দেশের সর্ববৃহৎ এবং অন্যতম প্রাচীন কওমি মাদরাসা ‘আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী’র ৪ শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। মাদরাসার অভ্যন্তরে ‘টিকটক’ ভিডিও তৈরির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় কর্তৃপক্ষ।
বুধবার (৮ জুলাই) জোহরের নামাজের পর মাদরাসার বড় মসজিদে উপস্থিত ছাত্রদের সামনে এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন হাটহাজারী মাদরাসার সিনিয়র মুহাদ্দিস মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরী।
তিনি জানান, মাদরাসায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য স্মার্টফোন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। শুধুমাত্র আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত যোগাযোগের জন্য ‘বাটন ফোন’ ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে। এই নিয়মের মধ্যে মাদরাসার অভ্যন্তরে টিকটক করার মতো ঘটনা মারাত্মক অন্যায় ও শৃঙ্খলাভঙ্গ।
মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরী আরও জানান, দায়িত্বরত কয়েকজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের এই টিকটক কাণ্ড শনাক্ত করেন। এর আগেও এ ধরনের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের বারবার সতর্ক করা হয়েছিল। মূলত টিকটক ছাড়াও তাদের বিরুদ্ধে আরও কিছু শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ ছিল, যার পরিপ্রেক্ষিতে যৌথভাবে এই বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত আসে। যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওই বৈঠকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত ছিলেন না, তবে মাদরাসার শৃঙ্খলা ও ভাবমূর্তি রক্ষায় এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন এই সিনিয়র শিক্ষক।
একই সাথে তিনি হুঁশিয়ারি দেন, এ ধরনের অপকর্মে জড়িত কাউকে ভবিষ্যতে ধরা পড়লে তাকেও কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে।
এদিকে বহিষ্কৃতদের টিকটক কাণ্ডের বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন হাটহাজারী মাদরাসার সাবেক শিক্ষার্থী মাওলানা তরিকুল ইসলাম। গত বছর এই প্রতিষ্ঠান থেকে দাওরায়ে হাদিস শেষ করা তরিকুল বর্তমানে পার্শ্ববর্তী একটি মাদরাসায় উচ্চতর ইসলামি আইন (ইফতা) পড়ছেন। তিনি ‘ফেস দ্য পিপল’-কে বলেন, যাদের বহিষ্কার করা হয়েছে, তারা দীর্ঘদিন ধরেই মাদরাসার ভেতরে কখনো ক্লাসরুমে, কখনো ছাদে, মাঠে, এমনকি মসজিদের মতো পবিত্র জায়গাতেও টিকটক ভিডিও তৈরি করে আসছিল; যা মাদরাসার ঐতিহ্য ও স্বনাম নষ্ট করছিল। আমি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে তাদের একাধিকবার সতর্ক করেছিলাম।
তিনি আরও জানান, আজ মাদরাসার বড় মসজিদে সাধারণ ছাত্রদের উদ্দেশ্যেও এ বিষয়ে সতর্কতামূলক বক্তব্য দেওয়া হয়েছিল। টিকটক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে যুক্ত আরও কিছু ছাত্রের তালিকা বর্তমানে কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে রয়েছে এবং তাদের শনাক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।
এদিকে হাটহাজারী মাদরাসা কর্তৃপক্ষের এই কঠোর সিদ্ধান্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসার পর থেকেই এটি নিয়ে ব্যাপক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছ। ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে মাদরাসার অসংখ্য সাবেক শিক্ষার্থী এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন।
অনেকেই লিখেছেন, ঐতিহ্যবাহী এই ইলমি কাননের শৃঙ্খলা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ধরে রাখতে এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কোনো বিকল্প ছিল না। সাধারণ শিক্ষার্থী, আলেম সমাজ ও অভিভাবক মহলও কর্তৃপক্ষের এই অবস্থানকে সাধুবাদ জানাতেও দেখা গেছে।