাহভীরু আলেমদের মতে, গোপন গুনাহই মানুষের অধঃপতনের প্রধান কারণ।

গোপন গুনাহ থেকে বাঁচার উপায় :

১। আন্তরিক তাওবা ও দোয়া করা।

নিজের গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হতে হবে, কান্নাকাটি করতে হবে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

আমার বান্দারা যখন আমার সম্পর্কে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, আমি তো তাদের খুবই নিকটে আছি। যে আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই। (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৮৬)

২। নিজের নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা।

খারাপ প্রবৃত্তিকে দমন করে অন্তরকে পবিত্র করার চেষ্টা করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, যে নিজের আত্মাকে পবিত্র করে, সে-ই সফল। আর যে তাকে কলুষিত করে, সে ব্যর্থ। (সূরা আশ-শামস, আয়াত ৭-১০)

এছাড়া তিনি বলেন, যারা আমার পথে চেষ্টা করে, আমি অবশ্যই তাদের আমার পথসমূহ দেখিয়ে দেব। (সূরা আল-আনকাবূত, আয়াত ৬৯)

৩। কিয়ামতের দিনের কথা স্মরণ রাখা।

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, কিছু মানুষ কিয়ামতের দিন পাহাড়সম নেক আমল নিয়ে আসবে, কিন্তু আল্লাহ তা ধূলিকণার মতো উড়িয়ে দেবেন। কারণ তারা মানুষের অগোচরে আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হতো।

৪। সবসময় মনে রাখা যে আল্লাহ সবকিছু দেখছেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ওপর সর্বদা পর্যবেক্ষক। (সূরা আন-নিসা, আয়াত ১)

৫। লজ্জাবোধ জাগ্রত করা।

ভাবতে হবে, যদি পরিবারের কোনো সম্মানিত ব্যক্তি আমাকে এ অবস্থায় দেখতেন, তাহলে কি আমি এই কাজ করতে পারতাম? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মানুষকে আল্লাহর সামনে লজ্জাবোধ করার শিক্ষা দিয়েছেন।

৬। মৃত্যুর কথা স্মরণ করা।

সবসময় মনে রাখতে হবে, গুনাহরত অবস্থায় যদি মৃত্যু এসে যায়, তাহলে সেই অবস্থাতেই কিয়ামতের দিন উঠানো হবে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

প্রত্যেক মানুষকে যে অবস্থায় মৃত্যু হবে, সে অবস্থাতেই তাকে পুনরুত্থিত করা হবে।

৭। জান্নাতের পুরস্কার ও জাহান্নামের শাস্তি স্মরণ করা।

জান্নাতের নিয়ামত এবং জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তির কথা বেশি বেশি চিন্তা করলে গুনাহ থেকে দূরে থাকা সহজ হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, যে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে, সে কি উত্তম, নাকি যে কিয়ামতের দিন নিরাপদে উপস্থিত হবে? (সূরা হা-মীম সাজদাহ, আয়াত ৪০)

৮। যিকির, কুরআন তিলাওয়াত ও চিন্তায় সময় কাটানো।

অবসর সময় আল্লাহর যিকির, কুরআন তিলাওয়াত, ইসলামী বই অধ্যয়ন এবং আল্লাহর সৃষ্টিজগত নিয়ে চিন্তা-গবেষণায় ব্যয় করা উচিত। আল্লাহ তাআলা সূরা আলে ইমরানের ১৯০-১৯১ নম্বর আয়াতে বুদ্ধিমান মুমিনদের এ গুণের প্রশংসা করেছেন।

গোপন গুনাহ মানুষের ঈমান, আমল ও চরিত্র ধ্বংস করে দিতে পারে। তাই আমাদের উচিত প্রকাশ্য ও গোপন উভয় ধরনের পাপ থেকে দূরে থাকা। মোবাইল ও ইন্টারনেটের অপব্যবহার থেকে নিজেকে রক্ষা করা, নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করা, যিকির করা, সৎ ও দ্বীনদার আলেমদের সোহবত গ্রহণ করা এবং কোনো গুনাহ হয়ে গেলে দ্রুত তাওবা করা।

আমরা মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন আমাদেরকে সব ধরনের প্রকাশ্য ও গোপন গুনাহ থেকে হেফাজত করেন, শিরকমুক্ত বিশুদ্ধ ঈমান, সুন্নাহসম্মত আমল এবং ঈমানের সঙ্গে মৃত্যু দান করেন। আমীন।

লেখক : সম্পাদক: ইউরোবাংলা; প্রেসিডেন্ট, পর্তুগাল বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির (পিবিসিসিআই)
Home R3