৪ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

নবী মুসা (আঃ) ও বনী ইসরাইল

আবু নাঈম মু শহীদুল্লাহ্


মিশর ত্যাগ করে মাদইয়ানে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই হযরত মূসা (আঃ)-এর জীবনে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। সেখানে তিনি শুধু নিরাপদ আশ্রয়ই পাননি, পেয়েছিলেন একজন প্রাজ্ঞ অভিভাবক ও পরামর্শক নিজের শ্বশুর, আল্লাহর নবী হযরত শু‘আইব(আঃ)-কে।

হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত শু‘আইব (আঃ)-এর মধ্যে একটি স্পষ্ট ও মর্যাদাপূর্ণ চুক্তি সম্পন্ন হয়। শু‘আইব (আঃ) তাঁর দুই কন্যার একজনকে মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে বিবাহ দিতে চাইলেন এই শর্তে যে, মূসা (আঃ) তাঁর পশুপাল আট বছর চরাবেন। আর যদি তিনি স্বেচ্ছায় দশ বছর পূর্ণ করেন, তবে সেটি হবে তাঁর পক্ষ থেকে অতিরিক্ত সদাচরণ। শু‘আইব (আঃ) আশ্বাস দেন-তিনি তাঁর উপর কোনো কঠোরতা আরোপ করবেন না।

কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি চাই আমার এই দুই কন্যার একজনকে তোমার সঙ্গে বিবাহ দিতে, এই শর্তে যে তুমি আমার কাছে আট বছর কাজ করবে। আর যদি দশ বছর পূর্ণ কর, তবে তা তোমার পক্ষ থেকে অনুগ্রহ।(সূরা কাসাস: ২৭)

অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, হযরত মূসা (আঃ) পূর্ণ দশ বছরই সম্পন্ন করেন। চুক্তির সময় শেষ হলে তিনি পরিবার নিয়ে মাদইয়ান থেকে বিদায় নেন। পথিমধ্যে তূর পাহাড়ের দিকে এক অদ্ভুত আগুনের আলো দেখতে পান। সেই আগুনের দিকে অগ্রসর হতেই এক মহিমান্বিত আহ্বান তাঁকে থামিয়ে দেয়; হে মূসা! নিশ্চয়ই আমি তোমার প্রতিপালক। তোমার জুতা খুলে ফেলো। তুমি পবিত্র উপত্যকা ‘তুয়া’-তে অবস্থান করছ। (সূরা ত্ব-হা: ১২)

সেই পবিত্র মুহূর্তেই আল্লাহ তাআলা তাঁকে নবুয়তের মহান দায়িত্বে ভূষিত করেন এবং বলেন, নিশ্চয়ই আমি আল্লাহ। আমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। অতএব আমার ইবাদত করো এবং আমার স্মরণের জন্য সালাত কায়েম করো।(সূরা ত্ব-হা: ১৪)

এরপর তাঁকে দেওয়া হয় এক কঠিন কিন্তু মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব—ফিরআউনের কাছে যাও, সে সীমালঙ্ঘন করেছে। (সূরা ত্ব-হা: ২৪)

নবুয়তের প্রমাণস্বরূপ আল্লাহ তাঁকে মহান মুজিযাসমূহ দান করেন।
১। লাঠি, যা প্রয়োজনে জীবন্ত সাপে পরিণত হতো
২। হাত, যা বের করলে উজ্জ্বল আলো বিচ্ছুরিত করত
৩। পরবর্তীতে লাল সাগর বিভক্ত হওয়া
৪। পাথর থেকে পানি নির্গত হওয়া
৫। বনী ইসরাঈলের জন্য মান্না ও সালওয়ার ব্যবস্থা ইত্যাদি।

নিজের কথাবার্তায় জড়তা অনুভব করে হযরত মূসা (আঃ) বিনীতভাবে দোয়া করেন, হে আমার রব! আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দাও, আমার ভাই হারুনকে আমার সহকারী করে দাও।

