২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

মাতৃভাষার মর্যাদা: কুরআনের শিক্ষা ও একুশের চেতনা

ভাষা মানুষের আত্মার পরিচয়। মাতৃভাষা মানুষের অস্তিত্বের গভীরতম অংশ। যে ভাষায় মানুষ প্রথম মায়ের স্নেহভরা ডাক শোনে, যে ভাষায় আনন্দ প্রকাশ করে, দুঃখ জানায়, প্রার্থনায় হাত তোলে-সেই ভাষাই তার প্রকৃত পরিচয়। ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও আত্মমর্যাদার ধারক।
২১ ফেব্রুয়ারি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, মাতৃভাষা রক্ষার প্রশ্ন আসলে আত্মপরিচয় রক্ষার প্রশ্ন।

কুরআনের আলোকে ভাষার গুরুত্ব

পবিত্র কুরআনে ভাষার মর্যাদা সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
সূরা রূমের ২২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, আসমান-জমিনের সৃষ্টি এবং মানুষের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য তাঁর নিদর্শন। অর্থাৎ ভাষার ভিন্নতা বিভেদের কারণ নয়; বরং তা সৃষ্টিকর্তার মহিমার পরিচায়ক।
• সূরা ইবরাহিমের ৪ নম্বর আয়াতে উল্লেখ আছে, প্রত্যেক রাসূলকে তাঁর জাতির ভাষায় প্রেরণ করা হয়েছে, যাতে তারা স্পষ্টভাবে সত্য পৌঁছে দিতে পারেন।
• সূরা নাহলের ১২৫ নম্বর আয়াতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে প্রজ্ঞা ও সুন্দর ভাষণে আহ্বান করতে।

এসব আয়াত আমাদের শেখায়, মানুষের হৃদয়ে পৌঁছাতে হলে তার ভাষায় কথা বলতে হয়। দ্বীনের দাওয়াত, শিক্ষা ও নৈতিক আহ্বান তখনই কার্যকর হয়, যখন তা মানুষের মাতৃভাষায় উপস্থাপিত হয়।

হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিজ ভাষায় ছিলেন অসাধারণ প্রাঞ্জল। হজরত মুসা (আ.) তাঁর ভাই হারুন (আ.)-কে সঙ্গে চেয়েছিলেন, কারণ তিনি বেশি সুন্দরভাবে কথা বলতে পারতেন। এসব ঘটনাই প্রমাণ করে, ভাষার দক্ষতা আল্লাহপ্রদত্ত এক গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামত।

ভাষা: আল্লাহর অনুগ্রহ

মানুষের ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম ভাষা। পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণীরও নিজস্ব যোগাযোগ পদ্ধতি রয়েছে। যারা কথা বলতে পারে না, তারা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে অনুভূতি প্রকাশ করে। ভাষা মহান আল্লাহর এক অপার দান।

সূরা আর রহমানের আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন। শিশুকালে মায়ের মুখে যে ভাষা আমরা শিখি, সেটিই আমাদের মাতৃভাষা। নিজের ভাষায় শুদ্ধ ও সুন্দরভাবে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারা এক অনন্য গৌরব।

বিশ্বে প্রায় সাত হাজারের বেশি ভাষা রয়েছে। এদের মধ্যে বাংলা অন্যতম বহুল ব্যবহৃত ভাষা। পৃথিবীর প্রায় ত্রিশ কোটিরও বেশি মানুষ বাংলায় কথা বলে।

বাংলা ভাষা: ইতিহাস ও বিস্তৃতি

বাংলা একটি ইন্দো-আর্য ভাষা, যার বিকাশ সংস্কৃত, পালি ও প্রাকৃত ভাষার ধারায়। দক্ষিণ এশিয়ার বঙ্গ অঞ্চলে এর উদ্ভব।

আজ বাংলা ভাষা প্রচলিত রয়েছে:
• বাংলাদেশে
• ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসামের বরাক উপত্যকা ও আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে
• বিশ্বের বিভিন্ন প্রবাসী সম্প্রদায়ের মাঝে

বাংলা বিশ্বের সর্বাধিক ব্যবহৃত ভাষাগুলোর অন্যতম। বাংলাদেশের জাতীয় ও রাষ্ট্রভাষা বাংলা। ভারতের সংবিধান স্বীকৃত সরকারি ভাষাগুলোর মধ্যেও বাংলা রয়েছে।

