৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

উচ্চশিক্ষা নয়, আগে মানুষ হওয়া জরুরি: নিঃসঙ্গ মায়ের মৃত্যু যে শিক্ষা দেয়

সমাজে উচ্চশিক্ষা, বড় পদ, অর্থনৈতিক সফলতা এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠা অর্জনকে আমরা প্রায়ই জীবনের সর্বোচ্চ সাফল্য বলে মনে করি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন মানুষ যদি নিজের জন্মদাত্রী মা-বাবার প্রতি দায়িত্বশীল না হয়, তবে তার সেই শিক্ষা, প্রতিষ্ঠা ও সাফল্যের প্রকৃত মূল্য কতটুকু?

সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুর-১১ এলাকার একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা পুরো জাতিকে নাড়া দিয়েছে। ৭২ বছর বয়সী নূরজাহান বেগম নামের এক বৃদ্ধার পচাগলা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মৃত্যুর পর প্রায় সাত থেকে আট দিন তাঁর মরদেহ ঘরের ভেতর পড়ে ছিল। আরও বেদনাদায়ক বিষয় হলো, তিনি মেয়ের বাসার একটি কক্ষে থাকতেন, আর মেয়ে একই ফ্ল্যাটের অন্য কক্ষে অবস্থান করতেন। অথচ এতদিনেও কেউ তাঁর খোঁজ নেননি।

জানা গেছে, মৃত বৃদ্ধার দুই ছেলে সমাজে অত্যন্ত প্রতিষ্ঠিত। একজন সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা (যুগ্ম সচিব) এবং অন্যজন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক। কিন্তু এত উচ্চশিক্ষা ও সামাজিক মর্যাদার পরও তাঁরা মায়ের খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেননি। এমনকি ঈদের মতো পারিবারিক ও আবেগঘন সময়েও মায়ের খবর নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, শিক্ষা কি কেবল ডিগ্রি অর্জনের নাম, নাকি মানুষের মধ্যে মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও কৃতজ্ঞতা সৃষ্টি করাও শিক্ষার উদ্দেশ্য?

শিক্ষা, মানবিকতা ও সন্তানের দায়িত্ববোধ

জেনারেল শিক্ষার গুরুত্ব:
আধুনিক বিশ্বে জেনারেল শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা, প্রকৌশল, প্রশাসন ও ব্যবসাসহ জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে উন্নতির জন্য আধুনিক শিক্ষার বিকল্প নেই। শিক্ষা মানুষের চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি করে, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা গড়ে তোলে এবং অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনে সহায়তা করে।

কিন্তু শিক্ষা যদি কেবল পেশাগত সফলতা অর্জনের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায় এবং মানুষের চরিত্র গঠনে ব্যর্থ হয়, তবে সেই শিক্ষা পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা নয়।

ইসলামী শিক্ষার গুরুত্ব
ইসলামী শিক্ষা মানুষের অন্তর ও চরিত্রকে পরিশুদ্ধ করে। এটি মানুষকে সততা, ন্যায়পরায়ণতা, দয়া, সহানুভূতি, দায়িত্ববোধ এবং আল্লাহভীতির শিক্ষা দেয়।

বিশেষ করে পিতা-মাতার প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও সেবাকে ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। একজন সন্তান যত বড়ই হোক না কেন, তার ওপর পিতা-মাতার হক কখনো শেষ হয় না।

ইসলামী শিক্ষা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়, পিতা-মাতার সেবা শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, এটি ইবাদতেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

শিক্ষা ও মানবিকতার সম্পর্ক
আজকের সমাজে এমন বহু মানুষ দেখা যায় যারা উচ্চশিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত এবং অর্থনৈতিকভাবে সফল। কিন্তু একই সঙ্গে তাদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধের ঘাটতিও লক্ষ্য করা যায়।

একজন মা-বাবা সন্তানের লালন-পালন, শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। অথচ সেই সন্তান যদি বৃদ্ধ বয়সে তাঁদের অবহেলা করে, তবে সেটি শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং শিক্ষাব্যবস্থারও একটি নৈতিক ব্যর্থতা।

