ইতালিতে বৈধ কাজ, স্পন্সর ভিসা ও স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ভোলার লালমোহনের মো. রাসেলের কাছ থেকে ১৮ লাখ ২৩ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে। ইতালিতে নেওয়ার পর তাঁকে আটকে রেখে অন্যের কাছে ‘শ্রমদাস’ হিসেবে বিক্রির চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী। এ ঘটনায় করা মামলায় চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের মো. হাসান আলীসহ চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তবে এখনো গ্রেপ্তার হননি কোনো আসামি।
২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি মানবপাচার ও অভিবাসন ট্রাইব্যুনালে হাসান আলী, তাঁর বেয়াই মো. সাঈদ এবং হাসানের দুই ভাই মো. হোসেন খান ও মো. জাবেদের বিরুদ্ধে মামলা করেন রাসেল। আদালত মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেন সিআইডিকে। তদন্ত শেষে সিআইডির উপপরিদর্শক মো. আবদুল হাকিম চলতি বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন জমা দেন। এতে মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬-এর ৬ ও ৭ ধারায় অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সিআইডির প্রতিবেদন ও মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২০ মার্চ ঢাকার নয়াপল্টনের একটি কার্যালয়ে ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে হাসান আলীর সঙ্গে রাসেলের চুক্তি হয়। ১৫ লাখ টাকার বিনিময়ে বৈধ ইতালীয় স্পন্সর ভিসা, পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট কার্ড (পিআরসি) ও চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রসেসিং, ভিসা ফি, জনশক্তি ও বিমান টিকিটের খরচের কথা বলে ধাপে ধাপে তাঁর কাছ থেকে ১৮ লাখ ২৩ হাজার টাকা নেওয়া হয়।
২০২৩ সালের ২৬ অক্টোবর টার্কিশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে ইতালি পৌঁছান রাসেল। হাসান আলীর নির্দেশে তিনি তাঁর বেয়াই সাঈদের কাছে যান। অভিযোগ অনুযায়ী, সাঈদ তাঁকে ইতালির নেপলির পালমা ক্যাম্পানিয়ায় একটি কক্ষে নিয়ে এক মাস আটকে রাখেন। বৈধ কোনো কাজের ব্যবস্থা না করে অন্য ব্যক্তির কাছে তাঁকে জোরপূর্বক শ্রমদাস হিসেবে বিক্রির চেষ্টা করা হয়।
প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে রাসেল সাঈদের কাছে বৈধভাবে কাজের ব্যবস্থা করার আকুতি জানান। পরে গোপনে দেশে তাঁর মামাকে বিষয়টি জানালে তিনি পল্টন থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
এ পরিস্থিতিতে সাঈদ নতুন স্পন্সরের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিয়ে রাসেলের কাছে আরও চার লাখ টাকা দাবি করেন। এতে রাজি হয়ে ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন রাসেল। পরের বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি নয়াপল্টনের কার্যালয়ে হাসান আলীকে তাঁর ভাই হোসেন খান ও জাবেদের উপস্থিতিতে অতিরিক্ত চার লাখ টাকা দেন তিনি। এ ছাড়া বিমান টিকিটের জন্য নিজের আরও এক লাখ টাকা খরচ হয়।
২০২৪ সালের ২৮ এপ্রিল সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে দ্বিতীয়বার ইতালি যান রাসেল। কিন্তু এবারও তাঁকে কোনো কাজ দেওয়া হয়নি। বরং একটি কক্ষে আটকে রেখে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় এবং গোপনে অন্য ব্যক্তির কাছে বিক্রির চেষ্টা চলে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
একপর্যায়ে ইতালিতে অবস্থানরত বরিশালের এক ব্যক্তির সহায়তায় কক্ষ থেকে পালিয়ে যান রাসেল। পরে পূর্বপরিচিত আজাদের আশ্রয়ে যান তিনি। আজাদের সহযোগিতায় ৮ জুলাই ইতালি পুলিশের কাছে গেলে কাগজপত্র যাচাই করে জানা যায়, মূল মালিকের স্বাক্ষর জাল করে তাঁর নামে স্পন্সর তৈরি করা হয়েছিল। পরে স্বজনদের পাঠানো বিমান টিকিটে ১৫ জুলাই সর্বস্ব হারিয়ে দেশে ফেরেন তিনি।
রাসেল অভিযোগ করেন, তিনি ছাড়াও চক্রটি আরও অনেকের সঙ্গে একই ধরনের প্রতারণা করেছে। ইতালিতে যাওয়ার আগে জাল স্পন্সরের বিষয়টি বুঝতে পারেননি তিনি। তাঁর ভাষ্য, চক্রটি ১৮ লাখ ২৩ হাজার টাকা ছাড়াও তাঁর কাছ থেকে অতিরিক্ত নগদ অর্থ নিয়েছে। তবে প্রমাণ না থাকায় এসব অর্থ সিআইডির প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
চার আসামির শাস্তি দাবি করে রাসেল বলেন, সাঈদ ইতালিতে এবং হাসানসহ অন্যরা বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। তিনি আদালতের কাছে তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা মো. আবদুল হাকিম বলেন, তদন্তে যা পাওয়া গেছে, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী ব্যবস্থা আদালত নেবেন।
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর মোস্তফা কামাল জানান, সাত মাস ধরে ট্রাইব্যুনালে নিয়মিত বিচারক না থাকায় অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরও এ ধরনের প্রায় ১০০টি মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার কার্যক্রম এগোচ্ছে না। জেলা ও দায়রা জজ অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ট্রাইব্যুনালের কাজ দেখছেন। ফলে মাঝেমধ্যে শুনানি হলেও মানবপাচারের মতো গুরুতর অপরাধের মামলায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণের বিষয়ে আদালতের আদেশের অপেক্ষায় রয়েছে মামলাটি। আদেশের পরই আসামিদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।