১৩ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

পহেলা বৈশাখ: উদযাপন নাকি আত্মসমালোচনার সময়?

বাংলা বর্ষপঞ্জির সূচনা বৈশাখ মাস দিয়ে, আর ইংরেজি বর্ষপঞ্জি শুরু হয় জানুয়ারি মাসে। আমাদের সমাজে এই দুই বর্ষপঞ্জিই সমান্তরালভাবে ব্যবহৃত হয়। ফলে পয়লা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ এবং ৩১ ডিসেম্বর রাতে ইংরেজি নববর্ষ উদযাপনের মাধ্যমে আমাদের জীবনধারায় এক ধরনের মিশ্র সাংস্কৃতিক প্রবাহ লক্ষ্য করা যায়।

অন্যদিকে, আরবী বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম হলেও পয়লা মহররমকে কেন্দ্র করে কোনো নববর্ষ উদযাপনের প্রচলন নেই। এখান থেকেই প্রশ্ন ওঠে-নববর্ষ উদযাপন কি আমাদের নিজস্ব চেতনার অংশ, নাকি এটি বাইরের সংস্কৃতি থেকে আগত?

ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে প্রথমেই আসে উৎসবের ধারণা।

ইসলামে উৎসবের সীমা ও ধারণা :

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে মানুষের জীবনযাত্রার প্রতিটি দিক সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত। উৎসবও এর ব্যতিক্রম নয়। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, “প্রত্যেক জাতিরই উৎসব আছে, আর এটি (ঈদ) আমাদের উৎসব।” (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

এই ভিত্তিতে ইসলামে স্বীকৃত উৎসব মাত্র দুটি-ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। সুতরাং মুসলমানদের জন্য নতুন কোনো উৎসব উদ্ভাবন বা অন্য সংস্কৃতি থেকে উৎসব গ্রহণের বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

একজন মুমিনের কাছে প্রতিটি দিনই তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতিটি ভোর আল্লাহর পক্ষ থেকে নতুন সুযোগ হিসেবে আসে শোকর আদায়ের, নিজেকে সংশোধনের এবং আখিরাতের প্রস্তুতির। এই দৃষ্টিতে একটি নির্দিষ্ট দিনকে কেন্দ্র করে আনন্দ-উৎসব সীমাবদ্ধ না রেখে পুরো জীবনকেই ইবাদত ও সচেতনতার পথে পরিচালিত করাই ইসলামের শিক্ষা।

পহেলা বৈশাখের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট :

পহেলা বৈশাখের উৎপত্তি মূলত মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে, যখন কৃষি ও রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে বাংলা সন প্রবর্তন করা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি একটি সাংস্কৃতিক উৎসবে রূপ নেয় এবং এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিভিন্ন লোকজ আচার-মঙ্গল শোভাযাত্রা, গান-বাজনা, প্রতীকী উপস্থাপন ইত্যাদি।

এই উপাদানগুলোর অনেকগুলোই ভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কৃতির প্রভাব বহন করে, যা পরবর্তীতে উৎসবটির চরিত্রকে পরিবর্তিত করেছে।

ধর্মনিরপেক্ষতা ও পরিচয়ের প্রশ্ন :

বর্তমানে পয়লা বৈশাখকে প্রায়ই “সর্বজনীন বাঙালি উৎসব” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বলা হয়, এটি নাকি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার উৎসব। কখনো বলা হয়-মুসলমানের ঈদ, হিন্দুর পূজা, আর সবার জন্য পয়লা বৈশাখ।

এই ধারণার ভেতরে একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করে-ধর্মীয় পরিচয়কে পাশ কাটিয়ে জাতিগত পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া। কিন্তু ইসলামী দৃষ্টিতে একজন মুসলমানের প্রধান পরিচয় তার ঈমান ও আকীদা। ভাষা, ভূখণ্ড বা জাতিসত্তা তার প্রাকৃতিক পরিচয় হলেও আদর্শিক পরিচয় নয়।

কুরআনে বলা হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা পূর্ণাঙ্গভাবে ইসলামে প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না।” সূরা বাকারা ২:২০৮)