আল্লাহ তাআলা তাঁর দোয়া কবুল করেন এবং হযরত হারুন (আঃ)-কেও নবুয়তের মর্যাদায় ভূষিত করেন।

নবীদ্বয় আল্লাহর আদেশ বুকে ধারণ করে হযরত মূসা (আ.) তাঁর ভাই হযরত হারূন (আ.)-কে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে গেলেন সেই দরবারে—যেখানে বসে আছে এক অহংকারী শাসক, যে নিজেকে বলে, আমি তোমাদের সর্বোচ্চ প্রভু। সে শুধু এক রাজা ছিল না—সে ছিল জুলুমের প্রতীক, বনী ইসরাঈলের কান্না আর রক্তের ইতিহাস।
আল্লাহ মূসা (আ.)-কে বলেছিলেন, নরম কথা বলো, হয়তো তার হৃদয় কেঁপে উঠবে।

কত আশ্চর্য এই দাওয়াত! যে মানুষ নিজেকে খোদা বলে, তার সামনে দাঁড়িয়ে এক নবী বলছেন কোমল কণ্ঠে—আপনি কি পরিশুদ্ধ হতে চান? আপনি কি চান আমি আপনাকে আপনার প্রতিপালকের পথে পথ দেখাই? এই নির্যাতিত মানুষগুলোকে মুক্ত করে দিন।

কঠিন হৃদয়ের সামনে কত মধুর আহ্বান!তারপরও আল্লাহর নিদর্শন প্রকাশ পেল, লাঠি নিক্ষিপ্ত হলো, আর তা জীবন্ত সাপে পরিণত হলো। হাত বের করলেন, অন্ধকার দরবার আলোয় ভরে গেল। কিন্তু অহংকারের চোখ কি আলো দেখে? ফিরআউন সত্য অস্বীকার করল। নবীকে বলল জাদুকর। দরবারে জাদুকর ডেকে এনে সত্যের বিরুদ্ধে নাটক সাজাল।আর যে জাতি আগে কাঁদত,তাদের উপর জুলুম আরও বাড়িয়ে দিল।হ্যাঁ, জাদুকরদের হৃদয় ভেঙে গিয়েছিল, তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়েছিল।

মুসা (আঃ) এর মুযেজা দেখে জাদুকররা যখন আত্মসমর্পণ করেন এ দৃশ্য ফেরআউনের সিংহাসন কাঁপিয়ে দিয়েছিল, আর কাঁপা সিংহাসনের প্রথম প্রতিশোধ নেমে এলো নির্যাতিত বনী ইসরাঈলের উপর।

ফিরআউন চিৎকার করে উঠল,আমি মূসার প্রতি ঈমান আনার আগেই তোমরা ঈমান আনলে? তার শাস্তি ভোগ কর।সে হুকুম দিল শিশুদের হত্যা করো, পুরুষদের কঠোর শ্রমে পিষে ফেলো, নারীদের বাঁচিয়ে রাখো দাসী করে!মূসা ও হারূন (আ.) দেখলেন,যাদের মুক্তির কথা বলতে এসেছিলেন, তাদের পিঠে বাড়ছে চাবুকের দাগ। মায়ের কোল খালি হচ্ছে, শ্রমের মাঠ রক্তে ভিজছে, আর আরশের দিকে উঠছে অসংখ্য দীর্ঘশ্বাস।

নবীদের বিরুদ্ধে ফিরআউনের হাত উঠেনি শুধু,সে আঘাত করেছিল তাদের উম্মতের ওপর, কারণ সে জানত, নবীকে কষ্ট দিতে চাইলে উম্মতকে রক্তাক্ত করতে হয়। হযরত মূসা (আ.) তখন অসহায় কণ্ঠে বলেছিলেন, তোমরা আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও, ধৈর্য ধরো। নিশ্চয়ই পরিণাম মুত্তাকীদের জন্য। চাবুক চলছিল, কিন্তু দাওয়াত থামেনি।
কারাগার ভরছিল, কিন্তু তাওহীদের আওয়াজ থামেনি। শিশুর লাশ পড়ছিল, কিন্তু নবীদের চোখে আশার আলো নিভেনি। কারণ তারা জানতেন ফিরআউনের সিংহাসনের চেয়ে আল্লাহর ওয়াদা অনেক বেশি শক্তিশালী।