প্রকৃত শিক্ষিত ব্যক্তি তিনিই, যিনি নিজের পরিবার, সমাজ এবং দেশের প্রতি দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকেন।

পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব
পিতা-মাতা সন্তানের জীবনের প্রথম শিক্ষক। তাঁদের ভালোবাসা, ত্যাগ ও পরিশ্রমের ফলেই সন্তান বড় হয়ে ওঠে। তাই বয়সের ভারে যখন তাঁরা দুর্বল হয়ে পড়েন, তখন তাঁদের পাশে দাঁড়ানো সন্তানের নৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।

তাঁদের চিকিৎসা, খাদ্য, বাসস্থান এবং মানসিক সঙ্গ নিশ্চিত করা শুধু দায়িত্ব নয়, বরং কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ।

একজন বৃদ্ধ মা বা বাবাকে অবহেলা করা শুধু মানবিকতার পরিপন্থী নয়, বরং সভ্যতা, সংস্কৃতি ও নৈতিকতারও অবমাননা।

কুরআনের আলোকে পিতা-মাতার মর্যাদা
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাঁর ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করবে। তাঁদের একজন অথবা উভয়ে যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাদেরকে ‘উফ’ পর্যন্ত বলো না, ধমক দিও না; বরং সম্মানজনক কথা বলো। (সূরা ইসরা, আয়াত ২৩-২৫)

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা নিজের ইবাদতের সঙ্গে পিতা-মাতার সেবাকে একত্রে উল্লেখ করেছেন। এর মাধ্যমে বুঝানো হয়েছে যে, তাওহীদের পরেই মানুষের ওপর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ।

আল্লাহ আরও বলেন: আমার প্রতি এবং তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও; আমার কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন। (সূরা লোকমান, আয়াত ১৪)

পিতা-মাতার আদেশ মান্য করার সীমারেখা

ইসলাম পিতা-মাতার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশ দিলেও আল্লাহর অবাধ্যতার ক্ষেত্রে তাদের আনুগত্য বৈধ নয়।

আল্লাহ বলেন: যদি তারা তোমাকে আমার সঙ্গে শরিক করার জন্য চাপ দেয়, তবে তাদের আনুগত্য করবে না। তবে পৃথিবীতে তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস করবে। (সূরা লোকমান, আয়াত ১৫)

অর্থাৎ শরিয়তবিরোধী আদেশ ছাড়া পিতা-মাতার সব বৈধ নির্দেশ পালন করা সন্তানের দায়িত্ব।

মুশরিক পিতা-মাতার প্রতিও সদাচরণ
হযরত আসমা (রা.) তাঁর মুশরিক মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন:

হ্যাঁ, তুমি তোমার মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। (সহিহ বুখারি)

আবু হুরায়রা (রা.)-এর মায়ের ইসলাম গ্রহণের ঘটনাও প্রমাণ করে, পিতা-মাতার প্রতি ভালোবাসা ও দোয়া কখনো বৃথা যায় না।

পিতা-মাতার সেবা কেন অপরিহার্য?

মা সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেন কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে। জন্ম দেন অসহনীয় যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে। এরপর বছরের পর বছর লালন-পালন করেন।

এই কারণেই আল্লাহ বারবার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন।

মানুষ পৃথিবীতে এসেছে পিতা-মাতার মাধ্যমেই। তাই তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও সম্মান প্রদর্শন মানবতার অন্যতম প্রধান শিক্ষা।

পিতা-মাতার পায়ের নিচে জান্নাত

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: তোমার পিতা-মাতার নিকট থাকো। নিশ্চয়ই জান্নাত তাদের পায়ের নিচে। (নাসাঈ)

অন্য বর্ণনায় এসেছে: তোমার মায়ের পায়ের কাছেই জান্নাত। (ইবন মাজাহ)

এ হাদিসগুলো প্রমাণ করে যে, পিতা-মাতার সেবা শুধু একটি সামাজিক দায়িত্ব নয়; বরং জান্নাত লাভের অন্যতম বড় মাধ্যম।

