১৬ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বিশেষ প্রতিবেদন
বিশেষ প্রতিবেদন

ইসরাইলে হামলা চালানো পানি পান করার চেয়েও সহজ, বলেছিলেন মুহাম্মাদ সিনওয়ার

ইসরাইলে হামলা চালানো পানি পান করার চেয়েও সহজ, বলেছিলেন মুহাম্মাদ সিনওয়ার

সম্প্রতি ফিলিস্তিনের ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান মুহাম্মাদ সিনওয়ার  শাহাদাত বরণ করেছেন। গত ২০ বছর ধরে তাকে বহুবার হত্যার চেষ্টা করা হলেও তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ ইসরাইলি বাহিনীর ধরা ছোঁয়ার বাইরে। দুর্ধর্ষ এই যোদ্ধা ও কমান্ডার আল আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকার বলেছিলেন, “পানি পান করার চেয়েও ইসরাইলে হামলা চালানো সহজ।” তিনি হামাসের সাবেক প্রধান ইয়াহিয়া সিনওয়ারের ভাই ছিলেন। 

২০২৪ সালে ইয়াহিয়া সিনওয়ারের মৃত্যুর পর ইসরাইলের জন্য আতংকের নাম হয়ে দাড়ায় তারই আপন ভাই মুহাম্মাদ সিনওয়ার। গত ২৯ ডিসেম্বর হামাস ঘোষণা দেয়, ৪৯ বছর বয়সী সিনওয়ারের মৃত্যু হয়েছে। তবে ইসরাইলের দাবি, এখন থেকে ৭ মাস আগেই মৃত্যু হয়েছে মুহাম্মাদ সিনওয়ারের। 

হামাস সিনওয়ারের মৃত্যুর বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য দেয়নি। তবে এক বিবৃতিতে সংগঠনটি অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে তাকে স্মরণ করে “বীর শহীদ” হিসেবে অভিহিত করে। একই বিবৃতিতে হামাস নিশ্চিত করে যে সিনওয়ারই ছিলেন সংগঠনটির সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান।

২০২৪ সালে তার ভাই ইয়াহইয়া সিনওয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হওয়ার পর হামাসের শীর্ষ নেতৃত্বে উন্নীত হন মোহাম্মদ সিনওয়ার। ইয়াহইয়া সিনওয়ারই ছিলেন ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলের ওপর হামলার মূল পরিকল্পনাকারী, যার মাধ্যমে গাজ্জা যুদ্ধের সূচনা হয় এবং পরবর্তীতে তিনি পুরো ফিলিস্তিনি সংগঠনটির শীর্ষ নেতা হন।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ২০২৫ সালের মে মাসে বলেন, সিনওয়ার নিহত হয়েছেন। এর দুই সপ্তাহেরও কম সময় পর ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানায়, তারা দক্ষিণ গাজ্জার একটি হাসপাতালের নিচে অবস্থিত একটি ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ থেকে সিনওয়ারের মরদেহ উদ্ধার করেছে।

সিনওয়ারের মৃত্যুর ফলে তার ডানহাত ইজ্জেলদিন হাদ্দাদ—যিনি উত্তর গাজ্জায় হামাসের সামরিক কার্যক্রম তদারকি করছিলেন—এখন পুরো উপত্যকাজুড়ে হামাসের সশস্ত্র শাখার নেতৃত্ব দেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে সিনওয়ারের মৃত্যু হামাসের সামগ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কী প্রভাব ফেলবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে, ইসরায়েলের সঙ্গে অক্টোবর মাসে যে গাজ্জা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনায় সম্মতি হয়েছিল, তার পূর্ণ বাস্তবায়নসহ নীতিনির্ধারণী বিষয়ে প্রবাসী নেতৃত্ব পরিষদের সদস্যদের প্রভাব বাড়বে না কমবে—সেটিও এখনো অনিশ্চিত।

একাধিকবার হত্যাচেষ্টা:

হামাসের কর্মকর্তারা সিনওয়ারকে একটি “ভূত” বলে বর্ণনা করেছেন। কারণ তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকেও ফাঁকি দিয়ে চলেছিলেন।

হামাস সূত্র জানায়, সিনওয়ার বহুবার ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থার হত্যাচেষ্টা থেকে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। যার মধ্যে বিমান ও মাইন বিস্ফোরণ ছিলো অন্যতম। 

একবার সিনওয়ার কবরস্থানে যাচ্ছিলেন। তখন তার সঙ্গীরা তার চলার পথে হুবুহু ইটের মতো দেখতে একটি রিমোট কন্ট্রোল বিস্ফোরক পুঁতে রাখা অবস্থায় দেখতে পান। 

