মানবজাতিকে আল্লাহ যে অসংখ্য নেয়ামত দিয়েছেন, তার মধ্যে ভাষা অন্যতম। ভাষা মানুষের চিন্তা, অনুভূতি, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে প্রকাশ করার প্রধান মাধ্যম। মানবসভ্যতা, সাহিত্য, বিজ্ঞান; সবকিছুতেই ভাষা অবিচ্ছেদ্য অংশ।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, “তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে ভাষা (বক্তব্য) শিখিয়েছেন। (সূরা আর-রহমান: ২–৩)
এই আয়াতের মাধ্যমে বোঝা যায়, ভাষার সঠিক ব্যবহার শুধু দক্ষতা নয়; বরং তা আল্লাহর পক্ষ থেকে দান করা এক বিশেষ উপহার। তাই ভাষাকে বিশুদ্ধ ও সুন্দর রাখার গুরুত্ব ইসলাম সর্বদাই তুলে ধরেছে।
হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভাষা ছিল সবচেয়ে বিশুদ্ধ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন আরবদের মধ্যে সবচেয়ে বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলা ব্যক্তি।
তিনি নিজেই বলেছেন, আমি আরবদের মধ্যে সবচেয়ে বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলি।
নবীজির কথাবার্তা ছিল পরিষ্কার, স্পষ্ট, যথার্থ ও শুদ্ধ ব্যাকরণসমৃদ্ধ। কোনো সাহাবি ভুল শব্দ ব্যবহার করলে তিনি তা নম্রভাবে ঠিক করে দিতেন।
ভাষা সংশোধনের উদাহরণসমূহ :
১। এক সাহাবি অনুমতি চাইতে গিয়ে বলেছিলেন, “আ-আলিজু?”
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সংশোধন করে বলতে বললেন, ‘আ-আদখুলু?’ অর্থাৎ আমি কি প্রবেশ করব?”
২। সাহাবাগণ আঙ্গুরকে “করম” বলতেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটি পরিবর্তন করে বলেছিলেন, তোমরা “করম” বলো না, “ইনাব” বলো। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ৬০০৫)
৩। কেউ কেউ ইশার নামাজকে “আতামা” বলতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা ইশাকে “আতামা” বলো না। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা)
এগুলো প্রমাণ করে, শব্দের শুদ্ধতা শুধু সাহিত্যিক নিয়ম নয়; বরং তা সুন্নতের অংশ।
সাহাবীগণ ও সালাফের দৃষ্টিতে ভাষার গুরুত্ব :
সাহাবায়ে কেরাম ও প্রাচীন ইসলামে ভাষার বিশুদ্ধতা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
১। হজরত উমর (রা.) বলেছেন, আরবি ভাষা শেখো, কারণ তা তোমার দ্বীনের অংশ।
২। ইমাম শাফিয়ী (রহ.) বলেন, আরবি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য প্রয়োজনীয়; কারণ কুরআন ও সুন্নাহ এ ভাষাতেই নাজিল হয়েছে।
৩। ইবন তায়মিয়্যা (রহ.) বলেন, ভাষার শুদ্ধতা চিন্তাকে শুদ্ধ করে। আর চিন্তার শুদ্ধতা আমলকে শুদ্ধ করে। এই বক্তব্যগুলো একত্রে প্রমাণ করে-শুদ্ধ ভাষা ইসলামিক জ্ঞানচর্চার অপরিহার্য উপাদান।
দাওয়াতের কাজে ভাষার বিশুদ্ধতা কেন প্রয়োজন?
দাওয়াত হলো মানুষের হৃদয়ে সত্যকে পৌঁছে দেওয়ার কাজ। মানুষের অন্তর ভাষার মাধ্যমেই প্রভাবিত হয়। ভাষায় যদি থাকে, স্পষ্টতা, শুদ্ধতা, সঠিক শব্দ প্রয়োগ, কোমলতা ও আবেদনময়তা; তাহলে দাওয়াতের শক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বহু শিক্ষিত ও ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন অমুসলিমের সামনে দাওয়াত দিয়েছেন, কিন্তু কখনো অশুদ্ধ বা কটু ভাষা ব্যবহার করেননি। তাঁর বাণী ছিল প্রাঞ্জল, যুক্তিসম্মত ও হৃদয়স্পর্শী।
হাদিসে আছে, কিছু কথায় জাদু থাকে। অর্থাৎ, সুন্দর ও সত্য ভাষা মানুষের মনকে আকৃষ্ট করে, পরিবর্তন আনে।
মুসা (আ.) আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন, হে আল্লাহ, আমার ভাষা সহজ করে দাও। (সূরা ত্বাহা: ২৭)
তিনি তাঁর ভাই হারুন (আ.)-কে সঙ্গী চেয়েছিলেন কারণ হারুন ছিলেন পরিষ্কারভাবে কথা বলায় পারদর্শী। এর মাধ্যমে বোঝা যায়-দাওয়াতের কাজে শুদ্ধ ও সাবলীল ভাষা অপরিহার্য।
ভাষা ও মুসলিম সমাজের বর্তমান চিত্র :
আমরা জীবনের বহু ক্ষেত্রে নবীজির সুন্নত অনুসরণ করি, কিন্তু ভাষার বিশুদ্ধতার ক্ষেত্রে আমরা বেশ উদাসীন। বাংলা ভাষায় অশুদ্ধতা এখন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। সাইনবোর্ডে বেঠিক বানান, পত্র-পত্রিকায় অর্ধশুদ্ধ ভাষা, শিক্ষিত মানুষের কথায় বিদেশি শব্দের অযথা ব্যবহার, নিজের ভাষাকে অবহেলা করে ইংরেজি কিংবা অর্ধবাংলায় কথা বলার প্রবণতা।
একটি জাতি যার ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে, সে জাতির ভাষা আজ নিজ দেশেই অবহেলিত-এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
ভাষা সমৃদ্ধ হয় চর্চায় :
যে ভাষা মানুষ ভালোবাসে ও নিয়মিত চর্চা করে-সে ভাষাই উন্নত হয়। উর্দু ভাষা এর একটি উদাহরণ। দীর্ঘ চর্চা ও পৃষ্ঠপোষকতার ফলে উর্দু মুসলিম সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ভাষায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু আমরা বাংলা ভাষাকে ইসলামের জ্ঞানভাষা হিসেবে গড়ে তুলতে পারিনি-এ আমাদের ব্যর্থতা।
সময়ের দাবি শুদ্ধ ভাষার আন্দোলন :
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল বাংলা ভাষার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। কিন্তু শুদ্ধ বাংলার প্রয়োগ প্রতিষ্ঠা এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। তাই প্রয়োজন- একটি নতুন আন্দোলন:
শুদ্ধ ভাষার আন্দোলন, যে আন্দোলনের লক্ষ্য হবে, ভাষার সম্মান ফিরিয়ে আনা, অশুদ্ধতা দূর করা, ইসলামের জ্ঞান ও সাহিত্য বাংলায় সমৃদ্ধ করা, সমাজে শুদ্ধ কথা বলার সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়া।
আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের শুদ্ধ ভাষা ব্যবহারের তাওফিক দান করেন। আমিন।
লেখক : সম্পাদক, ইউরোবাংলা; প্রেসিডেন্ট, পর্তুগাল বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি (PBCCI)