১৬ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

মতামত
সম্পাদকীয়

নববর্ষের প্রেক্ষাপটে সময়, ঈমান ও আত্মশুদ্ধি

নববর্ষের প্রেক্ষাপটে সময়, ঈমান ও আত্মশুদ্ধি

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। মানুষের ব্যক্তিগত আচরণ থেকে শুরু করে সামাজিক সম্পর্ক, আনন্দ-বেদনার প্রকাশ, উৎসব ও অবসর; সবকিছুর জন্যই ইসলামে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। ইসলাম আনন্দকে নিষিদ্ধ করা হয়নি; বরং উদযাপনকে শালীনতা, সংযম ও আল্লাহভীতির সীমার ভেতরে রেখে ইবাদতের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছে। তবে সে আনন্দ হতে হবে অর্থবহ, উদ্দেশ্যপূর্ণ এবং শরিয়তের অনুগত।

বর্তমানে প্রতি বছর ৩১ ডিসেম্বর রাতকে কেন্দ্র করে যে ইংরেজি নববর্ষ বা ‘থার্টি ফার্স্ট নাইট’ উদযাপন করা হয়, তার সঙ্গে ইসলামের কোনো ধর্মীয় বা নৈতিক সংযোগ নেই। এটি মূলত পাশ্চাত্য সংস্কৃতিনির্ভর একটি সামাজিক রীতি, যা আমাদের সমাজে ক্রমে অশ্লীলতা, উচ্ছৃঙ্খলতা, নৈতিক শৈথিল্য ও আত্মপরিচয়ের সংকট তৈরি করছে। একজন সচেতন মুমিনের পক্ষে এমন সংস্কৃতির অন্ধ অনুসরণ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

অশ্লীলতা ও নৈতিক অবক্ষয় সম্পর্কে ইসলামের অবস্থান :

কুরআন ও সুন্নাহতে অশ্লীলতা ও সীমালঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কতা এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়স্বজনকে দান করার আদেশ দেন এবং অশ্লীলতা, অসৎকাজ ও অবাধ্যতা থেকে নিষেধ করেন।” (সূরা নাহল: ৯০)

আরেক আয়াতে আরও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, “যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” (সূরা নূর: ১৯)

ইংরেজি নববর্ষকে কেন্দ্র করে যে উন্মুক্ত নাচ-গান, মাদকাসক্তি, বেহায়াপনা ও অপচয়ের চিত্র দেখা যায়, তা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। এসব কার্যকলাপ শয়তানের কৌশল, যা ধীরে ধীরে মানুষকে ঈমান, লজ্জাবোধ ও নৈতিকতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এজন্যই আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেছেন, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না।” (সূরা নূর: ২১)

গান-বাজনা ও অনৈতিক বিনোদনের পরিণতি :

নববর্ষ উদযাপনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো উচ্চ শব্দের গান-বাজনা, বাদ্যযন্ত্র, আতশবাজি ও অনিয়ন্ত্রিত বিনোদন। এসব বিষয়ে ইসলামের অবস্থান সুস্পষ্ট। রাসূলুল্লাহ সা: শেষ যুগের ফিতনা সম্পর্কে বলেন, “যখন গায়ক-গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্র ব্যাপকভাবে প্রকাশ পাবে, তখন ভূমিধস, আকাশ থেকে পাথর বর্ষণ ও বিকৃতি ঘটবে।” (ইবনে মাজাহ)

এই হাদিস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অনৈতিক বিনোদন কেবল ব্যক্তিগত গুনাহ নয়; বরং তা সামাজিক বিপর্যয়েরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সময়ের প্রকৃত মূল্য ও জীবনের উদ্দেশ্য :

ইসলাম মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়, দুনিয়ার জীবন ভোগ-বিলাসের জন্য নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আমি মানুষ ও জিনকে সৃষ্টি করেছি শুধু আমার ইবাদতের জন্য।” (সূরা আয-যারিয়াত: ৫৬)

নতুন বছরের আগমন মানে আমাদের জীবনের একটি অধ্যায় শেষ হয়ে যাওয়া। একজন মুমিনের জন্য এটি উল্লাসের উপলক্ষ নয়; বরং আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির সময়। গত বছরে কী করেছি, কোথায় ভুল করেছি, আখিরাতের জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছি-এই প্রশ্নগুলো একজন ঈমানদারের হৃদয়ে নাড়া দেওয়া উচিত।

কুরআনে বলা হয়েছে, “আমলনামা সামনে উপস্থিত করা হবে, তখন অপরাধীরা বলবে-হায় আফসোস! এ কেমন আমলনামা, যা ছোট-বড় কিছুই বাদ দেয়নি।” (সূরা কাহফ: ৪৯)

বিজাতীয় সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের সংকট :

আমরা বাঙালি মুসলিম। আমাদের রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঈমানি পরিচয়। বিজাতীয় সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ আমাদের এই পরিচয়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। রাসূলুল্লাহ সা: স্পষ্টভাবে বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত।” (আবু দাউদ)

এমনকি বিশেষ কোনো সময়কে শুভ বা অশুভ মনে করাও ইসলামের দৃষ্টিতে কুসংস্কার। সময়ের নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই; সব কিছুই আল্লাহর ইচ্ছায় পরিচালিত হয়। তাই নববর্ষকে সৌভাগ্য বা অমঙ্গল বয়ে আনার দিন হিসেবে বিশ্বাস করা ঈমানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

নতুন বছরে একজন মুমিনের করণীয় :

ইংরেজি নববর্ষ ইসলামে কোনো ধর্মীয় উৎসব নয়। তবে সময়ের পরিবর্তন একজন মুমিনের জন্য আত্মশুদ্ধি ও নতুন সংকল্পের সুযোগ হতে পারে। এ সময় একজন মুসলিমের উচিত- আন্তরিক তওবা করা এবং অতীতের ভুল থেকে ফিরে আসা, ঈমান, ইবাদত ও চরিত্রে উন্নতির দৃঢ় সংকল্প নেওয়া, সময়ের সদ্ব্যবহার ও দায়িত্বশীল জীবনযাপনের পরিকল্পনা করা, পরিবার ও সমাজের প্রতি নিজের দায়বদ্ধতা নতুন করে উপলব্ধি করা

একই সঙ্গে বর্জনীয় হলো, অশ্লীলতা, নাচ-গান ও অনিয়ন্ত্রিত আনন্দ, অপচয় ও বিলাসিতা, নববর্ষকে ধর্মীয় উৎসব হিসেবে গ্রহণ করা এবং আত্মতুষ্টিতে ডুবে থাকা।

নতুন বছর একজন মুমিনের জীবনে আনন্দ-উল্লাসের নয়; বরং আত্মসমালোচনা, সংশোধন ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উপলক্ষ। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে, প্রতিটি দিন আমাদের আখিরাতের দিকে আরও এগিয়ে নিচ্ছে। তাই আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে, বিজাতীয় সংস্কৃতির অন্ধ অনুসরণে নয়।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সময়ের সঠিক মূল্য বুঝে ঈমানদার হিসেবে জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : সম্পাদক, ইউরোবাংলা;  প্রেসিডেন্ট, পর্তুগাল বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির ( PBCCI )