পিতা-মাতার সেবা জিহাদের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তিনি জানতে চান, তার পিতা-মাতা জীবিত আছেন কি না।

লোকটি বলল, “হ্যাঁ।”
তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: তুমি তাদের কাছেই ফিরে যাও এবং তাদের সেবার মধ্যেই জিহাদ কর। (সহিহ মুসলিম)

এ থেকেই বোঝা যায়, প্রয়োজনের সময় পিতা-মাতার সেবা করা নফল জিহাদের চেয়েও অগ্রাধিকারযোগ্য।

মায়ের অধিকার সর্বাধিক
এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন: আমার সদ্ব্যবহারের সবচেয়ে বেশি অধিকারী কে?

তিনি বললেন: তোমার মা। লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করল: তারপর কে? তিনি বললেন: তোমার মা।

তৃতীয়বারও একই উত্তর দিলেন: তোমার মা।”

চতুর্থবার বললেন: তোমার পিতা। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পিতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি। (তিরমিজি)

অতএব পিতা-মাতাকে কষ্ট দেওয়া মানে নিজের জন্য আল্লাহর অসন্তুষ্টি ডেকে আনা।

পিতা-মাতার দোয়া ও বদদোয়ার গুরুত্ব

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: তিনটি দোয়া অবশ্যই কবুল হয়: পিতা-মাতার দোয়া, মুসাফিরের দোয়া এবং মজলুমের দোয়া। (আবু দাউদ)

তাই সন্তানের উচিত এমন কোনো আচরণ না করা, যাতে পিতা-মাতার অন্তর থেকে কষ্টের দীর্ঘশ্বাস বা বদদোয়া বের হয়ে আসে।

সন্তান: পিতা-মাতার সর্বোত্তম উপার্জন

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: তোমাদের সন্তানরা তোমাদের সর্বোত্তম উপার্জনের অন্তর্ভুক্ত। (আবু দাউদ, তিরমিজি)

অর্থাৎ সন্তান শুধু পারিবারিক সদস্য নয়; সে পিতা-মাতার শ্রম, ভালোবাসা, ত্যাগ ও জীবনের ফসল।

আজকের সমাজের জন্য শিক্ষা
মিরপুরের বৃদ্ধা মায়ের করুণ মৃত্যু আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন রেখে গেছে।

আমরা কি সন্তানদের শুধু ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আমলা, শিক্ষক বা ব্যবসায়ী বানাতে চাই?

নাকি এমন মানুষ বানাতে চাই, যারা বৃদ্ধ মা-বাবার হাত ধরে রাখবে, তাঁদের খোঁজ নেবে, তাঁদের নিঃসঙ্গ মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে না?

সমাজে প্রতিষ্ঠা, বড় পদ কিংবা উচ্চশিক্ষা কোনো মানুষের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করে না। একজন মানুষ কতটা মানবিক, দায়িত্বশীল এবং কৃতজ্ঞ, সেটিই তার প্রকৃত পরিচয়।

জেনারেল শিক্ষা মানুষকে জীবিকা অর্জনের পথ দেখায়, আর ইসলামী শিক্ষা মানুষকে সৎ, নৈতিক ও দায়িত্বশীল মানুষ হতে শেখায়। সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন এই দুই শিক্ষার সমন্বয় ঘটবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, ডিগ্রি অর্জনই শিক্ষার শেষ কথা নয়। মানবিকতা, দায়িত্ববোধ, কৃতজ্ঞতা এবং পিতা-মাতার প্রতি ভালোবাসাই শিক্ষার প্রকৃত সফলতা।

যে শিক্ষা মানুষের হৃদয়ে মমতা জাগায় না, যে শিক্ষা বৃদ্ধ মা-বাবার পাশে দাঁড়াতে শেখায় না, যে শিক্ষা কৃতজ্ঞতা সৃষ্টি করে না, সেই শিক্ষা কখনো পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা হতে পারে না।

আজ আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন উচ্চশিক্ষিত মানুষ নয়, প্রকৃত মানুষ।


আবদুল আহাদ সালমান
সম্পাদক : ইউরোবাংলা

Home R3