অগ্নি পরিক্ষার মুখোমুখি উম্মতে মুসা (আঃ), যারা হযরতে মুসা আঃ এর দাওয়াতে দ্বীন গ্রহণ করেছিলেন তাদের উপর নেমে এলো চরম নির্যাতন। ফেরাউনের নিষ্ঠুর নির্যাতন থেকে বাদ যায়নি কোমলমতি শিশুরাও। শিশুদের কি অপরাধ ছিল? তারা তো কোনো সিংহাসন চায়নি। তারা কোনো বিপ্লবের শ্লোগান দেয়নি।

তাদের ছোট ছোট ঠোঁট শুধু “রব্বি” বলতে শিখেছিল, আর সেই অপরাধেই তাদের উপর নেমে এসেছিল ফিরআউনের নিষ্ঠুরতা।মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছিল দুগ্ধপোষ্য শিশুকে। কোমল আঙুল, যেগুলো খেলনা ধরার কথা, সেগুলো ছটফট করছিল বাতাসে।

একদিকে মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ, অন্যদিকে সৈন্যদের কঠিন হাসি।যে চোখে থাকার কথা ছিল ঘুম,সেই চোখে ভরে যাচ্ছিল ভয়।যে গলায় থাকার কথা ছিল মা ডাক সেই গলায় আটকে যাচ্ছিল নিঃশ্বাস।কোন অপরাধে? শুধু এই অপরাধে, যে তারা ঈমানদারের ঘরের শিশু। তারা এমন রবের বান্দা, যিনি ফিরআউন নন। কিন্তু আল্লাহর কাছে সেই শিশুদের কান্না বৃথা যায়নি। যে কান্নাকে ফিরআউন ভয় পায়নি, সে কান্নাই একদিন সিংহাসন ডুবিয়ে দিয়েছিল। কারণ শহীদের রক্তের চেয়েও শিশুর অশ্রু আল্লাহর কাছে বেশি ভারী।

মিশরের আকাশ নীল ও পরিস্কার হলেও বনী ইসরাঈলদের জীবনে ছিল অন্ধকারাচ্ছান্ন। তারা ছিল সেই জাতি, যাদের ঘর ছিল,কিন্তু নিরাপত্তা ছিল না। সন্তান ছিল, কিন্তু ভবিষ্যৎ ছিল না। শ্বাস ছিল,কিন্তু স্বাধীনতা ছিল না। ফিরআউনের নগরীতে তারা মানুষ ছিল না,ছিল শ্রমের যন্ত্র। ইট টানত তারা, প্রাসাদ গড়ত তারা,কিন্তু সেই প্রাসাদের ছায়াতেই তাদের চাবুক পড়ত। সকালের সূর্য উঠত তাদের ঘুম ভাঙাতে নয়,তাদের কাঁধে বোঝা চাপাতে।সন্ধ্যার সূর্য ডুবত তাদের বিশ্রাম দিতে নয়, তাদের ক্ষত লুকাতে। আর সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল,যখন কোনো ঘরে শিশুর কান্না শোনা যেত,সেই কান্না সুখের হতো না,হতো বিদায়ের। সৈন্যরা আসত,মায়ের বুক থেকে ছিনিয়ে নিত সদ্যোজাত পুত্র শিশুকে। মায়েরা মাটিতে লুটিয়ে পড়ত,আর ফিরআউনের রাজত্বে আরেকটি শিশুর রক্ত যুক্ত হতো ইতিহাসে। ঈমানদারদের একমাত্র অপরাধ ছিল,তারা বলত: আমাদের রব আল্লাহ। যারা হত্যা থেকে বেঁচে যেত,তারা বাঁচত ধীরে ধীরে মরার জন্য।শিশুকাল থেকেই কাঁধে বোঝা,যৌবনে চাবুক,বার্ধক্যে অপমান।