এছাড়াও ২০০৩ সালে মোহাম্মাদ সিনওয়ারের বাড়ির দেয়ালের ভেতরে একটি বোমা খুঁজে পান। এজন্য ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থাকে দায়ী করে হামাস। 

গোপন পরিকল্পনা :

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলের অভ্যন্তরে ঢুকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও আকস্মিক হামলা চালায় হামাস। এই হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন মুহাম্মাদ সিনওয়ার। যার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে অপ্রতিরোধ্য ইসরাইলের দম্ভ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। 

এছাড়াও তিনি ২০০৬ সালে সীমান্ত পেরিয়ে একবার ইসরাইলে হামলা চালান। একই সঙ্গে ইসরাইলি সেনা গিলাদ শালিতকে অপহরণের অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবেও ব্যাপকভাবে পরিচিত ছিলেন তিনি। 

ইহুদি এই সেনাকে পাঁচ বছর বন্দি রাখে হামাস। এরপর ইসরাইলের কারাগারে বন্দী এক হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির বিনিময়ে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।

ওই চুক্তির আওতায় মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন তার ভাই ইয়াহইয়া সিনওয়ার। 

হামাসের অদম্য লড়াই :

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হামাসকে সম্পূর্ণ নির্মূল করার অঙ্গীকার করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে আধুনিক সামরিক শক্তি হিসেবে পরিচিত ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর গাজ্জায় চালানো সামরিক অভিযান সংগঠনটিকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দিয়েছে। তবে আকস্মিকভাবে এখনো টিকে আছে হামাস। 

২০২৪ সালে গাজ্জায় ইসরাইলি বাহিনীর একটি নিয়মিত টহল অভিযানের সময় শহীদ হন ইয়াহইয়া সিনওয়ার। তার শাহাদাতের পর ধরে নেওয়া হচ্ছিল ভেঙে যেতে পারে হামাস। তবে সেরকম কিছুই হয়নি। ১৯৮৭ সালে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠন এখনো টিকে আছে। 

শরণার্থী থেকে যুদ্ধের ময়দানে :

১৯৭৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন মোহাম্মাদ সিনওয়ার। খুব কমই প্রকাশ্যে আসতেন তিনি। ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরাকে একটি সাক্ষাৎকার দিলেও মাথায় টুপি পরে নিজেকে গোপন রেখেছিলেন। 

এই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ” “তেল আবিবে আঘাত হানা পানি পান করার চেয়েও সহজ।” 

সিনওয়ার পরিবার মূলত আসকালান অঞ্চল থেকে এসেছিল—বর্তমানে এই শহরটি ইসরাইলের দখলে।পরিবারটি গাজ্জা উপত্যকার খান ইউনুসে বসতি স্থাপন করে, যা সাম্প্রতিক যুদ্ধে ব্যাপকভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

মোহাম্মাদ সিনওয়ার জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি ত্রাণ সংস্থা (ইউএনআরডব্লিউএ)-পরিচালিত স্কুলে পড়াশোনা করেন। সংস্থাটিকে উদ্দেশ্য করে দীর্ঘদিন ধরেই নির্লজ্জ সমালোচনায় লিপ্ত হয়েছে ইসরাইল।সাম্প্রতিক গাজ্জা যুদ্ধের সময়ও এই সংস্থার স্কুল ও কর্মীদের উপর হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। 

হামাস প্রতিষ্ঠার অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সংগঠনে যোগ দেন। এতে তাকে প্রভাবিত করেন তার ভাই ইয়াহইয়া, যিনি একসময় মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে প্রাচীন এবং এক সময় সবচেয়ে প্রভাবশালী ইসলামি সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য ছিলেন।

ইসলামপন্থী হিসেবে তার সুনাম তাকে সংগঠনের সামরিক কাঠামোয় দ্রুত উন্নীত হতে সাহায্য করে। ২০০৫ সালের মধ্যে তিনি হামাসের “খান ইউনুস ব্রিগেড”-এর নেতৃত্ব পান। হামাসের সশস্ত্র শাখার অন্যতম বৃহৎ ও শক্তিশালী এই ইউনিট সীমান্ত পেরিয়ে হামলা চালানো, রকেট নিক্ষেপ এবং সীমান্তজুড়ে বোমা পুঁতে রাখার জন্য কাজ করে। 

এই ইউনিটটি সার্বক্ষণিকভাবে ইসরায়েলি সেনাদের গতিবিধিও পর্যবেক্ষণ করে। ২০০৬ সালে সিনওয়ারের নেতৃত্বে অভিজাত কমান্ডোরা শালিত অপহরণ অভিযানে অংশ নেয়।