২১শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আর কত রামিসা হারালে আমাদের বিবেক জাগ্রত হবে?

আজ বুকটা খুব ভারী লাগে। কারণ এই দেশের প্রতিটি শিশুর মুখে আমি আমার নিজের সন্তানের মুখ দেখতে পাই। আমার ঘরেও ছোট্ট একটি মেয়ে আছে। তার বয়স মাত্র ছয় বছর। তার হাসি, তার ছোট ছোট আবদার, আর নির্ভর করে “বাবা” বলে ডাকার ভেতরেই আমার বেঁচে থাকার শক্তি লুকিয়ে আছে। আর ঠিক সেই কারণেই আজ বাংলাদেশের ছোট্ট শিশু রামিসার নির্মম ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা শুধু একটি সংবাদ নয়, এটি প্রতিটি বাবা-মায়ের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটানো এক ভয়াবহ বাস্তবতা।

একজন বাবা সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়েন তখন, যখন তিনি তাঁর সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন না। যে সমাজে একটি শিশুও নিরাপদ নয়, সেই সমাজ সভ্যতার দাবি করতে পারে না। রামিসার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের স্বপ্ন কেড়ে নেয়নি; এটি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ, নৈতিকতা এবং মানবিকতার গভীর সংকটকে নগ্ন করে দিয়েছে।

অপরাধীরা কেন বেপরোয়া হয়ে উঠছে :

প্রতিটি ধর্ষক, খুনি ও নরপিশাচ যদি অপরাধের পরপরই কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পেত, তাহলে তারা কখনো এতটা বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারত না। অপরাধীরা তখনই সাহস পায়, যখন তারা জানে বিচার দীর্ঘ হবে, আইনের ফাঁকফোকর থাকবে, রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব কাজে লাগানো যাবে, আর একসময় মানুষ ঘটনাটি ভুলেও যাবে।

কিন্তু একটি সন্তানের হারিয়ে যাওয়া কোনো বাবা-মায়ের কাছে কখনো “পুরোনো খবর” হয় না। তাদের প্রতিটি দিন কাটে এক অসহনীয় শূন্যতা নিয়ে। রামিসার মা-বাবার চোখের জল শুধু তাদের ব্যক্তিগত বেদনা নয়; এটি পুরো জাতির ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।

আজ প্রশ্ন জাগে, আমাদের সন্তানরা আর কতটা অসহায় হলে আমরা সত্যিকার অর্থে জেগে উঠব? আর কত রামিসা হারালে সমাজ অপরাধীদের বিরুদ্ধে নির্দয় হবে?

ইসলাম ধর্ষণ সম্পর্কে কী বলে :

ইসলাম মানব মর্যাদা, সম্ভ্রম ও নিরাপত্তাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। ব্যভিচারের চেয়েও ভয়ংকর অপরাধ হলো ধর্ষণ, কারণ এটি শুধু যৌন অপরাধ নয়; এটি ক্ষমতার অপব্যবহার, জুলুম ও মানবতার বিরুদ্ধে সহিংসতা।

হাদিসে এসেছে, হজরত সাঈদ ইবনে জায়েদ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

“সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে যে নিহত হয়েছে, সে শহিদ। জীবন রক্ষা করতে গিয়ে যে নিহত হয়েছে, সে শহিদ। দ্বীন রক্ষা করতে গিয়ে যে নিহত হয়েছে, সেও শহিদ। আর সম্ভ্রম রক্ষা করতে গিয়ে যে নিহত হয়েছে, সেও শহিদ।”
(আবু দাউদ, তিরমিজি)

এই হাদিস স্পষ্ট করে যে, নিজের সম্ভ্রম রক্ষার জন্য প্রতিরোধ করা ইসলামে বৈধ। এমনকি প্রতিরোধ করতে গিয়ে আক্রমণকারী নিহত হলেও তা অন্যায় নয়। কারণ ধর্ষণের শিকার ব্যক্তি ইসলামের দৃষ্টিতে অপরাধী নয়; সে মাজলুম বা অত্যাচারিত।

রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন:

“নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুলবশত করা অপরাধ, ভুলে যাওয়া কাজ এবং বল প্রয়োগকৃত বিষয় ক্ষমা করে দিয়েছেন।” (ইবনে মাজাহ)

অর্থাৎ জোরপূর্বক ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির কোনো পাপ নেই। বরং সমাজের দায়িত্ব হলো তাকে সহানুভূতি, নিরাপত্তা ও সম্মান দেওয়া। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের সমাজে অনেক সময় ধর্ষণের শিকার মানুষকেই বাঁকা চোখে দেখা হয়, কটূক্তি করা হয়, সামাজিকভাবে হেয় করা হয়। এটি চরম অমানবিকতা।

ইসলামে ধর্ষকের শাস্তি :

ইসলামে ধর্ষণের শাস্তি অত্যন্ত কঠোর। ফিকহবিদদের মতে, ধর্ষণ শুধু ব্যভিচার নয়; এটি বল প্রয়োগে সম্ভ্রম লুণ্ঠন ও সমাজে ত্রাস সৃষ্টি করার অপরাধ।