নারীরা ছিল সবচেয়ে নীরব শহীদ।তাদের সন্তান কেড়ে নেওয়া হতো,তাদের চোখের সামনে তাদের স্বপ্ন মেরে ফেলা হতো,তারপর তাদেরকে সেই প্রাসাদে দাসী বানিয়ে রাখা হতো,যেখানে তাদের সন্তানের রক্ত শুকায়নি। নবী মুসা আঃ যখন আল্লাহর বার্তা নিয়ে এলেন, বনী ইসরাঈলরা ভেবেছিল, হয়তো আজ রাতে কান্না শেষ হবে।কিন্তু না ফিরআউন জুলুম আরো বাড়াল।চাবুক ভারী হলো,শিশু হত্যা বেড়ে গেল,কারাগার ভরতে লাগল। তখন মূসা (আ.) কাঁপা কণ্ঠে দৃঢ় বিশ্বাসে বলেছিলেন, তোমরা আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও, ধৈর্য ধরো। নিশ্চয়ই জমিন আল্লাহর, আর পরিণাম মুত্তাকীদের জন্য। তাদের চোখে তখনও অশ্রু ছিল,কিন্তু সেই অশ্রু আর হতাশার ছিল না ছিল দোয়ার। আর দোয়া কখনো মাটিতে পড়ে থাকে না। যে কান্না ফিরআউনের দরবার কাঁপাতে পারেনি,সে কান্নাই আসমান কাঁপিয়েছিল।আর আসমান যখন নড়ে, সিংহাসন টিকে না।

মিশরের রাণী হযরত আসিয়া (আ.)ও ফেরাউনের নির্যাতন থেকে রেহাই পাননি। যিনি ফিরআউনের প্রাসাদের সবচেয়ে সম্মানিত নারী। যার ইশারায় দাসী ছুটত, যার নামে নগর কাঁপত। মুসা আঃ এর দাওয়াতে তাঁর হৃদয় হেদায়েতের নুরে আলোকিত হয়, মনের সিংহাসনে একমাত্র প্রভু হিসেবে স্থান দিয়েছিলেন শুধু আল্লাহ রাব্বুল আলামিনকে। ঈমান আনাই ছিল তার অপরাধ। তিনি তার স্বামীকে “রব”মানতে অস্বীকার করেছিলেন।বলেছিলেন, “আমার রব আল্লাহ, যিনি মূসা (আ.)-এর রব।” এই কথাই ছিল ফিরআউনের কাছে সবচেয়ে বড় বিদ্রোহ।তার রাজত্ব সহ্য করত অনেক কিছু, কিন্তু সহ্য করত না—কেউ তার প্রভুত্ব অস্বীকার করুক। যেদিন প্রাসাদে ঘোষণা হয়ে গেল “আসিয়া তার রব বদলে ফেলেছে,”সেদিনই রাণীর মুকুট খুলে গেল, প্রাসাদের সকল রকমের আরাম আয়েশ ও সুবিধা নিষিদ্ধ করে নেওয়া হয়েছিল খোলা প্রান্তরে। তার নরম দেহ, যা কখনো রোদের আগুন দেখেনি, তা ফেলে দেওয়া হয়েছিল জ্বলন্ত বালুর উপর। হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছিল, আর বুকের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল ভারী পাথর! যাতে নিঃশ্বাসও ঈমানের সাক্ষ্য দেয়।