এ থেকে স্পষ্ট হয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনাই মুসলমানের জন্য চূড়ান্ত মানদণ্ড।

অনুকরণ (তাশাব্বুহ) ও সাংস্কৃতিক প্রভাব

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো জাতির অনুকরণ করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।” (আবু দাউদ)

পহেলা বৈশাখের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে অমুসলিম সংস্কৃতির প্রভাব স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। তাই এসব কার্যক্রমে অন্ধভাবে অংশগ্রহণ করা একজন মুসলিমের জন্য চিন্তার বিষয়।

‘শেকড় সন্ধান’—কোন শেকড়?

পহেলা বৈশাখকে অনেক সময় “শেকড়ে ফিরে যাওয়ার উৎসব” বলা হয়। কিন্তু এই ‘শেকড়’ আসলে কী নির্দেশ করে? শোভাযাত্রা, মুখোশ, প্রতীকী উপস্থাপন-এসবের ঐতিহাসিক উৎস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর অনেক উপাদান ইসলামী ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

একজন মুমিনের জন্য সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নির্ধারণের মাপকাঠি হলো কুরআন ও সুন্নাহ। রাসূল (সা.) বলেছেন, ঈমানের স্বাদ লাভের অন্যতম শর্ত হলো-আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সর্বাধিক ভালোবাসা এবং কুফরের দিকে ফিরে যাওয়াকে ভয় করা (সহীহ বুখারি, মুসলিম)।

কুরআনের দৃষ্টিতে সংস্কৃতি গ্রহণ :

আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না।” (সূরা আল-বাকারা: ৪২)

অতএব, কোনো সংস্কৃতির মধ্যে যদি এমন উপাদান থাকে যা ইসলামের আকীদা, নৈতিকতা বা মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তবে তা পরিহার করাই একজন মুসলমানের কর্তব্য।

অপসংস্কৃতি ও বাস্তবতা :

বর্তমান সময়ে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে-বেপর্দা পরিবেশ, অবাধ মেলামেশা, গান-বাজনা, অশালীনতা, অপচয় ও প্রদর্শন।

এসব বিষয় ইসলামের শালীনতা, সংযম ও তাকওয়ার শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কুরআনে অতীত জাতিগুলোর উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে:

“শয়তান তাদের কর্মকে তাদের কাছে শোভনীয় করে তুলেছিল এবং তাদের সৎপথ থেকে বিরত রেখেছিল, অথচ তারা ছিল জ্ঞানসম্পন্ন।” (সূরা আনকাবূত ২৯:৩৮)

এই আয়াত বর্তমান সমাজের জন্যও একটি গভীর সতর্কবার্তা বহন করে।

মুসলিম পরিচয়ের স্বাতন্ত্র্য :

ইসলাম মুসলমানদের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে-আকীদা, ইবাদত, সংস্কৃতি ও জীবনব্যবস্থায়। আল্লাহ বলেন:

“নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য ধর্ম একমাত্র ইসলাম।” (সূরা আলে ইমরান: ১৯)

সুতরাং একজন মুসলমানের দায়িত্ব হলো নিজের এই স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখা এবং অন্য সংস্কৃতির অন্ধ অনুসরণ থেকে বিরত থাকা।

পহেলা বৈশাখ নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক দিবস। তবে এটি ইসলামী উৎসব নয়-এ বিষয়টি কুরআন ও হাদীসের আলোকে স্পষ্ট। তাই একজন সচেতন মুসলিমের উচিত এই দিবসের কার্যক্রমগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখা এবং যা ইসলামের আকীদা ও মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তা থেকে বিরত থাকা।

তবে একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে, কোনো সাংস্কৃতিক বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থান গ্রহণের আগে তার উপাদানগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি। ইসলামের সীমার মধ্যে থেকে সংস্কৃতির গ্রহণযোগ্য অংশ চর্চা করাই হতে পারে একজন মুমিনের ভারসাম্যপূর্ণ পথ।