পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের পুরনো পাথরের রাস্তাগুলো যখন গ্রীষ্মের রোদে ঝলমল করে ওঠে, তখন বাতাসে ভেসে আসে কয়লার আগুনে পোড়া সার্ডিন মাছের সুগন্ধ। আর সেই ঘ্রাণই জানিয়ে দেয়, শুরু হয়েছে পর্তুগালের অন্যতম জনপ্রিয় উৎসব ‘ফেস্তা দা সার্ডিনহা’ বা সার্ডিন উৎসব।
প্রতি বছর ১২ জুন রাতে সেন্ট অ্যান্থনির দিবসকে কেন্দ্র করে এই উৎসবের সূচনা হয়। খ্রিস্টধর্মের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সম্মানিত ধর্মগুরুদের একজন হলেন সেন্ট অ্যান্থনি। সার্ডিন উৎসব ধর্মীয় ঐতিহ্য থেকে শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে এটি পরিণত হয়েছে পর্তুগিজ সংস্কৃতি, খাবার ও আনন্দ-উৎসবের এক বিশাল মিলনমেলায়।
এই উৎসবের প্রধান আকর্ষণ সার্ডিন মাছ। একসময় সাধারণ মানুষের খাবার হিসেবে পরিচিত এই মাছ এখন পর্তুগালের সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। উৎসব চলাকালে শহরের বিভিন্ন সড়কে খোলা আগুনে গ্রিল করা সার্ডিন বিক্রি করা হয়। শুধু খাবারেই নয়, পতাকা, দেয়ালচিত্র এবং নানা শিল্পকর্মেও দেখা যায় সার্ডিনের উপস্থিতি।
লিসবনের আলফামা, মোরারিয়া, গ্রাসা ও বিকা এলাকার অলিগলিতে সার্ডিন উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়রা নিজেদের বাড়ির সামনে অস্থায়ী বারবিকিউ বসিয়ে অতিথিদের পরিবেশন করেন তাজা গ্রিল করা সার্ডিন। সঙ্গে থাকে ঐতিহ্যবাহী পর্তুগিজ খাবার, যেমন বিফানা স্যান্ডউইচ, কালদো ভার্দে স্যুপ এবং বিভিন্ন পানীয়।
সূর্য ডোবার পর উৎসব পৌঁছে যায় চরম উচ্ছ্বাসে। রাজধানীর বিখ্যাত অ্যাভেনিদা দা লিবারদাদে অনুষ্ঠিত হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। রঙিন পোশাকে সজ্জিত নৃত্যশিল্পীরা সংগীতের তালে তালে পরিবেশন করেন মনোমুগ্ধকর নৃত্য। লোকসংগীত থেকে শুরু করে জনপ্রিয় পিম্বা সুরে মুখর হয়ে ওঠে পুরো শহর।
তবে উৎসবের আরেকটি বিশেষ দিক হলো ভালোবাসা ও বিয়ের ঐতিহ্য। সেন্ট অ্যান্থনিকে বিবাহের পৃষ্ঠপোষক ধর্মগুরু হিসেবেও মানা হয়। তাই উৎসব উপলক্ষে প্রতি বছর একসঙ্গে একাধিক যুগলের গণবিবাহের আয়োজন করা হয়, যা উৎসবে যোগ করে ভিন্ন মাত্রা।
এ সময় প্রেমিক-প্রেমিকাদের মধ্যে ছোট টবে লাগানো তুলসী গাছ উপহার দেওয়ারও একটি প্রচলিত রীতি রয়েছে। ভালোবাসা ও সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে এই উপহার বিনিময় করা হয়।
শুধু একটি খাবারের উৎসব নয়, ফেস্তা দা সার্ডিনহা আসলে পর্তুগিজ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক বন্ধনের এক প্রাণবন্ত উদযাপন। সার্ডিনের স্বাদ, সংগীতের মূর্ছনা আর মানুষের মিলনমেলায় প্রতি বছর লাখো পর্যটক ও স্থানীয় মানুষ একসঙ্গে অংশ নেন এই অনন্য উৎসবে।
গ্রিল করা সার্ডিনের ধোঁয়া হয়তো একসময় মিলিয়ে যায়, কিন্তু উৎসবের স্মৃতি থেকে যায় অংশগ্রহণকারীদের হৃদয়ে বহুদিন ধরে।