ফিরআউন কাছে এসে বলেছিল, “তুমি আমার রবত্ব মানো, আমি তোমাকে রাণী করে রাখব।” কিন্তু সেই রোদে পোড়া ঠোঁট থেকে বের হয়েছিল এমন দোয়া,যা আজও আসমানে লেখা আছে: “হে আমার রব, আপনার কাছে জান্নাতে আমার জন্য একটি ঘর বানিয়ে দিন,আর আমাকে ফিরআউন ও তার কাজ থেকে রক্ষা করুন।”(সূরা তাহরীম ৬৬:১১) রোদ তার দেহ পোড়াচ্ছিল,কিন্তু ঈমান তার আত্মা ঠান্ডা রাখছিল।পাথর তার বুক চেপে ধরেছিল,কিন্তু জান্নাত তার হৃদয় খুলে দিচ্ছিল। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে মহান আল্লাহ তাঁর সামনে জান্নাত উন্মুক্ত করে দেন। আসিয়া (আঃ) হেসে ওঠেন,আর সেই হাসির সাথেই দুনিয়ার সব যন্ত্রণা শেষ হয়ে যায়।

দাম্ভিক পাপিষ্ঠ ফেরাউন প্রায় দুই দশক বনী ইসরায়েলীদের উপর নির্যাতন করেছিলো। সে অহংকারে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল।ক্ষমতার নেশা তার চোখে এমন পর্দা টেনে দিয়েছিল,যা সরানো অসম্ভব। তাকে বারবার বলা হলো— আল্লাহর বান্দাদের ছেড়ে দাও।নিজের অহংকার ছেড়ে দাও।রবের কাছে ফিরে আসো। কিন্তু সে হাসল। সে ঠাট্টা করল। আর আল্লাহ তার রাজ্যের ওপর নামিয়ে দিলেন সতর্কতার একের পর এক নিদর্শন, যেন আসমান-যমীন একসাথে বলে দেয়; হে ফেরাউন! তুমি রব নও। বন্যা এলো নদী উপচে পড়ল,ক্ষেত ডুবে গেল, ফসল হারিয়ে গেল কাদার স্রোতে। যে রাজ্য প্রাচুর্যে ফুলে ছিল,তা ভিজে গেল অসহায়ত্বে।

পঙ্গপাল এলো,আকাশ কালো হয়ে গেল। যেদিকে চোখ যায়—শুধু ডানা আর দাঁত। মুহূর্তেই সবুজ পরিণত হলো শূন্যতায়। উকুন এলো,খাবারে, কাপড়ে, শরীরে,সিংহাসনেও বসে শান্তি রইল না। শরীরের চামড়ার ভেতরেও যেন শাস্তি ঢুকে পড়ল। ব্যাঙ এলো তাদের হাঁড়িতে, বিছানায়, থালায়, দরবারে,রাজপ্রাসাদ হয়ে উঠল আতঙ্কের জলাভূমি।রানীর বালিশেও লাফাতে লাগল ব্যাঙ।

পানি রক্তে রূপ নিল,নদীর পানি কলসের পানি সব লাল। তৃষ্ণা কণ্ঠ পুড়িয়ে দিতে লাগল।ভয় পুরো রাজ্য গ্রাস করল। যখন আযাব আসত ফেরাউন ভেঙে পড়ত। সে বলত,হে মূসা, তোমার রবকে ডাকো। এই আযাব উঠিয়ে নিলে আমরা ঈমান আনব। আমরা বনী ইসরাঈলকে ছেড়ে দেব। মূসা (আ.) দোয়া করতেন। আযাব সরে যেত,আর আযাব সরে যেতেই তার অন্তর আবার পাথর হয়ে যেত। তার মুখ আবার মিথ্যা বলত। তার চাবুক আবার উঠত নিরীহদের পিঠে। সে ঈমান আনেনি সে জুলুম ছাড়ে নি। কারণ তার সমস্যা ছিল প্রমাণের অভাব নয় তার সমস্যা ছিল অহংকার।সে সত্য বুঝত, কিন্তু মানতে চাইত না।কারণ মেনে নিলে সিংহাসন ছাড়তে হতো,নিজেকে রব বলা ছেড়ে দিতে হতো। আর সে তা চায়নি।

আর সে কারনে বনী ইসরায়েলদের উপর এমন নির্যাতন শুরু করলো মনে হলো সব দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। মিশরের জমিন তখন দমবন্ধ করা অন্ধকারে ঢাকা। বনী ইসরাঈলের ঘরে ঘরে কান্না, ভয়, দীর্ঘশ্বাস। চারদিকে পাহারা, গুপ্তচর, চাবুক আর হুমকি।পালানোর কোনো রাস্তা নেই,কথা বলার ভাষা নেই।

