জার্মানিতে অভিবাসী, তাদের সন্তান ও আত্মীয়স্বজনদের জীবনযাত্রার পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে, এমন উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডাব্লিউ)। সংস্থাটি বলছে, দেশটিতে ক্রমবর্ধমান কঠোর অভিবাসন নীতি, আশ্রয়প্রার্থীদের অধিকার সংকোচন, ঘৃণামূলক অপরাধ ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য অভিবাসী জনগোষ্ঠীকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
বুধবার বার্লিনে জার্মানি-সংক্রান্ত এইচআরডাব্লিউ-এর সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
“পশ্চাদগামী অভিবাসন ও আশ্রয় নীতি, মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতার ওপর বাড়তি বিধিনিষেধ, সবকিছু মিলিয়ে মানবাধিকারের ক্ষেত্রে জার্মানিতে গুরুতর অবনতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।”
এইচআরডাব্লিউ-এর বর্ণবাদ ও বৈষম্য বিষয়ক গবেষক আলমাজ টেফেরা প্রতিবেদনের উপস্থাপনায় বলেন, জার্মান রাজনীতিতে অভিবাসন ইস্যুকে ঘিরে কট্টর ভাষা এখন আর প্রান্তিক কোনো গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তার ভাষায়,
“গণতান্ত্রিক মূলধারার দলগুলোও ক্রমশ অতি-ডানপন্থি অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি)-এর রাজনৈতিক বক্তব্য ও বয়ান গ্রহণ করছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”
এএফডি দীর্ঘদিন ধরেই কঠোর অভিবাসন আইন, আশ্রয়প্রার্থীদের দ্রুত বহিষ্কার এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদারের দাবি জানিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দলটির ভোটব্যাংক বৃদ্ধি পাওয়ায় অন্যান্য দলগুলোর মধ্যেও অভিবাসন বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে বলে মনে করছে মানবাধিকার সংস্থাটি। আলমাজ টেফেরা সতর্ক করে বলেন,
“অভিবাসীদের সমাজের সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক সংহতি ও গণতন্ত্রের জন্য ভয়াবহ ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।”
যদিও রাজনৈতিক বক্তব্যে প্রায়ই কঠোর পরিশ্রমী ভালো অভিবাসী ও অপরাধী অভিবাসী, এই বিভাজন তৈরি করা হয়, এই ধরনের ভাষা শেষ পর্যন্ত পুরো অভিবাসী জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈষম্য ও ঘৃণার পরিবেশ তৈরি করে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এইচআরডাব্লিউ-এর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জার্মানিতে অভিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক অপরাধ, ইসলামবিদ্বেষ, বর্ণবাদী আক্রমণ এবং অনলাইন বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ঘটনার সঠিক তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত না হওয়ায় ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এইচআরডাব্লিউ-এর জার্মানি পরিচালক ফিলিপ ফ্রিশ বলেন, শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, বিদেশ নীতির ক্ষেত্রেও জার্মানির মানবাধিকারভিত্তিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার মতে, পূর্ববর্তী মধ্য-বাম জোট সরকার এবং বর্তমান মধ্য-ডান সরকার, উভয়ই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জার্মানির নৈতিক নেতৃত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করেছে। বিশেষ করে গাজা উপত্যকায় বেসামরিক ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ওপর ইসরায়েলি হামলার প্রেক্ষাপটে জার্মান সরকারের প্রায় নিঃশর্ত সমর্থন দেশটির মানবাধিকার অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এইচআরডাব্লিউ মনে করছে, অভিবাসন নীতি ও নিরাপত্তা প্রশ্নে ভারসাম্য রক্ষা না করলে জার্মানিতে সামাজিক বিভাজন আরও তীব্র হবে। সংস্থাটি জার্মান সরকারকে অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের অধিকার সুরক্ষা, ঘৃণামূলক অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং মতপ্রকাশ ও সমাবেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।