৪ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

২০ বছরের তরুণী হচ্ছেন আগামী স্পেনের রানী

বিশ বছর বয়সে যেখানে অধিকাংশ তরুণ-তরুণীর জীবন আবর্তিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার আর বন্ধুবান্ধবের আড্ডাকে ঘিরে, সেখানে স্পেনের রাজকুমারী লিওনর নিজেকে প্রস্তুত করছেন একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালনের জন্য। তিনি আর শুধু রাজপরিবারের উত্তরসূরি নন, তিনি স্পেনের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রপ্রধান। প্রায় দেড়শ বছর পর স্পেন আবার একজন নারী শাসকের অধীনে যেতে চলেছে, যা দেশটির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করছে।

২০০৫ সালের ৩১ অক্টোবর জন্ম নেওয়া লিওনর দে বোরবোন ই ওর্তিস স্পেনের রাজা ফেলিপে ষষ্ঠ ও রাণী লেতিসিয়ার জ্যেষ্ঠ কন্যা। জন্মের পর থেকেই তিনি “প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস” উপাধি লাভ করেন, যা স্পেনের সিংহাসনের উত্তরাধিকারীর জন্য সংরক্ষিত। স্পেনের সংবিধান অনুযায়ী, রাজা ফেলিপের পরে তিনিই হবেন দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপ্রধান।

শৈশব থেকেই রাজত্বের প্রস্তুতি

লিওনরের শৈশব ছিল রাজকীয় হলেও তা মোটেও বিলাসী নয়। রাজপরিবার সচেতনভাবে তাকে সাধারণ জীবনের সঙ্গে পরিচিত রাখার চেষ্টা করেছে। মাদ্রিদের সান্তা মারিয়া দে লোস রোসালেস স্কুলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পড়াশোনা করার মধ্য দিয়ে তার শিক্ষাজীবন শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি যুক্তরাজ্যের ওয়েলসের ইউডব্লিউসি আটলান্টিক কলেজে আন্তর্জাতিক ব্যাকালোরিয়েট সম্পন্ন করেন, যেখানে বিশ্ব রাজনীতি, ইতিহাস ও নেতৃত্ব বিষয়ে তাকে বিশেষভাবে প্রস্তুত করা হয়। একই সঙ্গে তিনি আয়ত্ত করেছেন স্প্যানিশ ছাড়াও ইংরেজি, ফরাসি, কাতালান এবং আরবি ভাষার প্রাথমিক জ্ঞান, যা একজন আধুনিক ইউরোপীয় রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য অপরিহার্য বলে মনে করা হয়।

সামরিক প্রশিক্ষণ

স্পেনের সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাজা বা রাণী দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হন। সেই নিয়ম মেনেই লিওনর বর্তমানে সামরিক একাডেমিতে কঠোর প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী, তিন শাখাতেই পর্যায়ক্রমে প্রশিক্ষণ নেওয়ার কথা রয়েছে তার। ভোরের শারীরিক অনুশীলন, শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপন, অস্ত্র প্রশিক্ষণ এবং কৌশলগত শিক্ষা, সবকিছুই এখন তার দৈনন্দিন রুটিনের অংশ। রাজপরিবার সূত্রে জানা গেছে, এই প্রশিক্ষণ শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং ভবিষ্যৎ দায়িত্ব পালনের জন্য তাকে বাস্তব অভিজ্ঞতায় গড়ে তোলাই এর লক্ষ্য।

দেড়শ বছর পর নারী শাসকের প্রত্যাবর্তন

স্পেনের ইতিহাসে সর্বশেষ পূর্ণ ক্ষমতাসীন রাণী ছিলেন দ্বিতীয় ইসাবেলা, যিনি উনিশ শতকে রাজত্ব করেছিলেন। তার পর দীর্ঘ সময় পুরুষ শাসকদের হাতেই ছিল সিংহাসন। লিওনর সিংহাসনে আরোহণ করলে তিনি হবেন আধুনিক স্পেনের প্রথম নারী রাষ্ট্রপ্রধান, যা দেশটির রাজতন্ত্রের ধারায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন কেবল লিঙ্গগত প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন নয়; বরং রাজতন্ত্রকে আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজের সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলার একটি সুযোগ।

রাজতন্ত্রের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

স্পেনে রাজতন্ত্র বরাবরই বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না। অতীতের নানা কেলেঙ্কারি ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনে রাজপরিবারের জনপ্রিয়তা একাধিকবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে তরুণী লিওনরের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, রাজতন্ত্রকে নতুন প্রজন্মের কাছে বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য করে তোলা। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তার আত্মবিশ্বাসী ভাষণ, সংবেদনশীল বক্তব্য ও মার্জিত উপস্থিতি ইতোমধ্যেই স্প্যানিশ জনগণের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। বিশেষ করে তরুণদের কাছে তিনি হয়ে উঠছেন পরিবর্তন ও স্থিতিশীলতার প্রতীক।

ইতিহাস ও আধুনিকতার সেতুবন্ধন

লিওনরের প্রস্তুতি কেবল একটি রাজপরিবারের উত্তরাধিকার রক্ষার গল্প নয়। এটি একবিংশ শতাব্দীতে রাজতন্ত্রের ভূমিকা পুনরায় নির্ধারণের প্রচেষ্টা। ইতিহাসের ভার কাঁধে নিয়ে আধুনিক মূল্যবোধকে ধারণ করে তিনি যেভাবে নিজেকে গড়ে তুলছেন, তা শুধু স্পেন নয়, বিশ্ব রাজনীতিতেও কৌতূহল ও আগ্রহের জন্ম দিয়েছে।

দেড়শ বছর পর স্পেনের সিংহাসনে একজন নারীর অভিষেক এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা। অনেকের মতে, এই তরুণী রাণীর হাত ধরেই স্পেনের রাজতন্ত্র নতুন করে নিজের জায়গা খুঁজে নিতে পারে আধুনিক ইউরোপের রাজনৈতিক বাস্তবতায়।