ঠিক সেই মুহূর্তে,যখন মানুষের সব দরজা বন্ধ,তখন খুলে গেল আকাশের দরজা। ওহী এলো মূসা (আ.)–এর হৃদয়ে:আমার বান্দাদের নিয়ে রাতে বের হয়ে যাও।(সূরা শু‘আরা ২৬:৫২) কোনো প্রস্তুত সেনাবাহিনী নয়।কোনো তরবারি নয়। কোনো বিদ্রোহের ঘোষণা নয়।শুধু আল্লাহর আদেশ।

রাত নামল, নীরব রাত, নীরব পা, কিন্তু উচ্চতম লক্ষ্য, নক্ষত্রেরা যেন নীরবে তাকিয়ে রইল মিশরের দিকে। ঘরের দরজা খুলল ধীরে ধীরে। কেউ কোলে শিশু,কেউ হাত ধরে বৃদ্ধ পিতাকে,কেউ চোখ মুছতে মুছতে বের হলো। কোনো ঢাকঢোল নেই,স্লোগান নেই।শুধু বালুর উপর নীরব পায়ের শব্দ। শুধু ঠোঁটে কাঁপতে থাকা দোয়া। শুধু বুকে জ্বলে ওঠা এক নাম,আল্লাহ।

মিছিল রওনা হলো,যাদের জন্ম হয়েছিল চাবুকের নিচে, আজ তারা বের হলো আল্লাহর পথে। পেছনে ফেরাউনের ভয়, সামনে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি পেছনে ছিল ফেরাউনের প্রাসাদ,তার সৈন্য,তার শৃঙ্খল, ও জীবননাশের হুমকি। আর সামনে কোনো স্পষ্ট রাস্তা নয়,কোনো মানচিত্র নয়। শুধু অজানা মরুভূমি। আর তার মাঝখানে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি: আমি তোমাদের সঙ্গে আছি। এই বিশ্বাস নিয়েই তারা হাঁটছিল।কারণ তারা জানত, এই যাত্রা মূসা (আ.)–এর পরিকল্পনা নয়,এটা আল্লাহর ডাকা পথ। তাদের সামনে সমুদ্র,পেছনে মৃত্যু তারপরও রাতের অন্ধকারে তারা চলেছিল। নিঃশব্দে। ভয়ে। আশায়। হঠাৎ ভোরের আলো ফুটতেই পিছনে দূর থেকে ধুলো উড়তে দেখা গেল। মাটির বুক কাঁপতে লাগল। লোহার ঘর্ষণের শব্দ, ঘোড়ার হ্রেষা, সৈন্যদের হাঁক। হ্যা ফেরাউন এসে গেছে বিশাল বাহিনী,তার ক্রুদ্ধ অহংকার আর প্রতিশোধের আগুন নিয়ে। বনি ইসরায়েলদের সামনে ছিল অথৈ সমুদ্র। কোনো নৌকা বা সেতু নেই। এই দৃশ্য দেখে বনী ইসরাঈলের অন্তর ভেঙে পড়ল। সামনে অজানা ভবিষ্যৎ পেছনে মৃত্যু। তারা চিৎকার করে বললো :আমরা তো ধরা পড়ে গেলাম!(সূরা শু‘আরা ২৬:৬১)

মূসা (আ.) বলিষ্ঠ কণ্ঠে বললেন “কখনোই না! নিশ্চয়ই আমার রব আমার সঙ্গে আছেন। তিনি অবশ্যই আমাকে পথ দেখাবেন। কোনো দৃশ্যমান পথ ছিল না। কিন্তু তার অন্তরে ছিল রবের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস। আসমানের আদেশ এলো: হে মুসা!তুমি তোমার লাঠি দিয়ে সমুদ্রে আঘাত করো। মূসা (আ.) কোন প্রশ্ন করেননি,হিসাব করেননি তিনি শুধু আদেশ পালন করলেন।লাঠি দিয়ে সমুদ্রে আঘাত করলেন। কুরআন এসেছে :অতঃপর সমুদ্র দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল, আর প্রত্যেক ভাগ বিশাল পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে গেল। (সূরা শু‘আরা ২৬:৬৩)

