২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

২৬ বছর ধরে বিনা টাকায় খতম তারাবিহ পড়ান “মাহফুজ হুজুর”

কিশোরগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্র পুরান থানা এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘শহীদি মসজিদ’ জেলার কেন্দ্রীয় মসজিদ হিসেবে পরিচিত। একসময় এটি পুরান থানা মসজিদ নামে পরিচিত ছিল। ১৯৪২ সালের ২৪ অক্টোবর ব্রিটিশ সেনাদের অতর্কিত হামলা ও গুলিবর্ষণে মসজিদের ভেতরে পাঁচ মুসল্লি শহীদ হন। এরপরই মসজিদের নাম হয় ‘শহীদি মসজিদ’। এখনো মসজিদের তিনটি পিলারে সেই গুলির চিহ্ন ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে।

শহীদি মসজিদে ২৬ বছর ধরে বিনা পারিশ্রমিকে খতম তারাবিহ পড়াচ্ছেন ৫৬ বছর বয়সী হাফেজ মাওলানা মাহফুজুর রহমান।

স্থানীয়ভাবে “মাহফুজ হুজুর” নামে পরিচিত। অবশ্য এই মসজিদে একাধারে ৪২ বছর খতম তারাবিহ পড়িয়ে নজির সৃষ্টি করেছিলেন মাওলানা আজহার আলী আনোয়ার শাহ।

মাহফুজুর রহমান ১৯৯৩ সাল থেকে আনোয়ার শাহের পেছনে শ্রবণকারী হিসেবে দ্বিতীয় ইমামের দায়িত্ব পালন করেন। আর ২০০১ সাল থেকে তিনি খতম তারাবিহর নামাজ পড়ান। বর্তমানে মাওলানা মাহফুজুর ছাড়াও হাফেজ মাহমুদুল হাসান, হাফেজ মোহাম্মদ সফিউল্লাহ ও হাফেজ আতহার রাসেল খতম তারাবিহ পড়ান।

মাহফুজুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, মসজিদ–সংলগ্ন আল জামিয়াতুল ইমদাদিয়া হিফজুল কুরআন বিভাগ থেকে ১৯৮২ সালে মাত্র এক বছরে পবিত্র কুরআন মুখস্থ করি। তখন বয়স ছিল ১২ বছর। ১৯৯৩ সালে শহীদি মসজিদে আল্লামা হাফেজ মাওলানা আনোয়ার শাহের পেছনে সাধারণ মুসল্লি হিসেবে তারাবিহর নামাজ পড়ছিলাম। একদিন পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের সময় ইমামের দৃষ্টিগোচরের জন্য আমি লোকমা (ভুল ধরিয়ে দেওয়া) দেই।

নামাজ শেষে ইমাম আনোয়ার শাহ বলেন, ‘কে লোকমা দিয়েছিল?’ আমি দাঁড়াতেই উনি (আনোয়ার শাহ) মোয়াজ্জিনকে ডেকে বললেন, একটি জায়নামাজ এনে আমার পেছনে দাও। আজ থেকে আমার পেছনে তুমি নামাজে দাঁড়াবে এবং তেলাওয়াত শ্রবণকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। এভাবেই দায়িত্ব পাই। এরপর আট বছর হুজুরের পেছনে শ্রবণকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। ২০০১ সালে তারাবিহর নামাজ পড়ানো শুরু করি।

তিনি আরও বলেন, আল্লাহর বিশেষ নিয়ামতে, ওস্তাদদের নেক দোয়ায় ও মুসল্লিদের ভালোবাসায় এত বছর সুস্থ থেকে একই মসজিদে টানা তারাবিহর নামাজ পড়ানোর সৌভাগ্য অর্জন করতে পেরেছি। তারাবিহ পড়াতে গিয়ে অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। অনেক বড় বড় আলেম ও সরকারি কর্মকর্তা এখানে নামাজ পড়েন।

“আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করে, এ মসজিদে আমি দুই প্রজন্মকে তিলাওয়াত শোনাতে পেরেছি। আমার কোনো চাওয়া–পাওয়া নেই। যত দিন সুস্থ থাকব, পবিত্র কোরআনের খেদমতের মাধ্যমেই মসজিদে বাকি জীবন অতিবাহিত করতে চাই।”

মসজিদটিতে নিয়মিত নামাজ পড়েন হাবিবুর রহমান। সেই মুসল্লি বলেন, বেশ কয়েক বছর ধরে শহীদি মসজিদে নিয়মিত তারাবিহ পড়ছি। আমার সঙ্গে এখন আমার ছেলেও নিয়মিত এই মসজিদে তারাবিহ পড়ে। হাফেজ মাহফুজুর রহমানের পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত অনেক শ্রুতিমধুর এবং তিনি প্রতিটি হরফের স্পষ্ট উচ্চারণের পাশাপাশি নিখুঁত তিলাওয়াত করেন। তার তিলাওয়াত শুনতে অনেক ভালো লাগে।

মাহফুজুর রহমান কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের চর শোলাকিয়া এলাকার মৃত মফিজ উদ্দিনের ছেলে। তিনি এক মেয়ে ও দুই ছেলের জনক। তার দুই ছেলে হুজাইফা ও মুয়াজ পবিত্র কোরআনের হাফেজ। মাহফুজুর দাওরায়ে হাদিস পাস করার পাশাপাশি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ে স্নাতকোত্তর করেছেন। তিনি মিফতাহুল উলুম মহিলা মাদ্রাসার পরিচালক।

শহীদি মসজিদের মুতাওয়াল্লি ও আল জামিয়াতুল ইমদাদিয়া মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা শাব্বির আহমাদ বলেন, শহীদি মসজিদ হলো কিশোরগঞ্জ জেলার কেন্দ্রীয় মসজিদ। এখানে তারাবিহ ও জুমার নামাজ আদায়ের জন্য আশপাশসহ দূর-দূরান্ত থেকে প্রায় ১০ হাজার মুসল্লির সমাগম ঘটে। এখানে হাফেজ মাহফুজুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে তারাবিহর নামাজ পড়াচ্ছেন। তার শ্রুতিমধুর ও সুন্দর তিলাওয়াতে সবাই মুগ্ধ। যত দিন তিনি নামাজ পড়াতে সক্ষম হবেন, ততদিন এখানেই নামাজ পড়াবেন। এটাই মসজিদ কমিটিসহ সব মুসল্লির চাওয়া।

বর্তমানে মসজিদে হাফেজ মাহফুজুর ছাড়াও আরও তিনজন হাফেজ খতম তারাবিহ পড়ান। এর বিনিময়ে তারা কোনো বেতন নেন না। কমিটি দিতে চাইলেও তারা নিতে রাজি নন। বলা চলে বিনা পয়সায় তারা তারাবিহর ইমামতি করেন।