ইমাম আবু হানিফা, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মতে, ধর্ষকের ওপর ব্যভিচারের শাস্তি প্রযোজ্য হবে। অবিবাহিত হলে ১০০ বেত্রাঘাত, আর বিবাহিত হলে মৃত্যুদণ্ড।

ইমাম মালেক (রহ.) আরও কঠোর মত দিয়েছেন। তাঁর মতে, ধর্ষণ “মুহারাবা” বা সমাজে সন্ত্রাস ও নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টির শামিল। পবিত্র কোরআনে এ ধরনের অপরাধীদের জন্য হত্যা, শূলবিদ্ধ, অঙ্গচ্ছেদ কিংবা নির্বাসনের মতো কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে (সুরা মায়েদা: ৩৩)।

ইসলামের মূল উদ্দেশ্য প্রতিশোধ নয়; বরং এমন কঠোর শাস্তির ভয় দেখিয়ে সমাজকে অপরাধমুক্ত রাখা।

শিশু নির্যাতন: একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি :

আজ শুধু ধর্ষণ নয়, শিশুদের প্রতি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনও ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র-সব জায়গাতেই শিশুরা নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।

শিশুদের শারীরিক শাস্তি অনেক পরিবারে “শাসন” নামে বৈধতা পেয়ে গেছে। অথচ ইসলাম কখনো নির্যাতনকে অনুমোদন করে না। কোনো শিশুকে এমনভাবে আঘাত করা যাতে তার শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি হয়, তা শরিয়তের দৃষ্টিতে হারাম, জুলুম এবং কবিরা গুনাহ।

দুঃখজনকভাবে, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিশুদের শারীরিক শাস্তি দেওয়া হয়। শিক্ষকের দায়িত্ব শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠন করা, ভয় সৃষ্টি করা নয়। একজন শিক্ষক যদি ধৈর্যের শিক্ষা দিতে গিয়ে নিজেই সহিংস হয়ে ওঠেন, তাহলে শিশুরা শিক্ষা নয়, বরং সহিংস আচরণই শিখে নেয়।

পরিবার থেকেই শুরু হোক নিরাপত্তা :

নিজের ঘরই শিশুর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক শিশু পরিবারেই অবহেলা, মারধর ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। দারিদ্র্য, অশিক্ষা, মানসিক চাপ ও সামাজিক অবক্ষয় এই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।

শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। তারা আমাদের কথা থেকে যতটা শেখে, তার চেয়ে বেশি শেখে আমাদের আচরণ থেকে। তাই আমরা যদি সহিংসতা, রাগ, অশ্রদ্ধা ও অমানবিকতা চর্চা করি, তাহলে পরবর্তী প্রজন্মও সেটাই শিখবে।

জালিমকে থামানোও দায়িত্ব :

হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমরা তোমাদের ভাইকে সাহায্য করো, সে জালিম হোক বা মজলুম।” সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, “মজলুমকে সাহায্য করা বুঝলাম, জালিমকে কীভাবে সাহায্য করব?” তিনি বললেন, “জালিমকে জুলুম থেকে বিরত রাখবে, এটাই তাকে সাহায্য করা।” (বুখারি)

অর্থাৎ শুধু ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানোই যথেষ্ট নয়; অপরাধীকে থামানোও আমাদের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব।

আমাদের করণীয় :

শুধু আবেগ দিয়ে এই সংকটের সমাধান হবে না। প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় কঠোরতা, দ্রুত বিচার, সামাজিক সচেতনতা এবং নৈতিক পুনর্জাগরণ।

আমাদের করণীয় হতে পারে :

১। ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের দ্রুত এবং দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা।
২। শিশু সুরক্ষা আইন কার্যকরভাবে কঠোরভাবে প্রয়োগ করা।
৩। জনসম্মুখে ঘোষণার মাধ্যমে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা।
৪। কঠোর শাস্তির মাধ্যমে অপরাধের ভয় তৈরি করা।
৫। গণমাধ্যমে প্রচারের মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা।
৬। পরিবারে নৈতিক ও মানবিক শিক্ষা বৃদ্ধি করা।
৭। ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা।
৮। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্যাতনমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা।
৯। শিশুদের নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষার শিক্ষা দেওয়া।
১০। ভুক্তভোগী পরিবারকে সামাজিকভাবে সম্মান ও সহায়তা প্রদান করা।

শিশুরা নিষ্পাপ। তারা পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র আমানত। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়; এটি প্রতিটি পরিবার, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, নাগরিক এবং পুরো সমাজের দায়িত্ব।

আজ রামিসা নেই। কিন্তু তার চলে যাওয়া আমাদের বিবেককে নাড়া দিক। যেন আর কোনো শিশুকে এভাবে নির্মমতার শিকার হতে না হয়। যেন আর কোনো বাবাকে সন্তানের লাশ বুকে নিয়ে কান্না করতে না হয়।

আমরা আমাদের সন্তানদের জন্য নিরাপদ পৃথিবী চাই। এই দাবি শুধু একজন বাবার নয়, পুরো মানবতার।

লেখক : সম্পাদক, ইউরোবাংলা
Home R3