১৪ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

রয়টার্সের চোখে তারেক রহমানের সামনে ‘তিন বড় চ্যালেঞ্জ’

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন গতকাল ১২ ফেব্রুায়ারি অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঠিক পরের ‍দিন শুক্রবার রয়টার্স এই নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের ভূমিধস বিজয়ের ফলে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন আর তার সামনে তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেছে।

বাংলাদেশে সুশাসন, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান হ্রাস, বেকারত্ব বিমোচন, মানব সম্পদের সুষ্ঠু ও পরিকল্পিত ব্যবহার, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে অধিপত্য মোকাবেলার বিষয়কে চাপিয়ে রয়টার্স তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জকে সামনে নিয়ে আসে।

‘বাংলাদেশের নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধস জয়, প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন সাবেক শাসকদের পুত্র’ -শিরোনামে শুক্রবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে তারা যা বলল,

বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। প্রায় দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরছে দলটি এবং দলের নেতা তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে এগিয়ে আছেন। গত বছর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর কয়েক মাসের অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাওয়া দেশটি এখন নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করছে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে এবং নিহত সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সন্তান ৬০ বছর বয়সের তারেক রহমানের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ—রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা এবং তৈরি পোশাক শিল্পসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো পুনর্গঠন করা।

সর্বশেষ গণনা অনুযায়ী, ২৯৯টি আসনের মধ্যে বিএনপি ও তার মিত্ররা কমপক্ষে ‘২১২টি’ আসনে জয় পেয়েছে বলে স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলো জানিয়েছে। জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মিত্ররা পেয়েছে ‘৭০টি’ আসন।

তারেক রহমান এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি, যদিও ফলাফল স্পষ্ট হওয়ার পর ১২ ঘণ্টার বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। বিএনপি সমর্থকদের বড় ধরনের উদ্‌যাপন না করে শুক্রবার বিশেষ দোয়া করার আহ্বান জানিয়েছে। দলটি এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘বড় ব্যবধানে জয়ী হলেও কোনো বিজয় মিছিল বা সমাবেশ আয়োজন করা হবে না।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, দৃঢ় সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিএনপিকে দ্রুত সংস্কার কার্যকর করার এবং আইন প্রণয়নে অচলাবস্থা এড়ানোর সুযোগ দেবে। এতে স্বল্পমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসতে পারে।

ইশতেহারে বিএনপি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নিম্ন আয়ের ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

২৮ বছর বয়সী পোশাক শ্রমিক ও দুই সন্তানের মা জোসনা বেগম রয়টার্সকে বলেন, ‘কারখানা নিয়মিত চালু থাকলে এবং সময়মতো বেতন পেলে সেটাই আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমি শুধু চাই বিএনপি সরকার স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনুক, যাতে আরও অর্ডার আসে এবং আমরা বাঁচতে পারি।’

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন প্রথম দিকের অভিনন্দনদাতাদের মধ্যে ছিলেন। ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা

বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তার নিয়ে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত সম্প্রতি রয়টার্সকে বলেন, ওয়াশিংটন বাংলাদেশে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন।

শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর থেকে নয়াদিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের অবনতি হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে ভিসা সেবা ও দুই দেশের ক্রিকেট সম্পর্কেও।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক থমাস কিয়ান বলেন, ‘এটি বাংলাদেশের জন্য যেমন সুযোগ, তেমনি চ্যালেঞ্জও। বড় শক্তিগুলো যখন প্রভাব বিস্তারে প্রতিযোগিতা করছে, তখন সম্পর্কগুলো কীভাবে সামলানো হবে সেটাই মূল প্রশ্ন।’

জামায়াতে ইসলামী বৃহস্পতিবার রাতে পরাজয় স্বীকার করলেও শুক্রবার এক বিবৃতিতে নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে এবং সমর্থকদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছে। ২০১৩ সালে নিষিদ্ধ হওয়ার পর এই প্রথম দলটি নির্বাচনে অংশ নেয়। শেখ হাসিনার অপসারণের পর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।

২০০টির বেশি আসনে জয় বিএনপির অন্যতম বড় সাফল্য, যা ২০০১ সালের ১৯৩ আসনের জয়ের রেকর্ডও ছাড়িয়েছে। তবে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে ২৩১টি আসন পেয়ে আরও বড় জয় পেয়েছিল। অন্য বছরগুলোর নির্বাচন প্রধান প্রধান দলের বর্জন বা বিতর্কের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।

এবার ভোটার উপস্থিতি ছিল গত ২০২৪ সালের নির্বাচনের তুলনায় বেশি; গণমাধ্যম জানিয়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার অংশ নিয়েছেন। ৫০টির বেশি দল এবং দুই হাজারের বেশি প্রার্থী—যাদের অনেকেই স্বতন্ত্র—নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে একটি আসনে ভোট স্থগিত করা হয়েছে।

নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত সংবিধান সংস্কার বিষয়ক গণভোটের আনুষ্ঠানিক ফল এখনও ঘোষণা হয়নি।

প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলোর মধ্যে রয়েছে—প্রধানমন্ত্রীর জন্য দুই মেয়াদের সীমা নির্ধারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নারীর প্রতিনিধিত্ব জোরদার করা, নির্বাচনকালে নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থা এবং ৩০০ আসনের সংসদের পাশাপাশি একটি উচ্চ (দ্বিতীয়) কক্ষ গঠন।

সূত্র: রয়টার্স