পানি সরে গেল,তলদেশ শুকিয়ে গেল। দুই পাশে পানি দাঁড়িয়ে রইল দেয়ালের মতো।মাঝখানে খুলে গেল এক অসম্ভব রাস্তা। যেখানে আগে ছিল মৃত্যু,সেখানে এখন আল্লাহ বানিয়ে দিলেন পথ। মূসা (আ.) আগে নামলেন তারপর একে একে নামতে লাগল সবাই। কেউ কাঁদছে,কেউ তাকিয়ে আছে উঁচু পানির দেয়ালের দিকে।কেউ সন্তানকে বুকে চেপে ধরে আছে। তারা হাঁটছে সেই পথে,যে পথ বানিয়েছে আল্লাহ নিজে। অহংকারে অন্ধ ফেরাউন প্রচণ্ড ক্রোধে ফেটে পড়ল।

নিজের বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে সে ছুটে চলল মূসা (আঃ)–এর পেছনে, যেন ক্ষমতার জোরেই আল্লাহর সিদ্ধান্তকে রুখে দেবে। কুরআনে এসেছে-অতঃপর ফেরাউন সৈন্যবাহিনীসহ তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল।(সূরা ইউনুস: ৯০)

ইতোমধ্যে আল্লাহ তাআলার কুদরতে সাগরের বুকে খুলে গেছে অলৌকিক পথ।মূসা (আঃ) ও বনী ইসরাঈল সেই শুকনো সমুদ্রপথ ধরে নিরাপদে পার হয়ে গেলেন। ফেরাউন এই বিস্ময়কর দৃশ্য দেখেও থামল না।

অহংকার তার চোখকে অন্ধ করে দিয়েছিল, বিবেককে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।সে ভাবল—যেভাবে ওরা পার হয়েছে, আমিও পার হব।সৈন্যসহ সে-ও নেমে পড়ল সমুদ্রের বুকে।কিন্তু যখন তারা পথের মাঝখানে; ঠিক তখনই আল্লাহ তাআলা সমুদ্রকে ফিরিয়ে দিলেন তার আগের রূপে।হঠাৎ গর্জে উঠল উত্তাল ঢেউ। পাহাড়সম জলরাশি আছড়ে পড়ল ফেরাউন ও তার বাহিনীর উপর। কুরআন বলে-অতঃপর আমি অন্যদের ডুবিয়ে দিলাম।(সূরা আশ-শু‘আরা: ৬৬)

ডুবে যাওয়ার শেষ মুহূর্তে, মৃত্যুর নিশ্চিত স্পর্শে, ফেরাউন চিৎকার করে বলল-আমি ঈমান আনলাম যে, বনী ইসরাঈল যার প্রতি ঈমান এনেছে, তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই।(সূরা ইউনুস: ৯০)

কিন্তু তখন আর সময় ছিল না। ঈমান আনার দরজা বন্ধ হয়ে গেছে।জবাব এলো আসমান থেকে:এখন? অথচ আগে তুমি অবাধ্যতা করেছিলে এবং ফাসাদকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে।” (সূরা ইউনুস: ৯১)

অহংকারের পাহাড় পানিতে ডুবে গেল,কিন্তু আল্লাহ তাআলা তার দেহকে সংরক্ষণ করলেন-যেন সে কেয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য এক জীবন্ত নিদর্শন হয়ে থাকে।
ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী,কিন্তু আল্লাহর সিদ্ধান্ত।

চলবে…

প্রথম পর্ব : ফারাওদের রাজত্ব ও মুসা (আ.)

লেখক : লেখক : বাংলাদেশ মানবাধিকার কাউন্সিলের স্থায়ী সদস্য