১৯৫২: ভাষার জন্য আত্মত্যাগ

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পর ভাষা নিয়ে সংকট তৈরি হয়। পশ্চিম পাকিস্তান উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার চেষ্টা করলে পূর্ব বাংলার মানুষ প্রতিবাদে ফেটে পড়ে।

১৯৪৮ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করেন। ১৯৫২ সালে খাজা নাজিমুদ্দিন একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করলে আন্দোলন তীব্র হয়।

২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২-১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্ররা মিছিল বের করে। পুলিশ গুলি চালায়। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেকে শহীদ হন। তাদের রক্তে রঞ্জিত হয় ঢাকার রাজপথ।

এই আত্মত্যাগের ফলেই বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি লাভ করে। একুশের চেতনা পরবর্তীতে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১-এর স্বাধীনতা সংগ্রামে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। কানাডাপ্রবাসী বাঙালিদের উদ্যোগ ও বাংলাদেশের প্রস্তাবের ভিত্তিতে এই স্বীকৃতি আসে।

এর মাধ্যমে ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ বিশ্বব্যাপী মর্যাদা পায়। এখন ২১ ফেব্রুয়ারি শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র বিশ্বের ভাষাগত বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর দিন।

বর্তমান প্রেক্ষাপট ও আমাদের দায়িত্ব

বিদেশি ভাষা শেখা প্রয়োজন। জ্ঞানার্জন ও বিশ্বসংযোগের জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নিজের মাতৃভাষাকে অবহেলা করা কখনো গ্রহণযোগ্য নয়।

বর্তমানে শুদ্ধ বাংলা ব্যবহারে শৈথিল্য দেখা যাচ্ছে। বাংলা-ইংরেজি-হিন্দি মিশ্রণের প্রবণতা বাড়ছে। বিজ্ঞাপন, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাষার বিকৃতি স্পষ্ট।

আমাদের করণীয়:
• শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুদ্ধ বাংলা চর্চা জোরদার করা
• বাংলা ভাষায় দ্বীনি ও নৈতিক সাহিত্য বৃদ্ধি করা
• পরিবারে শিশুদের মাতৃভাষায় ভাব প্রকাশে উৎসাহ দেওয়া
ভাষা শহীদদের ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে জানানো

ইসলাম আমাদের ভারসাম্য শেখায়। অন্য ভাষা শিখব, কিন্তু নিজের ভাষাকে ভালোবেসে।

প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্ম ও মাতৃভাষা

প্রবাসে জন্ম নেওয়া বা বেড়ে ওঠা অনেক শিশুর কাছে বাংলা দ্বিতীয় ভাষা হয়ে যাচ্ছে। পরিবার যদি সচেতন না হয়, তাহলে ধীরে ধীরে ভাষার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই ঘরে নিয়মিত বাংলায় কথা বলা, বাংলা বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং বাংলা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা জরুরি।

মসজিদ, ইসলামিক সেন্টার ও কমিউনিটি সংগঠনগুলো চাইলে সাপ্তাহিক বাংলা ক্লাস, কুরআন ও ইসলাম শিক্ষা বাংলায় পরিচালনা করতে পারে। অনলাইন মাধ্যমেও বাংলা শেখার উদ্যোগ নেওয়া যায়। শিশুরা যেন বুঝতে পারে, বাংলা শুধু একটি ভাষা নয়; এটি তাদের শিকড়, ইতিহাস ও পরিচয়ের অংশ।

ভাষা ও দেশ অবিচ্ছেদ্য। মাতৃভাষা মানুষের আত্মপরিচয়ের ভিত্তি, আর ইসলামের দৃষ্টিতে এটি আল্লাহর এক মহান নিদর্শন।

২১ ফেব্রুয়ারি কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি আত্মসমালোচনা ও অঙ্গীকারের দিন।
আমাদের প্রতিজ্ঞা হওয়া উচিত- বাংলা ভাষাকে শুদ্ধভাবে ব্যবহার করব, ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ স্মরণে রাখব,
এবং মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় সচেষ্ট থাকব।

আল্লাহ তাআলা ভাষা শহীদদের মাগফিরাত দান করুন এবং আমাদেরকে ভাষার সম্মান রক্ষার তাওফিক দিন। আমিন।

আবদুল আহাদ সালমান
সম্পাদক : ইউরোবাংলা
প্রেসিডেন্ট : পিবিসিসিআই – পর্তুগাল বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির।